নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন সরকারবিরোধী আন্দোলনকে ‘নৈরাজ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিজেপি। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রচার শুরু করেছে দলটি, যাদের দাবি—নৈরাজ্য ও অরাজকতা সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য হলো জোর করে সরকার পরিবর্তন করা। এই ধরনের আন্দোলন দমনে উত্তর প্রদেশে নতুন সরকারি বিধি চালু করা হয়েছে। বিজেপিশাসিত এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ নতুন বিধি জারি করে স্পষ্ট জানিয়েছেন, হিংসাত্মক উপায়ে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার বদলের আন্দোলনে যুক্ত ব্যক্তিদের সরকারি চাকরিতে নিয়োগ করা হবে না।
এই লক্ষ্য অর্জনে সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের চরিত্র যাচাই বা ‘ক্যারেক্টর ভেরিফিকেশন’–এর প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা হয়েছে। এলাহাবাদ হাইকোর্টের নির্দেশ মেনে গত বৃহস্পতিবার রাজ্য সরকার এই নয়া নির্দেশিকা জারি করেছে। নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের পাশাপাশি পৌরসভা, পৌর পরিষদ এবং স্থানীয় প্রশাসনিক সংস্থাসমূহে নিয়োগের ক্ষেত্রে এই নীতি কার্যকর হবে।
সরকারি এই নির্দেশিকা সামনে আসার পরপরই রাজ্যজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, যোগী সরকার ব্রিটিশ আমলের মতো আচরণ শুরু করেছে। অন্যদিকে, ‘ভোটচুরির’ প্রতিবাদে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা এবং এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু করেছে। এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী কেউ কেউ দাবি করেছেন, তাঁরা বাংলাদেশের আন্দোলন থেকে প্রেরণা পেয়েছেন। আবার কেউ কেউ একে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার বদলের আন্দোলন হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিজেপি এই মন্তব্যগুলোকেই হাতিয়ার করে দাবি করছে, হিংসাত্মক আচরণের মাধ্যমে তারা সরকারের পতন ঘটাতে চাইছে।
নতুন সরকারি নির্দেশিকাতেও এই বিষয়ের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রচলিত ব্যবস্থাকে হিংসাত্মক উপায়ে পরিবর্তন করা যেসব সংগঠনের ঘোষিত লক্ষ্য, তেমন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত প্রার্থীরা সরকারি চাকরির জন্য অযোগ্য বলে প্রমাণিত হবেন।
রাজ্য সরকারের নিয়োগ ও কর্মীবর্গ দপ্তরের মুখ্য সচিব এম দেবরাজ এই নির্দেশিকা জারি করে জানিয়েছেন, ২১ বছর পূর্ণ হওয়ার পর এবং চরিত্র যাচাইয়ের তারিখের পূর্ববর্তী তিন বছরের মধ্যে কেউ যদি এ ধরনের আন্দোলন ও কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তবে ধরে নেওয়া হবে তিনি এখনো সক্রিয়ভাবে ওই সব কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সেক্ষেত্রে ওই ব্যক্তি সরকারি চাকরি পাওয়ার অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। তবে ওই তিন বছরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আচরণ ও মনোভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলে এবং সেই বদলের অকাট্য প্রমাণ মিললে আবেদনটি পুনর্বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে।
তবে যোগী সরকার আশ্বস্ত করেছে যে, শুধুমাত্র রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কাউকে অযোগ্য মনে করা হবে না। এছাড়া কারও নামে এফআইআর থাকলে বা কারও বিরুদ্ধে কোনো মামলার তদন্ত চলমান থাকলেও তাঁকে সরাসরি অযোগ্য বলা হবে না। যাঁরা বেকসুর খালাস পেয়েছেন, কিংবা আপস মীমাংসার মাধ্যমে যাঁদের মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে অথবা যাঁদের বিরুদ্ধে জুভেনাইল জাস্টিস আইনে মামলা চলছে, সেসব ক্ষেত্রেও প্রার্থীদের নাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে অযোগ্য ঘোষিত হবে না।
অনেক ক্ষেত্রে চরিত্র যাচাইয়ের রিপোর্ট আসতে দেরি হয়। তেমন পরিস্থিতিতে কারও নিয়োগপত্র আটকে রাখা হবে না। প্রার্থীরা স্বঘোষণাপত্র বা সেলফ ডিক্লারেশন দিয়ে নিয়োগপত্র সংগ্রহ করতে পারবেন। তবে সেই নিয়োগপত্র হবে সাময়িক বা ‘প্রভিশনাল’। পরবর্তীতে চরিত্র যাচাইয়ের রিপোর্ট বিরূপ হলে কিংবা মিথ্যা ঘোষণাপত্র দিয়ে নিয়োগপত্র নেওয়া হয়েছে প্রমাণিত হলে তা বাতিল করা হবে এবং প্রার্থীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই নির্দেশিকার আগে যাঁরা চাকরি পেয়েছেন, তাঁদের চরিত্র নতুনভাবে যাচাই করা হবে না। যদিও সরকারি কর্তারা বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ চাইলে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন। নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনো সফল প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিরূপ রিপোর্ট এলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হবে।
এই নির্দেশিকা এমন এক সময়ে জারি করা হলো যখন বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোট তাদের ১ নভেম্বরের প্রস্তাবিত রামলীলা ময়দান অভিযান সফল করতে ব্যস্ত। বিরোধীদের ধারণা, ওই সমাবেশে যোগ দিতে উত্তর প্রদেশের যুব সম্প্রদায়কে অনাগ্রহী করে তোলাই এই নির্দেশিকা জারির অন্যতম প্রধান কারণ।
নির্দেশ জারির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই উত্তর প্রদেশের ১১টি বিধান পরিষদ নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, বিরোধী দল সমাজবাদী পার্টি (এসপি) আগের তুলনায় দুটি আসন বেশি পেয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনী কেন্দ্র বারানসিতে যে দুই আসনে ভোট ছিল, দুটিতেই বিজেপি প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন এবং এসপি প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন। লক্ষণীয় যে, এবার দেশে চার রাজ্যের বিধান পরিষদের যে ২৮টি আসনে ভোট হলো, তার ভোটার ছিলেন স্নাতক ও শিক্ষকেরা। ভোটের ফলাফল থেকে স্পষ্ট যে, উত্তর প্রদেশের শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে বিজেপির সমর্থন কমেছে এবং বিরোধীদের সমর্থন বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে নতুন নির্দেশিকা শাসক দলের জন্য হিতে বিপরীত হবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এসপি ও কংগ্রেস উভয় দলই সরকারি এই ফরমানের তীব্র সমালোচনা করে একে ‘কালা বিধি’ বলে অভিহিত করেছে। এসপি বলেছে, ‘ব্রিটিশরা রাজত্ব করার সময় এই ধরনের ফরমান জারি করত। আন্দোলনকারীদের দেশদ্রোহী বলত। স্বাধীন ভারতে আন্দোলন করার অধিকার সংবিধান স্বীকৃত। যুব সম্প্রদায়কে চাকরি না দেওয়ার ভয় দেখিয়ে সরকার সেই অধিকার খর্ব করতে চাইছে।’ অন্যদিকে কংগ্রেস বলেছে, বিজেপি ভয় পেয়েছে, তাই এমন ধরনের কালা বিধি জারি করেছে। তারা গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিতে চাইছে।