পদ্মার শাখা কীর্তিনাশা নদী শুকিয়ে জেগে ওঠা চরে গড়ে ওঠা জনবসতি আর সেই নদীর তীরেই ১৯৮১ সালে যাত্রা শুরু করেছিল একটি হাট। চার দশকের দীর্ঘ পথচলায় সেই হাটটি এখন শরীয়তপুর জেলার কৃষিপণ্য লেনদেনের সবচেয়ে বড় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সপ্তাহে দুই দিন বসার এই হাটটিতে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৫০ থেকে ৫৫ কোটি টাকার মসলা ও তেলবীজজাতীয় কৃষিপণ্য কেনাবেচা হয়।

হাটটির নাম কাজীরহাট, যা শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার বড়কান্দি ইউনিয়নের ডুবিসায়বর এলাকায় অবস্থিত। এই হাটে কেবল শরীয়তপুর নয়, বরং পার্শ্ববর্তী মাদারীপুর জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত ফসল নিয়ে ভিড় করেন। এখানে মূলত ধনিয়া, শর্ষে, কালিজিরা, পেঁয়াজ, মরিচ, রসুন, হলুদ ও মেথিসহ প্রায় ২০ ধরনের মসলা ও তেলবীজজাতীয় ফসল কেনাবেচা করা হয়। দেশের বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখান থেকে পণ্য সংগ্রহ করে, যা প্রক্রিয়াজাত হয়ে পরবর্তীতে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কৃষকদের সূত্রে জানা গেছে, প্রতি রবি ও বৃহস্পতিবার কাজীরহাট বসে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এখানে কেনাবেচার ব্যস্ততা চলে। কৃষকেরা যেমন এখানে ফসল বিক্রি করেন, তেমনি কৃষি কাজের প্রয়োজনীয় উপকরণ ও অন্যান্য পণ্যও ক্রয় করেন।

কাজীরহাটের আড়ত মালিকদের দেওয়া তথ্যানুসারে, গত বৃহস্পতিবারের লেনদেনের চিত্রটি ছিল চমকপ্রদ। ওইদিন ৩০০ টন ধনে প্রতি টন ২ লাখ টাকা দরে ৬ কোটি টাকা, ২০০ টন কালিজিরা প্রতি টন ৩ লাখ টাকা দরে ৬ কোটি টাকা, ৩০০ টন শর্ষে প্রতি টন ১ লাখ টাকা দরে ৩ কোটি টাকা, ১০০ টন রসুন প্রতি টন ১ লাখ টাকা দরে ১ কোটি টাকা, ২০০ টন পেঁয়াজ প্রতি টন ৫০ হাজার টাকা দরে ১ কোটি টাকা এবং ১০০ টন শুকনা মরিচ প্রতি টন ৩ লাখ টাকা দরে ৩ কোটি টাকাসহ মোট ২০ কোটি টাকার কেনাবেচা হয়েছে। এছাড়া তিল, তিসি, সূর্যমুখী ও ভুট্টাসহ বিভিন্ন তেলবীজজাতীয় পণ্যের লেনদেন হয়েছে ৫ থেকে ৬ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এক হাটে গড়ে ২৫–২৬ কোটি টাকার লেনদেন হয়, যার ফলে সপ্তাহে দুই হাটে মোট ৫০–৫৫ কোটি টাকার পণ্য কেনাবেচা হয়।

নদীর চরে এই হাটের ইতিহাস বেশ আকর্ষণীয়। পদ্মার নাওডোবা এলাকা থেকে কীর্তিনাশা নদী জাজিরার বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে বড়কান্দি ইউনিয়নের ডুবিসায়বর মৌজায় নদীর চর জেগে উঠলে সেখানে জনবসতি গড়ে ওঠে। নৌপথে যাতায়াতের সুবিধার কথা মাথায় রেখে স্থানীয় কাজী বংশের মুরব্বি আবদুল খালেক কাজী সেখানে হাট বসান। তাঁর বংশীয় নামের সূত্রেই এই হাটের নামকরণ হয় কাজীরহাট। সময়ের সাথে সাথে এই হাটের পরিধি ও গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে।

বর্তমানে এই হাটে প্রায় দেড় হাজারটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এবং কৃষিপণ্য কেনাবেচার জন্য রয়েছে ৩০টি আড়ত। প্রতি হাটে দুই শতাধিক পাইকার বিভিন্ন পণ্য কিনতে আসেন। ব্যবসায়ীদের আর্থিক লেনদেনের সুবিধার্থে হাটের আশপাশে পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখা খোলা হয়েছে।

জাজিরার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক ধলু মিয়া পাঁচ বিঘা জমিতে ধনে, মেথি ও পেঁয়াজ চাষ করেন। উৎপাদন খরচ ও প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে তিনি ফসল তোলার পরপরই প্রায় ৬০ শতাংশ বিক্রি করে দেন এবং বাকি ৪০ শতাংশ বেশি দামের আশায় বাড়িতে সংরক্ষণ করেন। গত বৃহস্পতিবার ৩০০ কেজি ধনে নিয়ে কাজীরহাটে আসা ধলু মিয়া দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে এই হাটে ফসল বিক্রি করছেন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “চার দশকের বেশি সময় ধরে এই হাটে তিনি ফসল বিক্রি করছেন। কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় সার, কৃষি-যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন জিনিসও এখান থেকে কিনে নেন। হাটে অনেক পাইকার আসেন। তাঁদের সঙ্গে দরদাম যাচাই করে ফসল বিক্রি করা যায়। ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ থাকায় এখানেই আসেন।”

কৃষকদের জন্য এই হাটের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো একই স্থানে অনেক ক্রেতা পাওয়া যায়, ফলে একক কোনো ক্রেতার দামের ওপর নির্ভর করতে হয় না। অন্যদিকে পাইকাররাও এক জায়গায় অনেক কৃষকের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য সংগ্রহের সুযোগ পান।

কাজীরহাট বণিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে জানান, হাটে সবচেয়ে বেশি কেনাবেচা হয় কৃষিপণ্য এবং সারাদিনই এখানে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় থাকে। আড়তগুলো থেকে পাইকারেরা পণ্য কিনে কেউ কেউ মজুত করেন এবং বাজারদর বাড়লে বিক্রি করেন, আবার অনেকে সরাসরি বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ী ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে সরবরাহ করেন।

বড়কান্দি এলাকার ব্যবসায়ী আবু আলেম ব্যাপারী গত ৩৫ বছর ধরে এই হাটে ব্যবসা করছেন। তিনি কৃষকদের কাছ থেকে মসলা ও তেলবীজ কিনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করেন। আবু আলেম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য কিনে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য বিক্রির প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করি। প্রতি হাটে অন্তত ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার মালামাল কেনা হয় আমার।”

মৌসুম অনুযায়ী এই হাটের বেচাকেনা আরও বৃদ্ধি পায়। কৃষক, পাইকার ও ব্যবসায়ীদের এই মিলনকেন্দ্রটি গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতির সাথে দেশের শিল্প ও বিপণন ব্যবস্থাকে যুক্ত করেছে। শরীয়তপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় ৮৭ হাজার ৮২১ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ফসল উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে মসলা ও তেলবীজজাতীয় ফসলের আবাদ হয়। এসব জমিতে বছরে প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার মেট্রিক টন ফসল উৎপাদিত হয়।

শরীয়তপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জাহীদুল আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “মসলা ও তেলবীজজাতীয় ফসল কেনাবেচার জন্য কাজীরহাট বেশ জনপ্রিয়। দেশের বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিনিধিরা এসব ফসল সংগ্রহ করতে এখানে আসেন। ফলে কৃষকেরাও তাঁদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন। কাজীরহাটে প্রতি সপ্তাহে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার কৃষিপণ্য বিক্রি হয়। মৌসুমে এই বেচাকেনা আরও বেড়ে যায়।”