দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে গণতন্ত্রের বিশ্ব ইতিহাসের এক নতুন পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এই প্রক্রিয়ার ‘ক্রোধে পোড়া অংশ’ এখন দৃশ্যমান, যার মূলে রয়েছে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাহীনতার এক স্থায়ী সামাজিক অনুভূতি। দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোকপাত করেছেন গবেষক ও লেখক আলতাফ পারভেজ।
গত বছরের এই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বশেষ গণ-অভ্যুত্থানটি ঘটেছিল। বর্তমানে নেপাল সেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার হিসাব মেলাচ্ছে। ঠিক এই সময়েই ভারত ও পাকিস্তানে তীব্র রাজনৈতিক বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। দিল্লি এবং ইসলামাবাদ—উভয় জায়গার অসন্তোষের দাবিগুলোর মধ্যে বেশ কিছু মিল রয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনী দুর্নীতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আগে যে ধারণাগুলো প্রচলিত ছিল, শাসকদের নানা কর্মকাণ্ডে তার অনেকখানিই এখন বিলীন। রাজপথে নেমে আসা তরুণ প্রজন্ম এখন এক ক্ষয়িষ্ণু রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে পুনর্গঠন করতে আগ্রহী।
অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রধান দাবি হলো ইমরান খানের মুক্তি। ‘ক্যাপ্টেন খান’ ও তাঁর সহযোগীদের বন্দি করে জেনারেল আসিম মুনির যে ছদ্ম সামরিক শাসন পরিচালনা করছেন, তার বিরুদ্ধে পিটিআই কর্মীদের ইন্তিফাদা চলছে। এছাড়া বেলুচিস্তান, আজাদ-কাশ্মীর ও পশতুন এলাকাগুলোতে সেনা-জুলুমের প্রতিবাদে নিয়মিত সহিংস বিক্ষোভের ঘটনা ঘটছে।
ভারত ও পাকিস্তান—উভয় দেশের এলিট শ্রেণির প্রতি সামাজিক হতাশা ও বিরক্তির কারণগুলো অত্যন্ত গভীর ও বহুমাত্রিক, যা অনেকটা নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের পরিস্থিতির মতো। ২০২২ সালের শ্রীলঙ্কা, ২০২৪ সালের বাংলাদেশ এবং ২০২৫ সালের নেপালের রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে ভারত-পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির পদ্ধতিগত মিল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রশ্ন জাগে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশেই কেন এমন রাজনৈতিক ক্ষোভ ও অসন্তোষ? এই পরিস্থিতির শেষ কোথায়? কেবল নির্বাচন ব্যবস্থা কিংবা আর্থিক দুর্নীতিই কি এই ব্যাপক গণ-প্রত্যাখ্যানের একমাত্র কারণ?
এই প্রশ্নগুলোর সাক্ষ্য-প্রমাণনির্ভর উত্তর পাওয়া বেশ কঠিন। তবে দৃশ্যত বোঝা যাচ্ছে যে, কোথাও ধর্ম আবার কোথাও সমরবাদী লাঠিতন্ত্র পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে বাধা দিচ্ছে। প্রায় আট দশক আগে বিদায় নেওয়া ঔপনিবেশিক প্রভুদের কৌশলেই টিকে আছেন বর্তমানের স্থানীয় কুলীনরা। উগ্র জাতীয়তাবাদ কিংবা ধর্মের আবরণে ঢাকা প্রভু-ভৃত্য সম্পর্কের প্রতি মানুষ এখন ক্লান্ত। এই ক্লান্তি একটি সর্বগ্রাসী প্রত্যাখ্যান পর্বের জন্ম দিলেও, সমাজ ও রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের কোনো স্পষ্ট দিশা আপাতত দেখা যাচ্ছে না।
পাকিস্তান ও ভারতের শাসকেরা জন–অসন্তোষ দমনে যা যা করছে, ২০২৪-সালে বাংলাদেশেও তা–ই করা হয়েছিল। উভয় দেশে প্রকাশ্য ও গোপনে বিভিন্ন এজেন্সিকে লেলিয়ে দেওয়া আছে। শ্রীলংকায় পুরানো দ্বিদলীয় ব্যবস্থার বাইরে থেকে এসে জনতা বিমুক্তি পেরামুনা (জেভিপি) সরকার গঠন করেছে, কিন্তু রাষ্ট্র পুনর্গঠন করতে পারেনি এখনো। নেপালে গণ–অভ্যুত্থানোত্তর নতুন দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংসদে রয়েছে; কিন্তু কেউ সেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারছে না।
ভারতে দীর্ঘ সময় ধরে নির্বিঘ্নে গেরুয়াকরণ চলছিল। কিন্তু ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকারা যখন তাদের পচনশীল রূপ দেখাতে শুরু করল, তখন রাজপথে সারি সারি পুলিশ নামিয়ে দেওয়া হলো। এই নির্দলীয় ও অহিংস প্রতিবাদ বিরোধী দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পথে নামার সুযোগ করে দিয়েছে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণদের মধ্যে দেশের উদারনৈতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের এক তীব্র আকুলতা দেখা যাচ্ছে।
তবে প্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশ এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার গভীরে হিন্দুত্ববাদীরা যে জাল বিছিয়েছে, সেখান থেকে দেশকে পুনরায় সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা কতটা সম্ভব—তা নিয়ে সন্দেহ রয়েই যাচ্ছে। যদিও আরএসএস-বিজেপির নৈতিক ভিত্তি এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ে তৈরি করা মোদি-অমিত জুটির সুশীল ইমেজ তরুণরা ইতিমধ্যে ভেঙে দিয়েছেন।
আন্দোলনের এই দৃশ্যপট থেকে একটু দূরে তাকালে তীব্র ধনবৈষম্য এবং বেকারির ক্ষত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিজেপির দেড় দশকের শাসনে বড় ব্যবসায়ীদের ব্যাপক উত্থান ঘটলেও, স্বল্প মজুরিতে জীবন কাটানো এক বিশাল জনশ্রেণি তৈরি হয়েছে। ১৪-১৫ বছর আগে মোদির তথাকথিত ‘গুজরাট মডেল’ যে কর্মসংস্থান ও সমৃদ্ধির গল্প শুনিয়েছিল, তার অসারতা এখন স্পষ্ট। কেবল গৌতম আদানির মতো গুটিকয়েক ক্রনি-ক্যাপিটালিস্টের ব্যাংক ব্যালেন্স বেড়েছে। ২০২৬ সালে আদানি ফোর্বস–এর বিলিয়নিয়ার্স তালিকায় ৩১তম স্থানে আছেন, অথচ এক দশক আগে তাঁর অবস্থান ছিল চারশ ধাপ নিচে।
খুব অল্প সময়ে মোদি-অমিত জুটি আদানির মতো বিলিয়নিয়ারদের তৈরি করতে গিয়ে নিচুতলার মানুষকে নিঃস্ব করেছেন। যদিও শুরুতে পশ্চিমা দেশগুলো এই শাসকদের ব্যাপক সমর্থন দিয়েছিল; ডলার-বিশ্ব মূলত এভাবেই কাজ করে।
জনসমাজকে ধর্মের বয়ানে ব্যস্ত রেখে টিম-মোদি সফল হয়েছিল মূলত কার্যকর বিকল্প রাজনীতির দুর্বলতার কারণে। কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো এখনো নিচুতলার মানুষকে নাগরিক আন্দোলনে যুক্ত করতে পারেনি। নেহা বোরা ও অভিজিৎ দিপকদের ভাবমূর্তি শহুরে গণ্ডি পেরিয়ে মেঠো আবেদন তৈরি করতে পারেনি। তাঁদের দাবির মধ্যে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক স্বস্তির কোনো উপাদান নেই। বিজেপির ধর্মীয় বয়ানের বাইরে সাধারণ মানুষকে কোন ধরনের রাজনীতি আকর্ষণ করবে, তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিস্তর বিতর্ক চলছে।
তরুণরা জাতিগত ও ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে ভারতকে নতুন সাজে সাজানোর কথা বলছেন। এটি নিশ্চিতভাবেই ভারতের দীর্ঘ গণতান্ত্রিক যাত্রার সূচনা। যে প্রজন্ম গেরুয়া ভাবাদর্শের সুনামির মধ্যে বড় হয়েছে, তাদের এই প্রত্যাখ্যান পর্বের রাজনৈতিক মূল্য অপরিসীম। তবে ছোট কিছু সাফল্য ছাড়া খুব দ্রুত বড় কোনো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা কম।
শাসক পক্ষ এখন গণতান্ত্রিক মুখোশ খুলে সরাসরি লাঠিতন্ত্রের মাধ্যমে নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চাইছে। ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার দুঃশাসনের পর কেন্দ্রীয় ভারতে পুলিশ প্রশাসনের এমন হিংস্র রূপ আর দেখা যায়নি। ১৯৭৫ সালের সেই জরুরি অবস্থার অবসান ঘটাতে গণতন্ত্রপন্থীদের প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিল। তবে এবারের প্রতিপক্ষ সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী ও নির্মম। ফলে নতুন এই জরুরি অবস্থার অবসান হতে আরও বেশি সময় লাগবে।
বিগত জাতীয় নির্বাচনে বিজেপি সব জোটসঙ্গীসহ প্রদত্ত ভোটের অর্ধেকের কম পেলেও বিরোধী পক্ষ এখনো অনেক আঞ্চলিক শিবিরে বিভক্ত। নেহা বোরাদের জন্য এই বিভক্ত বিরোধী শিবিরকে এক কাতারে আনা এক পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। ইতিহাসের এক অদ্ভুত কৌতুক হলো, ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে যাঁরা কংগ্রেসের বিপক্ষে লড়াই করেছিলেন, বর্তমানের নিপীড়কদের বড় অংশই তাঁরা।
ভারতের চেয়ে পাকিস্তানের পরিস্থিতি অনেক বেশি বিস্ফোরক। ২০২৪ সালে জেনারেলরা পিটিআইয়ের হাত থেকে নির্বাচনী ফলাফল ছিনিয়ে নিয়ে ভুট্টো ও শরিফ পরিবারকে ক্ষমতা ভাগ করে দিয়েছিলেন; কিন্তু সাধারণ মানুষ এখন চরম ক্ষুব্ধ। যেকোনো সুষ্ঠু নির্বাচনে ইমরান খান এখনো সব প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করতে সক্ষম, তবে কেবল জনপ্রিয়তা তাঁকে মুক্তি দিতে পারছে না। পশ্চিমের সমর্থনে আসিম মুনির পুরো দেশের জনমতের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন। এর সাথে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি এবং নাগরিক সেবার শোচনীয় দশা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে, অথচ কথা বলার মতো কোনো শক্তিশালী বিরোধী দল নেই।
পাকিস্তান ও ভারতের শাসকেরা জন–অসন্তোষ দমনে যা যা করছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশেও তা–ই করা হয়েছিল। উভয় দেশে বিরুদ্ধবাদীদের বিপক্ষে প্রকাশ্য ও গোপনে বিভিন্ন এজেন্সিকে লেলিয়ে দেওয়া আছে। ভারতে বিক্ষোভ দমাতে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে, বিমানে নেতা-নেতৃদের আটক করা হচ্ছে এবং রাতে ঘুম থেকে তুলে ‘ককরোচ’ নেতাদের অপহরণ করা হচ্ছে। পাকিস্তানে নিপীড়নের পদ্ধতি আরও বেশি নিষ্ঠুর।
ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের তুলনায় পাকিস্তানের প্রধান দুর্বলতা হলো এখানে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের সাংগঠনিক রাজনীতিতে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়নি। সবকিছু ভূস্বামী ও জেনারেলদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ইমরানের পিটিআই মধ্যবিত্ত তরুণদের জন্য প্রথম রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠলেও, ক্যাপ্টেন খান জনপ্রিয় হলেও তাঁর দল সুগঠিত ছিল না। সেনা চাপের মুখে এখন তা ছত্রভঙ্গ। দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় একক কোনো কেন্দ্র নেই; ছোট ছোট উপদল ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত দিচ্ছে ও বদলাচ্ছে। ফলে ইমরানের জনপ্রিয়তার তুলনায় তাঁর দলের প্রতি আস্থা কম।
বাংলাদেশের ‘লাল চব্বিশ’-এর সাথে পাকিস্তানের বর্তমান আন্দোলনের বড় পার্থক্য হলো, পিটিআই কর্মীদের মধ্যে মৃত্যুঝুঁকি নেওয়ার মতো আবেগ কম। ফলে আসিম মুনিরবিরোধী সংগ্রাম আইয়ুব বা হাসিনাবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
পাকিস্তানে মানুষ এমন দল চায় যারা সৎ এবং একই সাথে বিদ্যুৎ বিল কমাবে, জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, শ্রমবাজার সচল করবে এবং শিক্ষা ও চিকিৎসায় স্বস্তি আনবে। সর্বোপরি তারা চায় তীব্র ধনবৈষম্যের অবসান। বাংলাদেশেও হয়তো প্রত্যাশা একই রকম। তবে পাকিস্তানে পিটিআই সেই প্রত্যাশা মেটাতে সক্ষম নয়, যদিও ইমরান জনপ্রিয়। ঠিক যেমন শ্রীলঙ্কায় অনূঢ়া কুমার দিশানায়েক কিংবা বাংলাদেশে তারেক রহমান প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে জনপ্রিয়তায় এগিয়ে।
শ্রীলংকায় পুরোনো দ্বিদলীয় ব্যবস্থার বাইরে থেকে এসে জনতা বিমুক্তি পেরামুনা (জেভিপি) সরকার গঠন করেছে, কিন্তু রাষ্ট্র পুনর্গঠন করতে পারেনি এখনো। ক্ষমতাসীনেরা এমন কোনো সংস্কার পদক্ষেপ নেননি, যাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি এবং সামরিক-বেসরকারি আমলাতন্ত্র ক্ষুব্ধ হতে পারে। তামিল সমাজের প্রত্যাশিত স্বায়ত্তশাসনের বিষয়ে সরকার সম্পূর্ণ নীরব।
পরিবর্তনকে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত টেকসই করতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন ছিল, যা আপাতত অনুপস্থিত। তা না হলে মানুষ বারবার রাজনৈতিক অস্থিরতায় জড়াবে। অস্থিরতার কারণ সাধারণ মানুষ নয়, বরং শাসক কুলীন সমাজ। এর মধ্যে ধর্মবাদীরা তৃণমূলকে যুক্ত করতে পারলেও নাগরিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা দিতে অনিচ্ছুক।
শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক দেউলায়িত্ব কাটিয়ে ওঠার খবর বাংলাদেশের মানুষও শুনেছে। রিজার্ভ বেড়ে প্রায় সাত বিলিয়ন ডলার হলেও, অর্থনীতি ভালো হওয়া মানেই সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাগ্য পরিবর্তন নয়। জনসংখ্যার চার ভাগের এক ভাগ বা তারও বেশি মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে। রিজার্ভ বাড়লেও তাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি, তবে সরকার এখনো অজনপ্রিয় হয়ে পড়েনি।
নেপালেও বালেন্দ্র শাহর টিমের জন্য মানুষ অপেক্ষা করছে। সেখানে ‘অগ্রগতি’ এইটুকু যে, পুরোনো রাজনীতিবিদরা তাঁদের কৃতকর্মের জন্য কোণঠাসা। তবে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির (আরএসপি) কাছে এটি স্পষ্ট হচ্ছে যে, প্রাচ্যের সমাজের অচলায়তন ভাঙা অত্যন্ত কঠিন সাধনার ব্যাপার।
দক্ষিণ এশিয়ার চলমান রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে গণতন্ত্রের বৈশ্বিক ইতিহাসের নতুন এক নিরীক্ষা হিসেবেও দেখা যায়। এর ‘ক্রোধে পোড়া অংশ’ কেবল এখন সামনে আছে। এতে জ্বালানি জোগাচ্ছে ক্ষমতাহীনতার স্থায়ী এক সামাজিক বোধ। ভারত-পাকিস্তানের এই পর্বে প্রবেশের আগেই শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ-নেপাল তাতে ঢুকেছে। শেষোক্ত তিন দেশে সমাজ-পুনর্গঠনের-তাগিদ দুঃশাসকদের তাড়ালেও পুরোনো বন্দোবস্তের জন্য সেটি দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়নি।
এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন আন্তোনিও গ্রামসি মুসোলিনির কারাগার থেকে লেখা চিঠিতে। তাঁর মত ছিল—পুরোনো পৃথিবী মরে যাচ্ছে এবং নতুন পৃথিবী জন্ম নিতে লড়ছে বটে; কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন এই সময়টা দানবদের। এই সময়টায় বহুবিধ অসুস্থ লক্ষণ দেখব আমরা।
নেপাল ও শ্রীলঙ্কার আগে-পরে বাংলাদেশেও অভ্যুত্থানোত্তর নির্বাচন হয়েছে। তাতে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সামান্যই সুরাহা হলো। ক্ষমতাচ্যুত বড় এক দলকে নিষিদ্ধ রাখা হলেও এই বিষয়ে টেকসই কোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত দাঁড়ায়নি। আগের দিল্লির জায়গায় এখন ওয়াশিংটনের ‘খাই খাই’ চাহিদা মেটাতে গিয়ে সরকার তার কথিত ‘জাতীয়তাবাদী’ ভাবমূর্তি হারাচ্ছে। আট মাসে জ্বালানির দাম বেড়েছে অন্তত তিনবার। আবার সঠিক রাজনৈতিক দিশার অভাবে অভ্যুত্থানকারী তরুণ-তরুণীদের অসন্তুষ্টি সাংস্কৃতিক যুদ্ধের ব্যাধির চেহারা নিচ্ছে ক্রমে।
নেপালেও গণ–অভ্যুত্থানোত্তর নতুন দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংসদে রয়েছে; কিন্তু কেউ সেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারছে না। নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের তিন নবীন সরকার অর্থনৈতিক অসাম্য এবং প্রশাসনিক প্রভুতন্ত্র নিজেদের পাপে নয়, উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। অতীত থেকে পাওয়া পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া হিসেবে গণ–অভ্যুত্থান ঘটে গেছে।
এই পরিবর্তনকে মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত নিয়ে টেকসই করতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দরকার ছিল। সেই উদ্যোগ ও উদ্যম অনুপস্থিত আপাতত। সেটি না ঘটলে মানুষ বারবার রাজনৈতিক অস্থিরতায় অংশ নেবে। অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতার কারণ তাই সাধারণ মানুষ নয়, শাসক কুলীন সমাজ। এর মধে৵ ধর্মবাদীরা তৃণমূলের জনসমাজকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলেও নাগরিক স্বাধীনতা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা দিতে অনিচ্ছুক।
অন্যদিকে স্বাধীনতাপন্থীরা ব্যর্থ মাঠপর্যায়ের অর্থনৈতিক বঞ্চনা কমানোর বিশ্বাসযোগ্য উপায় দেখাতে। এই দুইয়ের ব্যবধান কমানোর রাজনীতিবিদ আসবেন নিশ্চিতভাবে নতুনদের মধ্য থেকে। সেই গঠন পর্ব কবে শুরু হবে, তার কোনো উত্তর নেই। দক্ষিণ এশিয়ার সেই আগামী পর্বে তাঁরাই এগিয়ে থাকবেন, যাঁরা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে নিচুতলার রান্নাঘরগুলোতে নিতে পারবেন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় নিজেদের কাছে হবেন চূড়ান্ত দায়বদ্ধ।
আলতাফ পারভেজ, গবেষক ও লেখক
মতামত লেখকের নিজস্ব