খন্দকের যুদ্ধের সেই উত্তাল সময়ে শত্রুপক্ষের একটি তির এসে বিঁধল আনসার সাহাবিদের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা সাদ ইবনে মুয়াজের (রা.) হাতের শিরায়। এতে তাঁর শরীর থেকে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হতে শুরু করে। এমন সংকটময় মুহূর্তে রাসুল (সা.) নির্দেশ দিলেন, ‘তাঁকে এমন এক নারীর কাছে নিয়ে যাও, যিনি আহতদের চিকিৎসা করেন।’

সেই অনন্য ব্যক্তিত্বের নাম রুফাইদা। হাদিসের বর্ণনা তাঁকে ইতিহাসের এমন এক উচ্চাসনে বসিয়েছে, যেখানে আধুনিক নার্সিংয়ের ইতিহাসেও তাঁর নাম অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। তাঁর পূর্ণ নাম রুফাইদা আল-আসলামিয়া। তবে ইবনে সাদ তাঁর আরেকটি নামের কথা উল্লেখ করেছেন, যা হলো কুআইবা বিনতে সাদ আল-আসলামিয়া। (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৮/২৯১, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮)

নিসবত অনুযায়ী ‘আল-আসলামিয়া’ শব্দটির অর্থ তিনি বনু আসলাম গোত্রের সদস্য ছিলেন। যদিও বর্তমান সময়ের অনেক লেখায় তাঁকে খাজরাজ গোত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। খন্দকের যুদ্ধে যখন সাদ ইবনে মুয়াজের হাতের শিরায় তির বিঁধেছিল, তখন তাঁকে রুফাইদা নামের সেই চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল, যিনি আহতদের সেবা ও চিকিৎসার কাজে নিয়োজিত ছিলেন।

ইবনে হাজারের বর্ণনা অনুযায়ী, রুফাইদা হিজরতের পর নবীজির কাছে বাইআত গ্রহণ করেছিলেন। (আল-আসকালানি, তাহজিবুত তাহজিব, ১২/৪২৬, দাইরাতুল মাআরিফ আন-নিজামিয়্যাহ, হায়দরাবাদ, ১৯০৭) এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে, তিনি মদিনায় নবীজির আগমনের আগে ইসলাম গ্রহণকারী ছিলেন না। তাঁর পিতা সাদ আল-আসলামি পেশায় একজন চিকিৎসক ছিলেন এবং তিনি তাঁর কন্যা রুফাইদাকে চিকিৎসার কলাকৌশল শিখিয়েছিলেন।

মসজিদে নববির চত্বরে রুফাইদার একটি নিজস্ব তাঁবু ছিল। সেখানে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে আহত ও অসুস্থ ব্যক্তিদের সেবা ও পরিচর্যা করতেন। খন্দকের যুদ্ধে আহত হওয়ার পর সাদ ইবনে মুয়াজের হাতের শিরায় তির লাগলে বলা হলো, ‘তাঁকে রুফাইদা নামের এক নারীর কাছে নিয়ে যাও, যিনি আহতদের চিকিৎসা করেন।’ (ইমাম বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ১১২৯)

সাদ ইবনে মুয়াজ (রা.) রুফাইদার এই তাঁবুতেই চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত সেখানেই তাঁর ইন্তেকাল হয়। মহানবী (সা.) নিয়মিতভাবে তাঁকে দেখতে সেখানে আসতেন। (আল-ওয়াকিদি, কিতাবুল মাগাজি, ২/৫১০, দারুল আলামি, বৈরুত, ১৯৮৯)

মুসলিম বিশ্বে রুফাইদা ‘প্রথম নার্স’ হিসেবে সুপরিচিত। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশক থেকে আরব দেশগুলোর নার্সিং-সাহিত্যে তাঁর এই পরিচয় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ইসলামের ইতিহাসে তাঁর সেই তাঁবুটিকে প্রথম ‘ফিল্ড হাসপাতাল’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

রুফাইদা কেবল মদিনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তিনি খায়বারের যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন এবং তাঁর সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ গনিমতের অংশ লাভ করেছিলেন। যুদ্ধের ময়দানের বাইরেও তিনি অসুস্থ, অসহায় এবং অনাথদের পাশে থেকে তাঁদের সেবা করে গেছেন।

মুসলিম বিশ্বে রুফাইদা ‘প্রথম নার্স’ হিসেবে পরিচিত। আরব দেশগুলোতে নব্বইয়ের দশক থেকে নার্সিং-সাহিত্যে এ পরিচয় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে। তাঁর তাঁবুকে ইসলামের ইতিহাসে প্রথম ফিল্ড হাসপাতাল বলা হয়।

কিছু ঐতিহাসিকের মতে, তিনি অন্যান্য নারীদের নার্সিং প্রশিক্ষণ প্রদান করতেন এবং চিকিৎসক দলের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতেন। যদিও নবীজির যুগে বর্তমান সময়ের মতো পেশাদার ‘নার্সিং’ শব্দটির সংজ্ঞা কী ছিল, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে ওমর হাসান কাসুলে (২০০৩) এবং আর. জানের (১৯৯৬) গবেষণায় তাঁর জীবনের অনেক অজানা ও অনালোচিত অধ্যায় সামনে এসেছে।

তাঁদের গবেষণায় উঠে এসেছে যে, প্রথম যুগের ইসলামি সমাজে একজন নারী কীভাবে প্রকাশ্যে এবং সামাজিক স্বীকৃতিসহ চিকিৎসাসেবা প্রদান করতেন এবং স্বয়ং নবীজি (সা.) সেখানে রোগীদের পাঠাতেন।

— ড. সাজেদা হোমায়রা : আলেমা ও গ্রন্থপ্রণেতা