পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য দাবি কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি তাদের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম হিসাব বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

রোববার (১ নভেম্বর) রাত ৮টা ৫৫ মিনিটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের এক পোস্টে তিনি এই কথা জানান। তার ওই পোস্টটি নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো।

“গাজীপুর, মিরপুর, আশুলিয়া ও সাভারসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে উত্তাল। ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে রাজপথে নেমে এসেছেন হাজার হাজার পোশাকশ্রমিক।

দিনে ১০-১২ ঘণ্টা সেলাই মেশিনের সামনে বসে তীব্র পরিশ্রম করা মানুষগুলো মাস শেষে কেবল একটু মানুষের মতো বাঁচার সুযোগ চাচ্ছেন। এটি কোনো বিলাসিতা বা অপরাধ নয়, বরং তাদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম হিসাব। অথচ এ ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়ার পরিবর্তে শ্রমিকদের ওপর লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস এবং দমনপীড়ন চালানো হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য।

পোশাকশ্রমিকদের মজুরি সর্বশেষ ২০২৩ সালে বাড়িয়ে সাড়ে ১২ হাজার টাকা করা হয়েছিল। গত তিন বছরে চাল, ডাল, তেল, ঘরভাড়া ও চিকিৎসাসহ প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কয়েকগুণ বেড়েছে। এ সামান্য আয়ে পরিবার চালানো শ্রমিকদের জন্য এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

অথচ সম্প্রতি মূল্যস্ফীতির যুক্তি দেখিয়ে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন স্কেল ও পেনশন বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই বাজার থেকে কেনাকাটা করা সরকারি কর্মচারীদের বেলায় যা মূল্যস্ফীতি, শ্রমিকের বেলায় তা ‘ষড়যন্ত্র’ বলে চালিয়ে দেওয়া স্পষ্ট দ্বিচারিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

দাবি মানার বদলে আন্দোলনকে রাজনৈতিক চক্রান্ত ও বিরোধীদলের উসকানি হিসেবে চিহ্নিত করার পুরোনো অপচেষ্টা আবারও দেখা যাচ্ছে।

নিষিদ্ধ কোনো সংগঠন যদি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তবে তার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হোক। কিন্তু সেটিকে অজুহাত বানিয়ে হাজার হাজার শ্রমিকের অধিকারকে ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেওয়া সরকারের গোয়েন্দা ও প্রশাসনের ব্যর্থতা ঢাকাই প্রকাশ করে।

যে শ্রমজীবী মানুষ জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে রক্ত ও জীবন দিয়ে পরিবর্তন আনলেন, ক্ষমতার রদবদল হলেও আজ তাদের ওপরেই হাসিনার আমলের মতো দমনপীড়নের সুর ও ভাষা প্রয়োগ করা হচ্ছে।

আন্দোলন দমনে পুলিশ ও বিজিবির লাঠিচার্জে ইতোমধ্যে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন, এমনকি সংবাদকর্মী ও সাধারণ পথচারীরাও এ হামলা থেকে রেহাই পাননি।

একইসঙ্গে শ্রমিক নেতাদের গ্রেপ্তার এবং সহকর্মীর আটকের প্রতিবাদে ফেসবুকে মতামত প্রকাশের জেরে সাধারণ শ্রমিককে গ্রেপ্তার করার ঘটনা বাকস্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারের চরম পরিপন্থি। যে রাষ্ট্র শ্রমিকের মজুরির প্রশ্নে রাজপথে বিজিবি নামায়, সে রাষ্ট্র আসলে কার পক্ষে দাঁড়ায় তা স্পষ্ট।

তীব্র চাপের মুখে সরকার সম্প্রতি যে ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করেছে, তা আন্দোলন থামানোর কৌশল মাত্র; সুনির্দিষ্ট কোনো আশ্বাস নয়। ২০২৩ সালেও ২৫ হাজার টাকার দাবির বিপরীতে বোর্ডের নামে সময়ক্ষেপণ করে শেষ পর্যন্ত নামমাত্র সাড়ে ১২ হাজার টাকা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

তাছাড়া এ বোর্ডে ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি রাখা হয়েছে, যা বোর্ডের নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ তৈরি করেছে।

মালিকপক্ষ বৈশ্বিক মন্দা বা কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির কথা বললেও, ভালো সময়ের মুনাফা একা ভোগ করে সংকটের সমস্ত বোঝা শ্রমিকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো টেকসই নীতি হতে পারে না।

আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর কাছ থেকে পণ্যের ন্যায্যমূল্য আদায় করা এবং মালিকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা সরকারের মূল দায়িত্ব।

দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে এ ৪০ লাখ পোশাক শ্রমিকের ঘাম থেকে। তাদের পরিশ্রমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়লেও মাস শেষে তাদের নিজেদের ঘরেই হাড়ি জ্বলে না। এটি আমাদের সবার জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।

অবিলম্বে শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে ন‍্যায‍্য ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করতে হবে। একই সঙ্গে গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি, পুলিশি হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত, শ্রমিক ছাঁটাই ও কালো তালিকাভুক্তকরণ বন্ধ এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

শ্রমিকের রক্ত ও ঘামের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অর্থনীতিতে এ বৈষম্যের বিরুদ্ধে শ্রমিকের লড়াই মূলত আমাদের সবারই লড়াই।”

নাহিদ ইসলাম তার পোস্টে উল্লেখ করেন যে, দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গত দুই সপ্তাহ ধরে শ্রমিকদের তীব্র আন্দোলন চলছে। বিশেষ করে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও মিরপুর এলাকায় হাজার হাজার শ্রমিক ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে রাজপথে অবস্থান করছেন। তিনি অভিযোগ করেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণের পরিবর্তে প্রশাসন লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস ব্যবহারের মাধ্যমে দমন-পীড়ন চালাচ্ছে, যা অত্যন্ত অগ্রহণযোগ্য।

তিনি আরও মনে করিয়ে দেন যে, ২০২৩ সালে মজুরি বাড়িয়ে সাড়ে ১২ হাজার টাকা করা হলেও বর্তমান মূল্যস্ফীতির কারণে এই অংকের টাকা দিয়ে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সাথে শ্রমিকদের দাবির তুলনা করে তিনি একে সরকারের ‘দ্বিচারিতা’ হিসেবে অভিহিত করেন।

আন্দোলন দমনে পুলিশ ও বিজিবির পদক্ষেপের ফলে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। এছাড়া শ্রমিক নেতাদের গ্রেপ্তার এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতামত প্রকাশের কারণে সাধারণ শ্রমিকদের আটকের ঘটনাকে তিনি বাকস্বাধীনতার পরিপন্থী বলে বর্ণনা করেন।

সরকার কর্তৃক গঠিত ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ডকে তিনি কেবল ‘আন্দোলন থামানোর কৌশল’ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, এই বোর্ডে ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্তি এর নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

পরিশেষে, দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসা পোশাক শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং তাদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।