কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ভ্রমণের আনন্দ যেন অনেক পর্যটকের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে প্রাণ হারানোর ঘটনাগুলো এখন যেন এক নিত্যদিনের ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি মুক্তকণ্ঠে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১২ বছরে এই প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে ৮৫ জন পর্যটকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, যা সৈকতের সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে মারাত্মক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিশেষ করে গত ২১ অক্টোবর মাত্র একদিনের ব্যবধানে পাঁচজন পর্যটক প্রাণ হারিয়েছেন।

নিরাপত্তাহীনতার এই চিত্র কেবল কক্সবাজার সৈকতেই সীমাবদ্ধ নয়। গত আগস্টে প্রকাশিত অন্য একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র টাঙ্গুয়ার হাওরে মাত্র চার মাসের ব্যবধানে পাঁচজন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া অতি সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী এলাকার পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকতে অবস্থিত একটি রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রায় ১০ জন পর্যটক প্রাণ হারান।

পরপর ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনাগুলো বাংলাদেশের পর্যটন খাতের চরম অব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তার চরম ঘাটতিকেই স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরেও পর্যটন খাতে একটি স্থায়ী ও সমন্বিত সুরক্ষাবলয় গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও হতাশাজনক একটি বিষয়।

সৈকতে এই প্রাণহানির পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে পর্যটকদের অসচেতনতা এবং প্রশাসনের দেওয়া সতর্কবার্তা অমান্য করার প্রবণতাকে চিহ্নিত করা যায়। পর্যটকদের একটি বড় অংশ লাল নিশানায় চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা কিংবা গুপ্তখালের স্থানগুলোকে উপেক্ষা করে সমুদ্রে নেমে পড়েন। সাঁতার না জেনেও লাইফ জ্যাকেট ছাড়া পানিতে নামা, জোয়ার-ভাটার সঠিক সময় না মানা কিংবা বিকেল পাঁচটার পর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় সাগরে অবস্থান নেওয়ার মতো উদাসীনতা মৃত্যুর প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

বিশেষত, সমুদ্রের তলদেশে তৈরি হওয়া গুপ্তখাল বা বড় গর্তের অবস্থান সম্পর্কে অনভিজ্ঞ পর্যটকেরা কোনো ধারণাই করতে পারেন না। তবে এর পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—হোটেল বা রিসোর্টে ওঠার পর পর্যটকদের সচেতন করতে ডিজিটাল বার্তা, আগাম নিবন্ধন কিংবা প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়ার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা কেন আজও গড়ে ওঠেনি?

পর্যটকদের ব্যক্তিগত অসচেতনতার পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকেও এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অরক্ষিত সৈকতের বহু স্থানে পর্যাপ্ত উদ্ধারকারী নেই। তবে সবচেয়ে অবিশ্বাস্য তথ্যটি হলো, দীর্ঘ চার যুগেও একজন ডুবুরি নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

কক্সবাজারে প্রতিদিন যেখানে কয়েক লাখ মানুষ সৈকতে ভিড় করেন, সেখানে পর্যটকদের নিরাপত্তা কোনোভাবেই অবহেলার বিষয় হতে পারে না। সৈকতজুড়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক দক্ষ লাইফগার্ড নিয়োগ, জরুরি উদ্ধারের জন্য আধুনিক সরঞ্জামসহ ডুবুরি দল পদায়ন এবং অরক্ষিত পয়েন্টগুলোতে কার্যকর নজরদারি জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে হোটেলগুলোতে অবস্থানকালে নিবন্ধনের সময় সচেতনতামূলক গাইডলাইন এবং ডিজিটাল মেসেজ পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। মনে রাখতে হবে, পর্যটন কেবল আয়ের উৎস হতে পারে না; পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় প্রশাসনের মৌলিক দায়িত্ব।