ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রামলীলা ময়দানে আয়োজিত বিশাল জনসভাটি সফল নাকি ব্যর্থ, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বিরোধীদের দাবি অনুযায়ী সেখানে প্রকৃত ভিড় ছিল নাকি কৃত্রিমভাবে ভিড় দেখানো হয়েছে, তা নিয়েই এখন লড়াই চলছে শাসক দল বিজেপি এবং বিরোধী জোটের মধ্যে। ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি কেবল ভিড়ের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্নই তোলেনি, বরং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু এক গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। তাঁর দাবি, জনসভার ভিড় বাড়িয়ে দেখাতে কংগ্রেস নেতৃত্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বা এআই-এর (AI) সাহায্য নিয়েছে। তবে রিজিজুর মতে, সেই কারসাজিটুকুও তারা সঠিকভাবে করতে পারেনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কংগ্রেস নেতাদের পোস্ট করা জমায়েতের কিছু ছবি দেখিয়ে কিরেন রিজিজু কটাক্ষ করে লিখেছেন, ভিড় দেখাতে এআইয়ের ব্যবহারটাও তারা ঠিকঠাক করতে পারেনি।

কেবল রিজিজুই নন, বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্রও এই ভিড়ের দাবি নিয়ে সরাসরি কথা বলেছেন। গত রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, কংগ্রেসের লক্ষ্য ছিল ১০ লাখ মানুষকে হাজির করা, কিন্তু বাস্তবে সেখানে এসেছে বড়জোর ২৮ হাজার মানুষ। নিজের দাবির সপক্ষে সম্বিত পাত্র একটি ভিডিও ক্লিপ প্রদর্শন করেন। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, সাদা কাপড়ে মোড়ানো কয়েকশ চেয়ার সম্পূর্ণ খালি পড়ে আছে এবং কিছু মানুষ অলসভাবে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ভিডিওর দৃশ্য দেখে বোঝা যায় সেটি সন্ধ্যাবেলায় ধারণ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, রোববার রামলীলা ময়দানের ওই সভা বিকেল সাড়ে চারটার দিকে শেষ হয়। দিল্লি পুলিশের নির্দেশনা ছিল, বিকেল পাঁচটার মধ্যে জনসভা শেষ করে ময়দানটি সম্পূর্ণ খালি করে দিতে হবে, কারণ রাতে সেখানে কাউকে থাকতে দেওয়া হবে না।

কিরেন রিজিজু যে ছবিটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, সেটি রোববার রাতে ‘এক্স’ প্ল্যাটফর্মে পোস্ট করেছিলেন গুজরাটের সাবেক কংগ্রেস সংসদ সদস্য জগদীশ ঠাকোর এবং তেলেঙ্গানার কংগ্রেস সংসদ সদস্য বামসি গদ্দামসহ আরও কয়েকজন নেতা। ওই ছবিতে রামলীলা ময়দানের মঞ্চ এবং ভিড় দেখা যাচ্ছে, যেখানে মঞ্চের একপাশে সোনিয়া গান্ধীর এবং অন্যপাশে রাহুল গান্ধীর বিশাল ছবি লাগানো ছিল।

রিজিজুর দাবি অনুযায়ী, রোববারের সমাবেশের মঞ্চটি ছিল ভিন্ন। ওই সমাবেশে রামলীলা ময়দানে কংগ্রেসসহ বিভিন্ন বিরোধী দলের পতাকা হাতে মানুষ এসেছিলেন। অথচ তাঁর দাবি করা ‘নকল’ ছবিতে কেবল কংগ্রেসের পতাকাই দেখা যাচ্ছে। এই বিষয়টি উল্লেখ করেই রিজিজু কটাক্ষ করে বলেছেন, কংগ্রেস নকলটাও ঠিকমতো করতে পারেনি।

তবে এই বিতর্কিত ছবি এবং কিরেন রিজিজুর কটাক্ষের বিষয়ে কংগ্রেস পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি। রোববার বিক্ষোভ সমাবেশে ভিড় কম ছিল—এই দাবিও তারা মানতে নারাজ। বরং রাহুল গান্ধী ড্রোন ক্যামেরায় ধারণ করা বিপুল জনসমাগমের ভিডিও পোস্ট করেছেন। ভোট চুরির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে রেকর্ড সংখ্যক মানুষের উপস্থিতির জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি লিখেছেন, বোঝা যাচ্ছে গণতন্ত্রই জয়ী হবে, সত্যের জয় হবে, ‘ইন্ডিয়া’র জয় হবে।

রাহুল গান্ধীর এই পোস্টের পর বিজেপি মুখপাত্র সম্বিত পাত্র পুনরায় কটাক্ষ করে বলেন, এসব ছবি তোলার কারসাজি। কারসাজি করে কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন না।

তবে বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রোববারের বিক্ষোভ সমাবেশটি ছিল সর্বদিক থেকে বর্ণময়। বিভিন্ন গণমাধ্যম যখন এই সমাবেশের লাইভ সম্প্রচার করছিল, তখন দেখা গেছে রামলীলা ময়দানটি পুরোপুরি জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। এমনকি ময়দানের ঘেরাটোপের বাইরেও প্রচুর মানুষের ভিড় ছিল, যাদের ভেতরে ঢোকার সুযোগ হয়নি।

কংগ্রেসের বেশ কয়েকজন নেতার বরাত দিয়ে সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমস এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, এই সমাবেশের জন্য কংগ্রেস নেতৃত্ব অনেক আগে থেকেই সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি নিয়েছিল। তেলেঙ্গানার একজন কংগ্রেস নেতা জানিয়েছেন, রাজ্যের প্রতিটি নেতাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যেন তারা অন্তত একশ জন কর্মী ও সমর্থককে দিল্লি নিয়ে আসেন। তাদের জন্য দিল্লির বিভিন্ন এলাকার হোটেলে আগে থেকেই থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

গত রোববার কনট প্লেস ও মিন্টো রোডের ক্রসিং থেকে দেড় কিলোমিটার দূর পর্যন্ত রামলীলা ময়দানে যাওয়ার রাস্তাটি দুই ঘণ্টা ধরে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছিল। রঙিন পতাকার পাশাপাশি মিছিলকারী নারী ও পুরুষদের মধ্যে নিজ নিজ রাজ্যের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ফুটে উঠেছিল। বিশেষ করে ঝাড়খন্ড, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ এবং গুজরাটের আদিবাসীরা তাদের ঐতিহ্যগত পোশাক পরে ঢাকঢোল ও বাঁশি বাজিয়ে গান গাইতে গাইতে মিছিলে অংশ নেন।

ছত্তিশগড়ের নেতা রামনারায়ণ সিং রাথিয়া জানান, এই আদিবাসী মানুষগুলো অনেক আগেই দিল্লিতে পৌঁছেছিলেন। মিছিলে অংশ দেওয়া ছাড়াও তারা দিল্লি শহর ঘুরে দেখেছেন। তাঁদের অনেকের জন্যই এটি ছিল প্রথমবার দিল্লি সফর।

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা এবং এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের এই সমাবেশটিকে সফল করতে কংগ্রেস আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। প্রতিটি রাজ্যের নেতৃত্বকে এই জন্য বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এই আন্দোলনের মাধ্যমে কংগ্রেস নেতৃত্ব দলের বিভিন্ন স্তরে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করেছে।

দীর্ঘদিন পর এই সমাবেশে কংগ্রেস সেবাদলের সক্রিয় উপস্থিতিও লক্ষ্য করা গেছে। জানা গেছে, ‘ইন্ডিয়া’ জোট আগামীতে বিভিন্ন রাজ্যে এ ধরনের জনসভা করবে। যে রাজ্যে যে দল বেশি শক্তিশালী, সেই দলের ওপরই সমাবেশের প্রধান দায়িত্ব অর্পণ করা হবে। যেমন, দিল্লির রামলীলা ময়দানের এই সমাবেশের আয়োজনের দায়িত্ব ছিল কংগ্রেসের হাতে।