ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রামলীলা ময়দানে আগামীকাল রোববারের প্রস্তাবিত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে সেখানে পৌঁছানোর জন্য বিরোধী দলীয় নেতাদের মিছিল করার অনুমতি দেবে কি পুলিশ? এই প্রশ্নটি এখন সামনে চলে এসেছে। কারণ, গত শুক্রবার কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী আকস্মিকভাবে একটি ইনস্টাগ্রাম পোস্টের মাধ্যমে জানান যে, ১ নভেম্বর স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় কনট প্লেস ও মিন্টো রোডের সংযোগস্থল থেকে একটি মিছিলের মাধ্যমে তাঁরা রামলীলা ময়দানে যাবেন।

দিল্লি পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রামলীলা ময়দানে সমাবেশের জন্য আয়োজকদের পক্ষ থেকে অনুমতি চাওয়া হয়েছিল এবং পুলিশ সেই অনুমতি প্রদান করেছে। তবে কনট প্লেস ও মিন্টো রোড ক্রসিং থেকে কোনো মিছিল করার বিষয়ে আয়োজকদের পক্ষ থেকে কোনো আবেদন জানানো হয়নি। এমনকি এই ধরনের কোনো মিছিলের পরিকল্পনা যে তাঁদের রয়েছে, সে বিষয়েও পুলিশকে অবহিত করা হয়নি।

এর ফলে বেশ কিছু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পুলিশ কি শেষ পর্যন্ত মিছিল করতে দেবে? মিছিল রুখতে কি ব্যারিকেড বসানো হবে? রাহুল গান্ধী ও অন্যান্য নেতারা মিছিল করতে গেলে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হবে কি না? এই বিষয়ে দিল্লি পুলিশের কর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং আগে থেকে কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে তাঁরা স্পষ্ট করেছেন যে, সমাবেশের অনুমতি চাওয়া হলেও মিছিলের কথা জানানো হয়নি।

রাহুল গান্ধী গত শুক্রবার ইনস্টাগ্রামে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি বলেন, “১ নভেম্বর দুপুর ১২টায় মিছিল শুরু হবে। মিন্টো রোড ও কনট প্লেস জংশন থেকে মিছিল শুরু হবে। রামলীলা ময়দান পর্যন্ত আমরা সবাই একসঙ্গে যাব।”

রাহুলের এই ভিডিও বার্তাটি কংগ্রেসের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করতে শুরু করে, যা দিল্লি পুলিশের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রোববারের এই রামলীলা সমাবেশে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা অভিজিৎ দিপ আগেই সমর্থন জানিয়েছিলেন। শুক্রবার এই সমাবেশকে সমর্থন জানান সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন আইসার নেত্রী নেহা বোরাও। নেহা এর আগেও ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন এবং রোববারও তিনি রামলীলা ময়দানে উপস্থিত থাকবেন। তবে সিজেপি শেষ পর্যন্ত যোগ দেবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।

অন্যদিকে, বিরোধীদের এই আন্দোলনের মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই রাস্তায় নেমেছে বিজেপি নেতৃত্ব। তাঁদের দৃষ্টিতে এই আন্দোলন দেশে অরাজকতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করার একটি প্রচেষ্টা মাত্র। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই বিরোধীদের তীব্র সমালোচনা করেছেন।

শুক্রবার গুজরাটের এক জনসভায় মোদি বলেন, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধের কারণে সারা পৃথিবীতে জ্বালানি ও সারের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, বিরোধীরা এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চাইছে।

মোদি আরও দাবি করেন, যুদ্ধের প্রভাব যাতে সাধারণ মানুষের ওপর না পড়ে, সেজন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন। অথচ বিরোধীরা সরকারের দুর্নাম করছে, মানুষকে ভুল তথ্য দিচ্ছে এবং তাঁকে ছোট করার চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, দেশ বিপদে পড়লে বিরোধীরা আনন্দ পায়।

প্রধানমন্ত্রী যখন এই সমালোচনা করছেন, ঠিক সেই সময়ে উত্তর প্রদেশের রাজধানী লক্ষ্ণৌয়ে এক দলীয় কর্মসূচিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বিরোধীদের সংসদে মুখোমুখি হওয়ার চ্যালেঞ্জ জানান।

অমিত শাহ বলেন, “ভোট চুরি নিয়ে আলোচনার জন্য তাঁরা সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকতে প্রস্তুত আছেন। কিন্তু তাঁরা ভালোভাবেই জানেন, সেই প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে রাহুল কখনোই সংসদে যাবেন না। আলোচনায় রাজিই হবেন না। তাঁরা রাস্তায় নেমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চান।”

শুধুমাত্র রাহুল গান্ধীই নন, সমাজবাদী পার্টির (এসপি) নেতা অখিলেশ যাদবকেও আক্রমণ করেন অমিত শাহ। তিনি বলেন, “রাহুল ও অখিলেশকে চ্যালেঞ্জ করছি, সংসদে এসে তাঁদের তোলা যেকোনো অভিযোগ নিয়ে আলোচনা করতে। আমরা প্রস্তুত। কিন্তু তাঁরা আসবেন না। কারণ তাঁরা জানেন, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ তোলা হয়েছে, প্রতিটিই ভিত্তিহীন। তাঁরা গণতান্ত্রিকভাবে আলোচনায় আগ্রহী নন। তাঁরা রাস্তায় নাটক করতে চান।”

উল্লেখ্য, ভোট চুরির অভিযোগ তুলে প্রায় এক বছর ধরে সরব বিরোধীরা। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ জানানো হলেও কমিশন এখন পর্যন্ত কোনো সংবাদ সম্মেলন করেনি এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়নি। সরকারও দীর্ঘ সময় ধরে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকার কোনো প্রস্তাব দেয়নি।

তাই এই শেষ মুহূর্তের প্রস্তাবকে বিরোধীরা গুরুত্ব দিতে প্রস্তুত নয়। বিরোধী নেতাদের দাবি, যে সরকার গত ১২ বছরে সংসদে একটি মুলতবি প্রস্তাবের আলোচনায় রাজি হয়নি, বিরোধীদের তোলা কোনো বিষয়ে মাথা ঘামায়নি এবং প্রধানমন্ত্রী কোনো সংসদ সদস্যের প্রশ্নের উত্তর দেননি, তাঁদের এই প্রস্তাব স্রেফ লোকদেখানো।

এদিকে, ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে রামলীলা ময়দানের সমাবেশটি কিছুদিনের জন্য পিছিয়ে দেওয়ার শেষ চেষ্টা করেছিল বিজেপি। রাহুল গান্ধীকে দুবার চিঠি লেখা হয় এবং সাক্ষাতের চেষ্টা করা হয়। এতে ব্যর্থ হয়ে ওই ব্যবসায়ী সংগঠন শুক্রবার সোনিয়া গান্ধীকে অনুরোধ করে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত সমাবেশ পিছিয়ে দেওয়ার জন্য। কংগ্রেস সেই অনুরোধে রাজি না হওয়ায় অমিত শাহ সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকার প্রস্তাব দেন।

দিল্লিতে দূষণের কারণে অন্য রাজ্যের গাড়ি প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হলেও রোববারের রামলীলা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এখন দেখার বিষয়, রাহুল গান্ধীসহ ইন্ডিয়া জোটের নেতারা মিছিল করে সেখানে পৌঁছাতে পারেন কি না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে রামলীলা ময়দান সংলগ্ন এলাকায় প্রায় চার হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং রাজধানীর অন্যান্য স্থানে আরও ৬ হাজার পুলিশ মোতায়েন থাকবে।