শীতকাল আসন্ন, আর শীতকাল মানেই শুষ্ক মৌসুম। প্রতি বছর এই সময়ে আমরা একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের খবর পাই। তবে এবার যেন সেই মর্মান্তিক ঘটনাটি একটু আগেই ঘটে গেল।

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে একটি রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১০ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। অত্যন্ত হৃদয়বিদারক যে, একটি পরিবারের ছয় সদস্য সেখানে প্রাণ হারিয়েছেন। অনেকেরই পরিকল্পনা ছিল ঘোরাঘুরি শেষ করে ঢাকায় ফেরা। তাদের ফেসবুক টাইমলাইনে সমুদ্রের ঢেউ আর বাতাসের সাথে আনন্দ করার ছবিগুলো তখনও মুছে যায়নি, তার আগেই সেখানে নেমে এসেছে মৃত্যুর শোক। যান্ত্রিক শহরের ক্লান্তি ভুলে নীল জলরাশি আর বালুকাবেলায় শান্তির খোঁজে গিয়ে মানুষকে এভাবে পুড়ে মরতে হয়—এটি আমাদের জন্য এক চরম দুর্ভাগ্য।

দেশের বর্তমান পরিস্থিতির ভিড়ে এই ভয়াবহ ঘটনাটি আমাদের ভেতর কতটা আলোড়ন তৈরি করতে পেরেছে, তা বলা মুশকিল। প্রতিদিন এত মৃত্যুর খবর শুনে আমরা যেন ‘অনুভূতিহীন’ হয়ে পড়েছি। শুধু দেশের ভেতরেই নয়, দেশের বাইরেও বাংলাদেশিরা নানাভাবে প্রাণ হারাচ্ছেন। কেউ ভূমধ্যসাগরে ডুবে মরছেন, কেউ ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় প্রাণ হারাচ্ছেন, আবার কেউ সৌদি আরবের কারাগারে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হচ্ছেন। গত আগস্টে কলকাতায় একটি হোটেলে আগুনে পুড়ে মারা গেছেন ৯ জন বাংলাদেশি।

বিদেশে এমন অগ্নিকাণ্ডে আট-দশজন মারা গেলে আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলো আন্তর্জাতিক ডেস্কের খবর হিসেবে তা প্রচার করে এবং টিভি পর্দার নিচে স্ক্রল চলে। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের পর্যটনকেন্দ্রে ঘটে যাওয়া এত বড় ঘটনা নিশ্চয়ই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে জায়গা পাবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটি কি সত্যিই একটি আকস্মিক দুর্ঘটনা? এই লেখার শেষ পর্যন্ত পড়লে এই প্রশ্নটি সামনে আসবে—এটি কি হওয়ার কথা ছিল না?

এর আগে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে একসঙ্গে এত পর্যটকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। যদিও কক্সবাজার যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় পুরো পরিবার নিখোঁজ বা মৃত্যুর ঘটনা নতুন কিছু নয়, কারণ এটি দেশের ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক সড়কপথ’। সমুদ্রে ডুবে মৃত্যুর ঘটনাও নিয়মিত ঘটে। তবে মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন পাটুয়ারটেক এলাকার ‘টুপ টুপ’ নামক রিসোর্টের এই ঘটনাটি কক্সবাজারের পর্যটন ইতিহাসে অন্যতম হৃদয়বিদারক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

এই দুর্ঘটনা আমাদের পর্যটন খাতের চরম অব্যবস্থাপনা এবং তদারকির অভাবকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। জানা গেছে, কাঠ, বাঁশ ও টিন দিয়ে তৈরি এই রিসোর্টটি নিয়ে আগে থেকেই ‘নেগেটিভ রিভিউ’ ছিল। পর্যটন খাতের সাথে যুক্ত অনেকে এই রিসোর্টের নির্মাণ প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা করছেন। তাঁদের প্রশ্ন, পাঁচ-ছয় বছর আগে খালের ওপর নির্মিত যে স্থাপনাটি ছিল বেগুনবাড়ির বস্তির মতো কাঠের ঘর, তা কীভাবে হঠাৎ লাল টিন, ছন আর অ্যাঙ্গেল বসিয়ে ‘রেট্রোফিটিং’ বা নান্দনিক রূপ নিয়ে হাজার হাজার টাকা ভাড়ার রিসোর্টে পরিণত হলো?

প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, নিচে রেস্তোরাঁ এবং ওপরে থাকার ঘর তৈরি করা হয়েছিল। সমস্যা ছিল এই যে, থাকার ঘরে ঢোকার ও বের হওয়ার পথ ছিল রেস্তোরাঁর ভেতর দিয়ে। ফলে নিচে আগুন লাগার পর ওপরতলার পর্যটকরা বের হওয়ার কোনো পথ পাননি। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, রেস্তোরাঁর ওপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় ছিল কক্ষগুলো। মেঝে, দেয়াল এবং সিঁড়ির বড় অংশই ছিল কাঠের। আগুনে কাঠ পুড়ে যাওয়ায় অতিথিরা নিচে নামতে পারেননি এবং বের হওয়ার বিকল্প কোনো পথ ছিল না। অনেকে বাথরুমে আশ্রয় নিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানেও রক্ষা পাননি; সেখান থেকেই তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

শুধু কক্সবাজারই নয়, কাপ্তাই লেকসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট এবং খুলনার সুন্দরবনেও হোটেল ও রিসোর্ট বানানোর হিড়িক চলছে। টাঙ্গুয়ার হাওরে হাউসবোটেও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পর্যটন কেন্দ্রের জন্য এসব স্থাপনা প্রয়োজন, কিন্তু প্রশ্ন হলো এগুলো কীভাবে নির্মিত হয়? জেলা প্রশাসক, জেলা পরিষদ, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং ফায়ার সার্ভিসসহ সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এখানে কীভাবে কাজ করে?

মুক্তকণ্ঠের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাহাড়ি এলাকার অধিকাংশ রিসোর্টই জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন ছাড়াই নির্মিত হয়েছে। দেশের অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রের অবস্থাও প্রায় একই। এমন পরিস্থিতিতে পর্যটক ও পর্যটনকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব?

বলাই বাহুল্য, দেশে এমন অসংখ্য হোটেল বা রিসোর্ট রয়েছে যেখানে দুর্ঘটনা ঘটলে একই পরিণতি হতে পারে। পর্যটন খাতের জন্য অনেক কর্তৃপক্ষ থাকলেও জিডিপিতে ৩.০২ শতাংশ অবদান রাখা ৮০-৯০ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল শিল্পটি যেন কোনো ‘মা-বাপ’ ছাড়া চলছে। এখানে প্রকৃত উদ্যোক্তারা নিয়ম মেনে বিনিয়োগ করতে গিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে হয়রানির শিকার হন, অথচ ‘টুপ টুপ’ রিসোর্টের মালিকদের মতো অনেকে কোনো ছাড়পত্র ছাড়াই ব্যবসা করার সুযোগ পান।

যেকোনো অগ্নিকাণ্ড বা বিস্ফোরণের পর আমরা যেসব কারণ শুনি, কক্সবাজারের ঘটনায়ও তার পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ বলেন, “গত জুনেই পরিদর্শনের পর রিসোর্টটিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু সেই সতর্কতা উপেক্ষা করেই রিসোর্টটি অবৈধভাবে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল।”

সংস্থাটির চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, সমুদ্রের তীব্র বাতাসে কাঠের রিসোর্টে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের স্থাপনায় বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, অগ্নিসংকেত, হোসপাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন, কিন্তু এই রিসোর্টে তার কিছুই ছিল না। এমনকি ফায়ার লাইসেন্সও ছিল না। পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, ছাড়পত্র ছাড়াই রিসোর্টটি চালানোর কারণে গত এপ্রিলে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং নির্দেশনা না মানায় এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল।

এখানে দুটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে: কোনো নিরাপত্তা ছাড়পত্র ছাড়াই রিসোর্টটি নির্মাণের অনুমতি কীভাবে পেল? এবং ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরও কীভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেল? স্থানীয় প্রশাসন ও তদারকি সংস্থাগুলোর চোখ কি অন্ধ ছিল, নাকি কোনো অদৃশ্যের পকেটে টাকা গুঁজে দিয়ে এই ঝুঁকিপূর্ণ ঝুপড়ি রিসোর্টটি টিকিয়ে রাখা হয়েছিল?

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দাবি, পরিবেশ আইনে কোনো রিসোর্ট বা রেস্টুরেন্টকে জরিমানা বা নোটিশ দেওয়া গেলেও উচ্ছেদ বা বন্ধ করার ক্ষমতা তাঁদের নেই। রিসোর্ট বা হোটেল ছাড়পত্র পেতে হলে প্রথমে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ভবনের নকশার অনুমোদন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট থাকা প্রয়োজন। টুপটুপ রিসোর্টের এসব কিছুই ছিল না। ফায়ার সার্ভিস বা পরিবেশ অধিদপ্তর নোটিশ দিলেও বন্ধ ও উচ্ছেদের আইনি ক্ষমতা একমাত্র কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের হাতে।

তদারকি সংস্থাগুলোর দাবি, বন্ধ বা উচ্ছেদের ক্ষেত্রে তাঁদের রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হয়। যখন যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক নিয়োগ প্রাধান্য পায়, তখন এমন পরিস্থিতি স্বাভাবিক।

ইনানীর এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড এবং ১০টি প্রাণের মৃত্যু কি আমাদের ঘুম ভাঙাবে, নাকি কয়েক দিনের হইহুল্লোপের পর সব ধামাচাপা পড়ে যাবে? পর্যটন কি মানসিক প্রশান্তির জায়গা হবে, নাকি তদারকি কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা, অবহেলা এবং ব্যবসায়িক লোভের কারণে স্বজনদের লাশ নিয়ে ফেরার ট্র্যাজেডিতে পরিণত হবে?

সবশেষে একটি প্রশ্ন ও উত্তর: এত পর্যটকের মৃত্যুর দায় কার? বর্তমান সময়ের ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ বা ফেসবুকীয় যুক্তি অনুযায়ী এর সহজ উত্তর হতে পারে—তাঁদের মৃত্যুর জন্য তাঁরাই দায়ী, কারণ তাঁরা কেন কক্সবাজার ঘুরতে গেলেন!