দেশের কৃষি খাতে বিভিন্ন ফসলের উৎপাদনে মিশ্র প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। এক বছরে পেঁয়াজের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ছয় লাখ টন। এর পাশাপাশি আমন ধান, রসুন, শীতকালীন মরিচ, ভুট্টা ও সয়াবিনের উৎপাদনও বেড়েছে। তবে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে আলুর ক্ষেত্রে, যার উৎপাদন কমেছে প্রায় তিন লাখ টন। এছাড়া গমের উৎপাদনও কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কৃষি বিভাগের প্রকাশিত ত্রৈমাসিক (এপ্রিল-জুন) প্রতিবেদনে এই তথ্যগুলো বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। উক্ত প্রতিবেদনে ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের বিভিন্ন ফসলের আবাদ ও উৎপাদনের একটি তুলনামূলক চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে।
বিবিএসের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছিল ৩২ লাখ ২১ হাজার টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ লাখ ২০ হাজার টনে। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরে পেঁয়াজ উৎপাদন ৫ লাখ ৯৯ হাজার টন বা ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
উৎপাদনের পাশাপাশি পেঁয়াজ আবাদের জমির পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে। আগের অর্থবছরে যেখানে ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৫৯৯ একর জমিতে পেঁয়াজ চাষ করা হয়েছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৭৮৭ একরে দাঁড়িয়েছে। পেঁয়াজের এই বর্ধিত উৎপাদনের ফলে চলতি অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়নি বলে দাবি করেছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
পেঁয়াজের পাশাপাশি রসুন ও শীতকালীন মরিচের উৎপাদনও ঊর্ধ্বমুখী। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে রসুনের উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬৮২ টন, যা গত অর্থবছরে বেড়ে হয়েছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৪৪৬ টন। অন্যদিকে, শীতকালীন মরিচের উৎপাদন ৫ লাখ ৬১ হাজার ৩৯৭ টন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ১৬ হাজার ৩৪০ টনে।
সারসংক্ষেপে দেখা যায়, এক বছরে পেঁয়াজ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৬ লাখ টন বা ১৮.৬%। একই সময়ে আলুর উৎপাদন কমেছে ৩ লাখ ১ হাজার টন। আমন ধানের উৎপাদন বেড়েছে ৮ লাখ ৪৫ হাজার টন, তবে গমের উৎপাদন কমেছে ১৩ হাজার টন।
আলু উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিপরীত পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ১ কোটি ১৫ লাখ ৭৩ হাজার টন আলু উৎপাদিত হয়েছিল, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১২ লাখ ৭২ হাজার টনে। অর্থাৎ, এক বছরে আলুর উৎপাদন ৩ লাখ ১ হাজার টন হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে আলু আবাদের জমির পরিমাণও কমেছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষিপণ্যের উৎপাদন হ্রাস বা বৃদ্ধির পেছনে বাজারমূল্য একটি প্রধান ভূমিকা পালন করে। পেঁয়াজ ও আলুর ক্ষেত্রে এই প্রভাবটি স্পষ্টভাবে দেখা গেছে বলে তাঁরা মনে করেন।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘কৃষকেরা আগের বছরে পেঁয়াজের ভালো দাম পেয়েছিলেন। তাই পরেরবার উৎপাদন বাড়াতে আগ্রহী হয়েছেন। তা ছাড়া হিমাগারে পেঁয়াজ সংরক্ষণের ব্যবস্থাও ভালো হয়েছে।’
তবে আলুর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে মনে করেন জাহাঙ্গীর আলম খান। তাঁর মতে, গত দুই বছর কৃষকেরা আলুর ন্যায্য মূল্য পাননি। এমনকি হিমাগারে সংরক্ষণ করার পরেও তাঁদের লোকসান গুনতে হয়েছে। এই কারণেই চাষিরা আলুর আবাদ কমিয়ে দিয়েছেন।
ধানের মধ্যে আমন ধানের উৎপাদনে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে আমন ধান উৎপাদিত হয়েছিল ১ কোটি ৬৫ লাখ ১৪ হাজার টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৭৩ লাখ ৫৯ হাজার টনে। অর্থাৎ, এক বছরে আমন উৎপাদন বেড়েছে ৮ লাখ ৪৫ হাজার টন। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৃদ্ধিতে অনুকূল আবহাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে, গমের উৎপাদন কমেছে। আগের অর্থবছরে দেশে ১০ লাখ ৪১ হাজার টন গম উৎপাদিত হলেও পরের অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ১০ লাখ ২৮ হাজার টন। অর্থাৎ, এক বছরে গমের উৎপাদন ১৩ হাজার টন বা ১ দশমিক ২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে গমের আবাদি জমির পরিমাণ ৬ লাখ ৯৩ হাজার ৭২৪ একর থেকে কমে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ১৫৬ একরে নেমে এসেছে।
অন্যান্য ফসলের মধ্যে শীতকালীন ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শীতকালীন ভুট্টা উৎপাদন হয়েছিল ৪৮ লাখ ৭৩ হাজার টন, যা গত অর্থবছরে বেড়ে হয়েছে ৫০ লাখ ৪৮ হাজার টন। সয়াবিনের উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে। আগের অর্থবছরে ১ লাখ ৮ হাজার টন সয়াবিন উৎপাদন হলেও পরের অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার টনে।
ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষিশ্রমিকদের মজুরির তথ্যও প্রকাশ করেছে বিবিএস। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাসে পুরুষ কৃষিশ্রমিকের দৈনিক গড় মজুরি ছিল ৬২৮ টাকা এবং নারী শ্রমিকের ৪৬১ টাকা।
জুন মাসে এক বেলা খাবারসহ পুরুষ কৃষিশ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিল ৬২২ টাকা এবং নারীর ৪৩৭ টাকা। দুই বেলা খাবারসহ পুরুষ শ্রমিকের মজুরি ছিল ৬৩৯ টাকা এবং নারী শ্রমিকের ৪৬০ টাকা। আর তিন বেলা খাবারসহ পুরুষ শ্রমিক পেয়েছেন ৬৬৪ টাকা এবং নারী শ্রমিক ৫১৫ টাকা।
বিবিএস জানিয়েছে, দেশের প্রতিটি উপজেলা থেকে নমুনাভিত্তিতে ১০ জন করে কৃষিশ্রমিকের সাক্ষাৎকার নিয়ে এই মজুরির তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। যেসব এলাকায় সরাসরি কৃষিশ্রমিক পাওয়া যায়নি, সেখানে কৃষিকাজে দৈনিক শ্রমিক নিয়োগকারী কৃষকদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে।