পাকিস্তান ক্রিকেট দলের কেন্দ্রীয় চুক্তিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৬-২৭ মৌসুমের নতুন চুক্তিতে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের পাশাপাশি তরুণদের অধিক গুরুত্ব দিতে চাইছেন জাতীয় দলের প্রধান কোচ মাইক হেসন। তার দেওয়া সুপারিশের ভিত্তিতে চুক্তির তালিকায় জায়গা পেতে পারেন ১৩ জন উদীয়মান ক্রিকেটার। তবে এই প্রক্রিয়ায় বড় ধাক্কা খেতে পারেন সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ রিজওয়ান। এছাড়া অভিজ্ঞ ওপেনার ইমাম-উল-হকও নতুন চুক্তিতে জায়গা না পাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) যদিও এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি, তবে বোর্ড সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দাবি করেছে যে, এই দুই ক্রিকেটারকে এবার চুক্তির বাইরে রাখা হচ্ছে।
রোববার (১ নভেম্বর) পিসিবির একটি সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতের সংবাদ সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই) জানিয়েছে, নতুন মৌসুমের কেন্দ্রীয় চুক্তির জন্য একঝাঁক তরুণ ক্রিকেটারের নাম প্রস্তাব করেছেন হেসন। নিউজিল্যান্ডের এই কোচ বর্তমানে তিন সংস্করণেই পাকিস্তানের দায়িত্ব পালন করছেন এবং তার মূল লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ দল গঠন করা।
পিসিবির ওই সূত্র আরও জানিয়েছে, এবারের কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার ছাঁটাই হতে পারেন, যাদের মধ্যে রিজওয়ানের নাম বিশেষভাবে সামনে এসেছে। অন্যদিকে, ইমাম-উল-হক গত মৌসুমেও চুক্তির বাইরে ছিলেন এবং এবারও তিনি জায়গা পাচ্ছেন না বলে দাবি করা হয়েছে। তবে অভিজ্ঞদের রাখা বা বাদ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো বোর্ডের হাতেই রয়েছে।
পিটিআই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন চুক্তিতে জায়গা পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে আরাফাত মিনহাস, সাদ বেগ, হাসান নওয়াজ, আকিফ জাভেদ, আলী রেজা, আহসান দানিয়াল, সুফিয়ান মুকিম, মাজ সাদাকাত, রাজাউল্লাহ, আজান আওয়াইস, ইমরান রানধাওয়া, আবদুল্লাহ ফজল ও গাজি ঘোরির।
এই ১৩ জন ক্রিকেটারের মধ্যে হাসান নওয়াজ এবং সুফিয়ান মুকিম গত মৌসুমেও কেন্দ্রীয় চুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। বাকিদের অনেকেই ঘরোয়া এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। পাকিস্তান টিম ম্যানেজমেন্টের লক্ষ্য হলো নতুন চুক্তির মাধ্যমে এই তরুণদের ভবিষ্যতের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করা।
বিশেষ করে তরুণ ক্রিকেটারদের শারীরিক সক্ষমতা বা ফিটনেস, কারিগরি দক্ষতা এবং দলের সামগ্রিক পরিকল্পনার সাথে খাপ খাইয়ে খেলার ক্ষমতার ওপর জোর দিচ্ছেন মাইক হেসন। তিনি কেবল ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সই নয়, বরং অনুশীলনে মনোযোগ, উন্নতির মানসিকতা এবং ড্রেসিংরুমের পরিবেশকে ইতিবাচক রাখার বিষয়গুলোকেও বিবেচনায় নিতে চান।
বোর্ড সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, যেসব তরুণ ক্রিকেটার নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করেছেন এবং ভবিষ্যতে দলের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারেন, তাদের আকর্ষণীয় চুক্তির মাধ্যমে উৎসাহিত করতে চান হেসন। তাঁর বিশ্বাস, এর ফলে তরুণদের মধ্যে জাতীয় দলে নিজের অবস্থান ধরে রাখার প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে।
তবে তরুণদের প্রাধান্য দিলেও দলের সব অভিজ্ঞ ক্রিকেটারকে বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা নেই পাকিস্তানের। বাবর আজম, শাহিন শাহ আফ্রিদি ও সাহিবজাদা ফারহানের চুক্তি বহাল থাকার সম্ভাবনা প্রবল। তাদের পাশাপাশি সালমান আলী আগা, সৌদ শাকিল, হারিস রউফ, নাসিম শাহ, ফখর জামান ও সাইম আইয়ুবও নতুন তালিকায় থাকতে পারেন।
তবে এই ক্রিকেটারদের সবাই একই ধরনের চুক্তি পাবেন না। কারও চুক্তি হতে পারে নির্দিষ্ট করে কেবল টেস্ট ক্রিকেটের জন্য, আবার কেউ সীমিত ওভারের ক্রিকেটের জন্য চুক্তিবদ্ধ হতে পারেন।
উল্লেখ্য, গত ১৫ জুন পিসিবি কেন্দ্রীয় চুক্তির কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা ঘোষণা করেছিল। পুরোনো এ, বি, সি ও ডি ক্যাটাগরির পরিবর্তে বোর্ড এখন সংস্করণভিত্তিক পাঁচটি ভিন্ন চুক্তি পদ্ধতি চালু করেছে। নতুন এই ব্যবস্থায় টেস্ট ও ওয়ানডে ক্রিকেটার, শুধু টেস্ট বিশেষজ্ঞ, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটার, টি-টোয়েন্টি বিশেষজ্ঞ এবং উদীয়মান ক্রিকেটারদের জন্য আলাদা আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
নতুন এই কাঠামোতে টেস্ট ক্রিকেটকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সীমিত ওভারের ক্রিকেটে বিশেষজ্ঞ খেলোয়াড়দের জন্য আলাদা সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে কোনো ক্রিকেটার সব সংস্করণে না খেললেও নির্দিষ্ট সংস্করণে ভালো পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় চুক্তি পেতে পারেন।
তবে নতুন মৌসুমের চুক্তির তালিকা প্রকাশে ইতিমধ্যে বিলম্ব হয়েছে। পিসিবির আগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ মৌসুমের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ৩০ জুন। এরপর নতুন কাঠামো অনুযায়ী তালিকা প্রকাশের কথা থাকলেও তা এখনো হয়নি।
পিটিআই-এর তথ্যমতে, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে বাড়তি সময় নিয়েছে পিসিবি। গত ১৬ অক্টোবরও নতুন চুক্তি ঘোষণায় বিলম্বের কথা জানিয়েছিল ওই সংবাদ সংস্থা। সে সময় বলা হয়েছিল, ঘরের মাঠে ওয়ানডে ত্রিদেশীয় সিরিজ এবং চলমান ঘরোয়া মৌসুমে ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স দেখতে চান হেসন ও নির্বাচকেরা।
এমন পরিস্থিতিতে রিজওয়ান ও ইমামের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দুজনই দীর্ঘ সময় ধরে পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পরিচিত মুখ। বিশেষ করে রিজওয়ান ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি উইকেটকিপিং এবং নেতৃত্বের অভিজ্ঞতার কারণে দলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। অন্যদিকে ইমাম দীর্ঘ সময় ওয়ানডে ও টেস্ট ক্রিকেটে পাকিস্তানের ওপেনিং ব্যাটিংয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০২৫-২৬ মৌসুমের কেন্দ্রীয় চুক্তিতে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে ছিলেন রিজওয়ান। এর আগের মৌসুমে তিনি সর্বোচ্চ ‘এ’ ক্যাটাগরিতে থাকলেও পরবর্তীতে তার অবনমন হয়। আর এবার তিনি পুরোপুরি বাদ পড়ার শঙ্কায় রয়েছেন। অন্যদিকে ইমাম আগের মৌসুমেই চুক্তির বাইরে ছিলেন।
তবে কেন্দ্রীয় চুক্তি না পাওয়ার অর্থ এই নয় যে জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। নির্বাচকদের বিবেচনায় থাকলে চুক্তির বাইরে থেকেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলার সুযোগ পেতে পারেন তারা।