দুই বছর আগেও পদ্মা নদী এই বিদ্যালয় থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থান করত। কিন্তু ক্রমাগত নদীভাঙনের ফলে সেই দূরত্ব ক্রমশ কমতে থাকে এবং বর্তমানে নদীটি বিদ্যালয়ের মাঠ পর্যন্ত চলে এসেছে। যেকোনো মুহূর্তে পুরো প্রতিষ্ঠানটি নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে—এমন চরম আশঙ্কায় বিদ্যালয়ের টিনের তৈরি সীমানাবেড়া খুলে ফেলা হয়েছে। পাশাপাশি বেশ কিছু আসবাবপত্রও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভাঙনের এই তীব্র আতঙ্কে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের আলম খান কান্দি গ্রামের আলতাফ হোসেন খান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত নাজুক। বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চলতি বছর পদ্মার ভাঙন অত্যন্ত তীব্র। গত কয়েক মাসের ব্যবধানে নদীতীরের প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে চলে গেছে। নদীর এই আগ্রাসন এখন বিদ্যালয়ের মাঠ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
গত মঙ্গলবার সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, টিনের কাঠামোয় নির্মিত এই বিদ্যালয়ে চারটি শ্রেণিকক্ষ এবং শিক্ষকদের জন্য একটি কক্ষ রয়েছে। কক্ষগুলোর মেঝে পাকা করা। তবে ভাঙনের আশঙ্কায় বিদ্যালয়ের সীমানাবেড়াটি খুলে ফেলা হয়েছে। আলমারিসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র সরিয়ে নিয়ে বিদ্যালয়ের পেছনের খোলা জায়গায় জড়ো করে রাখা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শামীম খান বলেন, ‘প্রতিদিন স্কুল শেষে বাড়ি ফিরে চিন্তায় থাকি, সকালে গিয়ে স্কুলটি দেখতে পাব কি না। ভাঙনের আশঙ্কায় কিছু মালামাল সরিয়ে নিয়েছি।’
এই বিদ্যালয়ে মোট চারজন শিক্ষক কর্মরত আছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২১৪ জন। তবে বর্তমানে প্রতিদিন মাত্র ৬০-৭০ জন শিক্ষার্থী ক্লাসে উপস্থিত হয়। নদীভাঙনের কারণে আশপাশের গ্রামের অনেক পরিবার তাদের ভিটেমাটি ছেড়ে দূরের এলাকায় চলে গেছে। এই চলে যাওয়া পরিবারগুলোর অনেক শিক্ষার্থীই এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত।
বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মনিকা ও জোনায়েদের সাথে কথা বলা হলে তারা জানায়, এখন বিদ্যালয়ে আসতে তাদের ভয় লাগে। এমনকি বিদ্যালয়ের মাঠে খেলাধুলা করতেও তারা আতঙ্কিত। বিদ্যালয়টি যদি নদীগর্ভে তলিয়ে যায়, তবে তারা কোথায় গিয়ে পড়াশোনা করবে, তা নিয়ে তাদের মনে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
আলম খান কান্দি গ্রামটি পদ্মা নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত। চারদিকে নদী থাকায় নৌপথই এখানকার মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। ২০১৭ সালে এই বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন খান বিদ্যালয়টি স্থাপনের জন্য ৩৩ শতাংশ জমি দান করেছিলেন এবং তাঁর নামানুসারেই বিদ্যালয়টির নামকরণ করা হয়।
ইউপি চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এলাকায় ভাঙন শুরু হওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনেকবার অনুরোধ করেছেন। কিন্তু এলাকাটি রক্ষায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ বছরই গ্রামের অন্তত ৩৫০টি পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়েছে। এখন বিদ্যালয়টিও ভাঙনের মুখে।”
জাজিরা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বজলুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ভাঙনের মুখে থাকা বিদ্যালয়টি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। তবে এখনো নতুন জায়গা পাওয়া যায়নি। বিদ্যালয়টি ভাঙনের শিকার হলে যাতে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ না হয়, সে বিষয়ে নজর রাখা হচ্ছে।”