তিনজন সাহসী নারী গোয়েন্দা, যাঁরা বিপদে পড়ে অন্যের অপেক্ষায় বসে না থেকে নিজেরাই অপরাধীর পিছু নেন এবং রহস্যের জট খোলেন। সত্তরের দশকের টেলিভিশন পর্দায় এই তিন নারীর দুঃসাহসিক অভিযান দর্শকদের দারুণভাবে মুগ্ধ করেছিল। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কেলি গ্যারেট চরিত্রে অভিনয় করা জ্যাকলিন স্মিথ। ‘চার্লিস অ্যাঞ্জেলস’ সিরিজটি তাঁকে আন্তর্জাতিক স্তরে তারকাখ্যাতি এনে দিয়েছিল। সেই পরিচিতিকে পুঁজি করে পরবর্তীতে তিনি অভিনয় এবং ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে এক দীর্ঘ ও সফল কর্মজীবন গড়ে তোলেন।

আজ সোমবার, ২৬ অক্টোবর, মার্কিন এই জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও উদ্যোক্তার ৮১তম জন্মদিন। ১৯৪৫ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের হিউস্টনে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। এবারের জন্মদিনের বিশেষত্ব হলো, তাঁর সবচেয়ে পরিচিত সিরিজ ‘চার্লিস অ্যাঞ্জেলস’-এর পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হওয়ার বিশেষ উপলক্ষও এই সময়ের সঙ্গে মিলে গেছে। উল্লেখ্য, সিরিজটি ১৯৭৬ সালে যাত্রা শুরু করেছিল।

শৈশবে জ্যাকলিনের স্বপ্ন ছিল একজন পেশাদার ব্যালে নৃত্যশিল্পী হওয়ার। মাত্র তিন বছর বয়স থেকেই তিনি নাচ শেখা শুরু করেন। টেক্সাসের ট্রিনিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় বিভিন্ন মঞ্চ প্রযোজনায় অংশ নেন তিনি। এরপর নাচের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে তিনি নিউইয়র্কে পাড়ি জমান। তবে সেখানেই তাঁর কর্মজীবনের মোড় ঘুরে যায়। তিনি বিজ্ঞাপনে কাজের সুযোগ পান এবং লিস্টারিন ও ব্রেক শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে দর্শকদের কাছে পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তীতে ‘ম্যাকক্লাউড’ ও ‘সুইচ’-এর মতো টেলিভিশন সিরিজে অভিনয় করলেও, তখনো তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগটি আসেনি।

১৯৭৬ সালে টেলিভিশনে শুরু হয় ‘চার্লিস অ্যাঞ্জেলস’-এর যাত্রা। এই মূল সিরিজেই কেলি গ্যারেট চরিত্রে অভিনয় করেন জ্যাকলিন। প্রধান তিন নারী চরিত্রে তাঁর সঙ্গী ছিলেন ফারাহ ফসেট ও কেট জ্যাকসন। অপরাধ তদন্তে নামা এই নারীদের অভিযান দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে সিরিজটিতে নারী চরিত্রের উপস্থাপন নিয়ে কিছু সমালোচনাও ছিল। গ্ল্যামার ও পোশাককে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি আলোচনায় আসে নারীদের সাহসী ও কর্মক্ষম চরিত্রে দেখানোর বিষয়টি।

মূল টেলিভিশন সিরিজটি ১৯৮১ সাল পর্যন্ত সম্প্রচারিত হয়। সময়ের সাথে সাথে প্রধান নারী অভিনয়শিল্পীদের তালিকায় পরিবর্তন এলেও, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঁচ মৌসুমেই ছিলেন জ্যাকলিন—শুরুর তিন ‘অ্যাঞ্জেল’-এর মধ্যে একমাত্র তিনিই ছিলেন দীর্ঘস্থায়ী। কেলি গ্যারেট চরিত্রটি তাঁর অভিনয়জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ও পরিচিত চরিত্রে পরিণত হয়।

পরবর্তীতে নতুন প্রজন্মের অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে বড় পর্দায় ফিরে আসে ‘চার্লিস অ্যাঞ্জেলস’। ২০০০ সালে মুক্তি পাওয়া একই নামের সিনেমায় অভিনয় করেন ক্যামেরন ডিয়াজ, ড্রু ব্যারিমোর ও লুসি লিউ। ২০০৩ সালে এর সিকুয়েল ‘চার্লিস অ্যাঞ্জেলস: ফুল থ্রটল’ মুক্তি পায়। ২০১১ সালে নতুন করে টেলিভিশন সিরিজ তৈরি হলেও তা এক মৌসুমেই শেষ হয়ে যায়। এরপর ২০১৯ সালে ক্রিস্টেন স্টুয়ার্ট, নাওমি স্কট ও এলা বালিনস্কাকে নিয়ে আরও একটি ‘চার্লিস অ্যাঞ্জেলস’ সিনেমা মুক্তি পায়। এই ফিরে আসার ইতিহাসে জ্যাকলিনের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৩ ও ২০১৯ সালের সিনেমায় কেলি গ্যারেট চরিত্রে সংক্ষিপ্ত উপস্থিতি জানান দেন তিনি, যা পুরোনো সিরিজের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের অভিযানের এক যোগসূত্র হিসেবে কাজ করে।

একটি জনপ্রিয় চরিত্র অনেক সময় অভিনেতার অন্যান্য কাজকে আড়াল করে দেয়। জ্যাকলিনের ক্ষেত্রেও কেলি গ্যারেটের পরিচয় ছিল অত্যন্ত প্রবল। তবে সিরিজটি শেষ হওয়ার পর তিনি টেলিভিশন চলচ্চিত্র ও মিনিসিরিজে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। ‘জ্যাকলিন বুভিয়ের কেনেডি’ টেলিভিশন চলচ্চিত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফার্স্ট লেডির চরিত্রে অভিনয় তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ। এই অসাধারণ অভিনয়ের জন্য ১৯৮২ সালে তিনি গোল্ডেন গ্লোবে মনোনয়ন পান। এরপর তাঁর কাজের তালিকায় যুক্ত হয় ‘রেজ অব অ্যাঞ্জেলস’, ‘জর্জ ওয়াশিংটন’ ও ‘দ্য বোর্ন আইডেনটিটি’-র মতো মিনিসিরিজ। পরবর্তী সময়ে ‘দ্য ডিস্ট্রিক্ট’-এর মতো সিরিজেও অভিনয় করেছেন তিনি। অভিনয়ের বাইরে তিনি হেয়ারস্টাইলিং প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠান ‘শিয়ার জিনিয়াস’ উপস্থাপনা করেছেন। জ্যাকলিনের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে পঞ্চাশটিরও বেশি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন প্রযোজনা রয়েছে।

পর্দায় জনপ্রিয়তার পর ১৯৮৫ সালে জ্যাকলিনের কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। মার্কিন খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান কেমার্টের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি নারীদের পোশাক ও আনুষঙ্গিক পণ্যের সংগ্রহ বাজারে আনেন। সে সময়ে তারকাদের নিজস্ব ফ্যাশন ব্র্যান্ড আজকের মতো এত প্রচলিত ছিল না। তবে তাঁর নামের পোশাকের সংগ্রহটি শুরুর দিকের সফল উদ্যোগগুলোর একটি হয়ে ওঠে।

পোশাকের পর তিনি ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন ঘর সাজানোর সামগ্রী ও সুগন্ধির ক্ষেত্রে। জ্যাকলিনের আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে ঘর সাজানোর কাপড় ও সংশ্লিষ্ট উপকরণ নিয়ে ট্রেন্ড/ফ্যাব্রিকাটের সঙ্গে কাজ শুরু করেন তিনি। পরের বছর কেমার্টে তাঁর বিছানা ও টয়লেট সাজসজ্জার পণ্যের সংগ্রহ যুক্ত হয়।

২০০৮ সালে হেয়ারস্টাইলিস্ট হোসে এবার ও পলা ইয়ংয়ের সঙ্গে তিনি ‘স্টাইল বাই জ্যাকলিন স্মিথ’ নামক হেয়ার ফ্যাশন উদ্যোগ চালু করেন। ২০১০ সালে স্বামী চিকিৎসক ব্র্যাড অ্যালেনের সঙ্গে ত্বকের যত্নের পণ্য নিয়েও কাজ করেন তিনি। এভাবে পোশাক থেকে ঘরের সাজ, চুলের ফ্যাশন থেকে ত্বকের পরিচর্যা—নানা পণ্যের সঙ্গে যুক্ত হয় তাঁর নাম। দশকের পর দশক পেরিয়েও ফ্যাশন ব্যবসার সঙ্গে জ্যাকলিনের সম্পর্ক অটুট। ২০২২ সালে এইচএসএনের সঙ্গে নতুন ব্যবসায়িক অধ্যায় শুরু করেন তিনি এবং প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয়তালিকায় এখনো তাঁর নামের পোশাক রয়েছে।

পঞ্চাশ বছর পর ফিরে দেখার কথা বলে এ বছর প্রকাশিত হয়েছে জ্যাকলিনের স্মৃতিকথা ‘আই ওয়ান্স নিউ আ গাই নেমড চার্লি’। সেখানে ‘চার্লিস অ্যাঞ্জেলস’ তৈরির নেপথ্যের গল্প, সহশিল্পীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং পর্দার বাইরের জীবন উঠে এসেছে। নাচের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করা এক তরুণী কীভাবে অভিনেত্রী ও উদ্যোক্তা হয়ে উঠলেন, সেই জীবনসংগ্রামও রয়েছে বইটিতে। অক্টোবরে দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জ্যাকলিন জানিয়েছেন, “৫০ বছর পরও সিরিজটি নিয়ে কথা বলতে হবে, এমনটা তাঁরা ভাবেননি।” তাঁর আশা, সেই নারী গোয়েন্দাদের অভিযান দর্শকদের সাহসী ও স্বাধীন হতে উৎসাহ দিয়েছে।