কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে গোসল করতে নেমে গত ১২ বছরে প্রাণ হারিয়েছেন ৮৫ জন পর্যটক। এই দীর্ঘ সময়ে সাগরে ভেসে গিয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১ হাজার ২০০ জনকে। সৈকতে গোসল করতে নেমে পর্যটকেরা প্রায়ই ভয়াবহ দুর্ঘটনার সম্মুখীন হচ্ছেন বলে জানা গেছে।

উদ্ধার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দাবি, সৈকতের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করতে লাল নিশানা উড়িয়ে দেওয়া হলেও অনেক পর্যটকই তা উপেক্ষা করেন। এমনকি সাঁতার না জানা পর্যটকরাও লাইফ জ্যাকেট ছাড়াই পানিতে নেমে পড়ছেন, যা তাঁদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক ঘটনার কথা উল্লেখ করে জানা যায়, গত বুধবার বিকেলে কক্সবাজারের হিমছড়ি সৈকতে গোসল করতে নেমে পাঁচ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। সৈকতে এমন দুর্ঘটনা রোধ করতে পর্যটকদের জন্য ১০টি বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে জেলা প্রশাসন। লিফলেট, বিলবোর্ড এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এসব নির্দেশনার ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

জেলা প্রশাসনের দেওয়া সেই নির্দেশনাগুলোর মধ্যে রয়েছে: সাঁতার না জানলে অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট পরে পানিতে নামা; লাল নিশানা চিহ্নিত স্থানে গোসল না করা; লাইফগার্ডের নির্দেশনা মেনে চলা, বিকেল পাঁচটার পর সমুদ্রে না নামা এবং জোয়ার-ভাটা ও আবহাওয়ার অবস্থা জেনে নেওয়া। এ ছাড়া লাইফগার্ড নেই এমন এলাকায় গোসল না করা, ভাসমান বস্তু নিয়ে পানিতে নামার আগে বাতাসের গতি সম্পর্কে জানা, শিশুকে একা সমুদ্রে নামতে না দেওয়া এবং অসুস্থ বা দুর্বল শরীর নিয়ে হাঁটুপানির বেশি গভীরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

গত শুক্রবার দুপুরে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে অন্তত ৫০ হাজার পর্যটকের সমাগম দেখা গেছে, যা বিকেলে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯০ হাজারে। পর্যটকদের অনেকেই সাগরে গোসল করছিলেন। কেউ টিউবে ভেসে ঢেউয়ের সঙ্গে খেলছিলেন, আবার কেউ জেটস্কিতে চড়ে গভীর সাগরের দিকে যাচ্ছিলেন। শিশু-কিশোরদেরও গোসলে নামতে দেখা গেছে, যাদের বেশির ভাগেরই লাইফ জ্যাকেট ছিল না।

নিরাপদ গোসলের বিষয়ে পর্যটকদের নানাভাবে সচেতন করা হলেও অধিকাংশ পর্যটক নিয়ম মেনে চলেন না। একসঙ্গে কয়েক লাখ পর্যটক যখন উন্মুক্ত সৈকতে নেমে পড়েন, তখন তাঁদের সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সৈকতের বালুচরে তখন একাধিক লাল নিশানা উড়ছিল এবং লাইফগার্ড সদস্যরা বাঁশি বাজিয়ে পর্যটকদের সতর্ক করছিলেন। তাঁরা জানাচ্ছিলেন, লাল নিশানা চিহ্নিত এলাকায় পানির নিচে গুপ্তখাল রয়েছে এবং সেখানে আটকা পড়লে বিপদের আশঙ্কা থাকে। কিন্তু এসব সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেই অনেকে গোসলে ব্যস্ত ছিলেন।

সুগন্ধার দক্ষিণে কলাতলী এবং উত্তরে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত আরও চার কিলোমিটার এলাকায় জড়ো হয়েছিলেন ৫০ থেকে ৬০ হাজার পর্যটক। কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় একাধিক লাল নিশানা উড়লেও অনেকে তা আমলে নিচ্ছিলেন না।

বেসরকারি লাইফগার্ড প্রতিষ্ঠান সি-সেফের আটজন কর্মী সুগন্ধা পয়েন্টে পর্যটকদের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করছিলেন। সৈকতের বালুচরে স্থাপিত তিনটি ওয়াচ টাওয়ারে বসে হলুদ টি-শার্ট পরা সাতজন লাইফগার্ড পানিতে নামা পর্যটকদের নজরে রাখছিলেন। ঢেউয়ের ধাক্কায় টিউব থেকে ছিটকে পড়তে দেখা যায় অনেককে, যাদের লাইফগার্ড ও জেলা প্রশাসনের বিচের কর্মীরা দ্রুত উদ্ধার করে আনেন।

লাইফগার্ড ও বিচের কর্মীরা জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কলাতলী, সুগন্ধা, সিগাল ও লাবণী—এই চার পয়েন্টের পাঁচ কিলোমিটার সৈকতে অন্তত দেড় লাখ পর্যটক গোসলে নেমেছেন। এর আগের কয়েক দিনে নেমেছেন আরও অন্তত ছয় লাখ পর্যটক। শুক্রবার সাগরে ভেসে যাওয়ার সময় অন্তত ৩০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, তবে ওই দিন এসব পয়েন্টে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

সি-সেফের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে গোসল করতে নেমে ৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সাগরে ভেসে যাওয়ার সময় উদ্ধার করা হয়েছে ১ হাজার ২০০ জনকে। চলতি বছরের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে পাঁচ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ ২১ অক্টোবর এক দিনেই প্রাণ গেছে আরও পাঁচজনের।

ঢাকা থেকে আসা পর্যটক সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, “এক কিলোমিটার সৈকতে যখন ৬০-৭০ হাজার মানুষ নামে, তখন লাল নিশানা বা পতাকার দিকে কারও নজর যায় না। সবাই গোসলে নামার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। প্রাণহানি ঘটলে তখন হুঁশ হয়, ততক্ষণে করার কিছু থাকে না। হোটেল-রিসোর্টে ওঠার আগে পর্যটকদের গোসলের ঝুঁকির বিষয়ে গাইডলাইন দেওয়া গেলে কাজে আসত।”

পর্যটক হারুন অর রশিদ বলেন, “দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ কক্সবাজারে বেড়াতে আসেন। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। পর্যটকদের হোটেল ওঠার সময় অনলাইন নিবন্ধন এবং নিবন্ধিত পর্যটকদের ঝুঁকির বিষয়টি ম্যাসেজে জানানোর সিস্টেম চালু হলে কাজে আসত।”

হোটেল মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২১ অক্টোবর প্রতিমা বিসর্জনের দিন পর্যন্ত দুর্গাপূজার ছুটিতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে অন্তত ছয় লাখ পর্যটকের সমাগম হয়েছিল। তাঁদের অধিকাংশই একবারের জন্য হলেও সমুদ্রে নামেন। কিন্তু সৈকতের বিভিন্ন স্থানে গুপ্তখাল ও গর্ত থাকায় গোসল করতে গিয়ে ঝুঁকিতে পড়ছেন পর্যটকেরা।

সি-সেফ লাইফগার্ডের প্রকল্প ব্যবস্থাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “বৈরী পরিবেশ, সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণ ও পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে সৈকতের বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে। এ কারণে কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটারে ১২ থেকে ১৫টি গুপ্তখাল ও বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। জোয়ারের সময় এসব খাল ও গর্ত পানিতে ঢেকে যায়। ফলে পর্যটকেরা এগুলোর অবস্থান বুঝতে পারেন না। গুপ্তখালে পড়ে এ কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। সৈকতে কেউ গর্তে আটকা পড়লে উদ্ধারের জন্য ডুবুরিও নেই।”

ইমতিয়াজ আহমেদ আরও বলেন, শহরের পাঁচ কিলোমিটার সৈকতে গোসল করতে নেমে নিখোঁজ পর্যটকদের উদ্ধারে সি-সেফের ২৭ জন কর্মী তৎপর থাকেন। কিন্তু কলাতলী থেকে দক্ষিণে দরিয়ানগর, হিমছড়ি, ইনানী ও টেকনাফ পর্যন্ত অরক্ষিত সৈকতে গোসল করতে নেমে কেউ নিখোঁজ হলে তাঁকে উদ্ধারের জন্য কেউ নেই। অথচ এসব এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টেও পর্যটকেরা গোসল করতে নামছেন এবং বিপদে পড়ছেন।

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটিজ ফোরামের সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, “কক্সবাজারের হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের সবাই সেবার নামে টাকা কামাই করতে ব্যস্ত। পর্যটকদের নিরাপত্তা, বিনোদন, নিরাপদ গোসল নিয়ে কারও চিন্তা নেই। সৈকতের ২০০ থেকে ৫০০ মিটার এলাকাকে জাল দিয়ে ঘিরে ‘সুইমিং জোন’ গড়া যায়নি। দীর্ঘ চার যুগেও একজন ডুবুরি নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না। আবার সমুদ্রে গোসলে নেমে কেউ মারা গেলে সেটার দায়ও কেউ নেন না।”

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের নিয়োগ করা বিচের কর্মীদের সুপারভাইজার মাহবুবুর রহমান বলেন, “নির্দেশনা অমান্য করে ঝুঁকি নিয়ে গোসলে নেমে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ জন পর্যটক বিপদে পড়ছেন। জোয়ার-ভাটার সময় ও আবহাওয়া না জেনেই অনেকে সমুদ্রে নেমে যান। এমন অবস্থায় কেউ স্রোতের টানে ভেসে গেলে তাঁদের বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে। ২১ অক্টোবর বিকেলে ১২ জনের একটি পর্যটক দল হিমছড়ির ঝুঁকিপূর্ণ সৈকতে গোসলে নামে। এরপর গুপ্তখালে আটকা পড়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। তাতে পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ালেও কেউ গোসলে নামার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করছেন না।”

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, “নিরাপদ গোসলের বিষয়ে পর্যটকদের নানাভাবে সচেতন করা হচ্ছে। অধিকাংশ পর্যটক নিয়ম মেনে গোসলে নামেন না। একসঙ্গে কয়েক লাখ পর্যটক যখন উন্মুক্ত সৈকতে নেমে পড়েন, তখন তাঁদের সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শহরের পাঁচ কিলোমিটারের বাইরে অরক্ষিত সৈকতের কয়েকটি পয়েন্টে উদ্ধারকারী লাইফগার্ডের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।”