গত ২৬ আগস্ট নেপালে হিমবাহধসের ফলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানির সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ, যাদের জীবিত পাওয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। এই দুর্যোগে অর্ধলক্ষের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
প্রাকৃতিক এই বিপর্যয়ে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সেতু, সড়ক, মহাসড়ক এবং এক ডজনেরও বেশি প্রধান জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে ২ দশমিক ৬ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হতে পারে, যা নেপালের মোট জাতীয় অর্থনীতির প্রায় ১০ শতাংশের সমান।
জলবায়ুবিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে পর্বতের উচ্চতাজনিত বরফ গলে হিমবাহধস ও ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’-এর মতো দুর্যোগের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটার সম্ভাবনা প্রবল।
এই ভয়াবহ দুর্যোগের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, শিল্পোন্নত দেশগুলোর জবাবদিহিতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রগুলোর ক্ষতিপূরণের বিষয়টি জোরালোভাবে আলোচনায় এসেছে। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে, যেখানে এই বিষয়ে ব্যাপক বিতর্কের সম্ভাবনা রয়েছে। এই অধিবেশনকে সামনে রেখে জলবায়ুঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর সঙ্গে একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক জোট গঠনের কথা জানিয়েছে নেপাল।
জলবায়ু ন্যায্যতার মূল কথা হলো, শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য ঐতিহাসিকভাবে ব্যাপক কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করেছে, যার চূড়ান্ত ফল আজকের দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন। তাই ভুক্তভোগী দেশগুলোর ক্ষতিপূরণ এবং পৃথিবীর সবুজ রূপান্তরে তাদের দায় সবচেয়ে বেশি। বর্তমান জলবায়ু সংকট মূলত ঔপনিবেশিক আমলের শোষণ ও বৈষম্যেরই ধারাবাহিকতা। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে এম মোফাখখুরুল ইসলাম (প্রতিচিন্তা, ২০১৪) জানিয়েছেন, ভারতীয় উপমহাদেশের সম্পদ পাচার করেই ব্রিটেন তার শিল্পবিপ্লব সম্পন্ন করেছে। একইভাবে সিরাজুল ইসলাম (প্রতিচিন্তা, ২০১৪) উল্লেখ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পবিপ্লবের মূল জোগান ছিল ইয়াকিং বণিকদের বাংলা থেকে প্রাপ্ত মুনাফা। আজ সেই শিল্পবিপ্লবের পরিণাম হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের দুর্ভোগ পোহাচ্ছে ভারতীয় উপমহাদেশের দরিদ্র রাষ্ট্রগুলো।
তবে নেপাল সরকার এই দুর্যোগের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সাধারণ ত্রাণ না চেয়ে জলবায়ু ন্যায্যতার অংশ হিসেবে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, “এই সহায়তা কোনো করুণা বা দান নয়, এটি উন্নত বিশ্বের নৈতিক দায়বদ্ধতা।” তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে নেপালের অবদান মাত্র ০.১ শতাংশ, অথচ মাশুল গুনতে হচ্ছে তাদেরই। ফলে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতসহ শীর্ষ দূষণকারী দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায় হিসেবে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জোরালো হয়েছে।
হিমালয় অঞ্চলের এই বিপর্যয় শুধু নেপালের জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্যও সতর্কবার্তা। নেপালের জলবায়ু ন্যায়বিচার পাওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, হিমালয়ের গ্লেসিয়ার গলে গেলে গঙ্গা ও ত্রিশূলীর মতো নদীর ওপর নির্ভরশীল দক্ষিণ এশিয়ার ২০০ কোটির বেশি মানুষ পানিসংকটে পড়বে।
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএফসিসি) অধীন গঠিত ‘ফান্ড ফর রেসপন্ডিং টু লস অ্যান্ড ড্যামেজেস’ (এফআরএলডি)-এর কাছে দ্রুত আর্থিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছে নেপালের অর্থ মন্ত্রণালয়। এই তহবিলটি গঠন করা হয়েছিল আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে দ্রুত অর্থ বিতরণের জন্য, যা গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের মতো তহবিলে সম্ভব হয় না।
তবে তহবিলের পর্যাপ্ততা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৬ সাল পর্যন্ত ২৭টি দাতাগোষ্ঠী ৮২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রতিশ্রুতি দিলেও ট্রাস্টি অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে ৪৪৯ মিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। বিশ্বব্যাংক এই তহবিলের ট্রাস্টি হিসেবে কাজ করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুক্তভোগী দেশগুলোর জন্য বছরে ২০০ থেকে ৪০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন। বাধ্যতামূলক অর্থ সংস্থানের ব্যবস্থা না হলে ২০২৮ সালের আগেই এই তহবিল ফুরিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছে অভ্যন্তরীণ সচিবালয়।
তাই শিল্পোন্নত দেশগুলোর দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। নিজেদের ঐতিহাসিক দায় তারা এড়াতে পারে না। বৈশ্বিক জলবায়ু ন্যায্যতা কেবল শব্দ হিসেবেই থাকবে নাকি বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হবে, নেপালের এই সংকট তারই এক বড় পরীক্ষা।