যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনবহুল অঙ্গরাজ্য টেক্সাসে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা অবস্থানে রয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নতুন নেতৃত্বের আগমনে এই দৃশ্যপট বদলে যাওয়ার প্রবল আশা করছেন ডেমোক্র্যাট সমর্থকরা।
ডেমোক্র্যাটদের এই আশার আলো দেখাচ্ছেন ৩৭ বছর বয়সী সিনেট প্রার্থী জেমস টালারিকো। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৮৮ সালের পর প্রথমবারের মতো টেক্সাসের সিনেট আসনটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে যাওয়ার এক নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আগামীকাল মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে টেক্সাসের একটি সিনেট আসন নিয়ে লড়াই হবে। এই লড়াইয়ে টালারিকোর প্রধান রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন কেন প্যাক্সটন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ডেমোক্র্যাটরা যদি এই লড়াইয়ে জয়ী হতে পারেন, তবে টেক্সাসসহ পুরো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকান পার্টিকে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। এটি দলের জন্য একটি বড় ধরনের মানসিক ধাক্কা হিসেবে গণ্য হবে। টেক্সাসের রিপাবলিকান নির্বাচনী কৌশলবিদ ব্রেন্ডান স্টেইনহাউজার এই বিষয়ে বলেন, ‘ডেমোক্র্যাটরা যদি সত্যিই জয়ী হতে পারেন, তাহলে টেক্সাসসহ পুরো যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকান পার্টিকে নিজেদের অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। এতে দলটি মানসিকভাবেও বড় ধাক্কা খাবে।’
নির্বাচনের এই গুরুত্বের কারণেই টেক্সাসের সিনেট লড়াইটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এবারের নির্বাচনে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ৫০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
রাজনীতিতে জেমস টালারিকোর উত্থান অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। ২০২৫ সালেও তিনি অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে তুলনামূলকভাবে অপরিচিত একজন ডেমোক্র্যাট নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে তিনি টেক্সাসের লাবক শহরে সফর করেন। সেখানকার ফিয়েস্তা সেন্টারে তাঁকে দেখার জন্য মানুষের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। মৃদুস্বরে কথা বলা টালারিকো একসময় খ্রিষ্টান ধর্মযাজক হওয়ার জন্য পড়াশোনা করেছিলেন। তাঁকে একনজর দেখতে আসা মানুষের ভিড় ভবন ছাড়িয়ে বিশাল পার্কিং লট এবং ব্যস্ত সড়ক পর্যন্ত দীর্ঘ হয়ে গিয়েছিল।
টালারিকো তাঁর বক্তব্যে রক্ষণশীল রাজনৈতিক নেতৃত্বের কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের অর্থনৈতিক দুর্দশার প্রতি বর্তমান নেতৃত্বের কোনো সংবেদনশীলতা নেই। এছাড়া রাজনীতিতে বিপুল অর্থের ক্ষতিকর প্রভাবের তীব্র নিন্দা জানান তিনি। সিনেটে দুর্নীতিবিরোধী একটি ‘সর্বাত্মক কর্মসূচি’ এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
পশ্চিমাঞ্চলের ধুলোমাখা সমতল ভূমিতে অবস্থিত প্রায় আড়াই লাখ মানুষের এই লাবক শহরে নির্বাচনের ঠিক আগে একজন বড় ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর সফর ছিল অত্যন্ত ব্যতিক্রমী ঘটনা। কারণ, মাত্র দুই বছর আগে এই শহরের ভোটারদের একটি বড় অংশ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন। লাবকের পাশের হকলি কাউন্টির ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান অ্যারন গনজালেজ এই পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, ‘এটা দেখতে সত্যিই দারুণ লাগছে। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন।’
প্রায় তিন হাজার সমর্থকের সামনে মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেন টালারিকো। বাইরে আরও প্রায় এক হাজার মানুষ স্পিকারে তাঁর কথা শোনেন। এ বছর যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা যে ধরনের প্রচার কৌশল অবলম্বন করছেন, টালারিকোর বক্তব্যও ছিল অনেকটা সেই ধাঁচের, তবে তাতে টেক্সাসের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য মিশে ছিল।
তিনি রক্ষণশীল রাজনৈতিক নেতৃত্বের কঠোর সমালোচনা করে বলেন যে, সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের অর্থনৈতিক দুর্দশার প্রতি এই নেতৃত্বের কোনো সংবেদনশীলতা নেই। রাজনীতিতে বিপুল অর্থের ক্ষতিকর প্রভাবেরও নিন্দা জানান তিনি। সিনেটে দুর্নীতিবিরোধী ‘সর্বাত্মক কর্মসূচি’ এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে টালারিকো বলেন, ‘টেক্সাসের মানুষ পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত। চরমপন্থা ও দুর্নীতির দিন শেষ। বিভেদ সৃষ্টির রাজনীতিও আর নয়। মানুষ এখন নতুন কিছু চায়।’
নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দুই সপ্তাহের জন্য টালারিকো যে স্লোগানটি বেছে নিয়েছেন তা হলো ‘স্বচ্ছ দৃষ্টি, পূর্ণ হৃদয়, হারার কোনো সুযোগ নেই’।
লাবকের সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন টেক্সাস টেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অ্যান্ড্রু রবিনসন। ২৬ বছর বয়সী রবিনসনের কাছে টালারিকোর বক্তব্য আকর্ষণীয় মনে হলেও তাঁর মনে কিছুটা সংশয় ছিল। কারণ, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে দেখেছেন যে টেক্সাসে রাজনৈতিক অবস্থান তৈরির চেষ্টা করেও ডেমোক্র্যাটরা বারবার ব্যর্থ হয়েছেন। রবিনসন বলেন, ‘টালারিকো জিতলে তা আমার কাছে অনেক বড় ব্যাপার হবে। টেক্সাসে থেকে যাওয়ার ইচ্ছা আমার খুব একটা ছিল না। তবে সরকার পরিবর্তন হলে এটা আমার এখানে থেকে যাওয়ার একটা কারণ হতে পারে।’
উল্লেখ্য যে, ২০১৬, ২০২০ ও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে টেক্সাসে জয়ী হয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।