স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের অর্থনীতি যাতে কোনো ধরনের সংকটে না পড়ে, সেই লক্ষ্যেই বড় ধরনের সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে পাঁচটি পক্ষকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে—জনগণ, বেসরকারি খাত, জাতিসংঘ, উন্নয়ন সহযোগী এবং বহুপক্ষীয় উন্নয়ন জোট। সরকার মনে করছে, এলডিসি উত্তরণের জন্য প্রাপ্ত বাড়তি তিন বছরকে অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন, বিনিয়োগের পরিধি বৃদ্ধি এবং নতুন রপ্তানি বাজার তৈরির এক অনন্য সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো সম্ভব।

আজ রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা জানান প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে একটি বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র এবং রপ্তানির প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। সরকার বর্তমানে বাংলাদেশকে একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে, তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, এই রূপান্তর অবশ্যই টেকসই হতে হবে।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, “এলডিসিভুক্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি সবচেয়ে বড়। তাই অর্থনীতির বহুমুখীকরণ, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।” তিনি আরও জানান, সরকার তিনটি প্রধান বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখে এই সংস্কার পরিকল্পনা সাজাচ্ছে। এগুলো হলো—উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া দুর্বল অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ ভঙ্গুরতা, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে সৃষ্ট বাহ্যিক চাপ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং এই পরিস্থিতিগুলো মোকাবিলায় পর্যাপ্ত আগাম প্রস্তুতির অভাব।

ব্যাংক ও জ্বালানি খাতের সংস্কার পরিকল্পনা
সংস্কারের অগ্রাধিকারের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, “ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে বিনিয়োগের জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।” এর পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা আরও জোরদার করা, বিনিয়োগের জন্য নতুন বাজার খোঁজা এবং রপ্তানিপণ্যের তালিকা আরও দীর্ঘ করার লক্ষ্যে কাজ করা হবে।

টেকসই শিল্পায়ন এবং বিনিয়োগের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তাকে সরকার একটি অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচনা করছে। এই লক্ষ্যে মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে বলে জানান উপদেষ্টা। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও এই ধরনের অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, “তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সক্ষমতা বাড়াতে ভাসমান টার্মিনালের পাশাপাশি স্থলভিত্তিক টার্মিনাল স্থাপনের বিষয়েও কাজ করছে সরকার।” একই সাথে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধি, জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় অপচয় ও সিস্টেম লস কমানো এবং এলএনজি আমদানির উৎস বহুমুখী করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

নতুন রপ্তানি বাজার অনুসন্ধান
এলডিসি উত্তরণের পর বিভিন্ন দেশের বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা কমে যাওয়ার একটি আশঙ্কা রয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন রপ্তানি বাজার খোঁজার পাশাপাশি বর্তমান বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) অথবা সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সেপা) করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

উপদেষ্টা মনে করেন, বেসরকারি খাতের সঙ্গে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে পারলে সরকারের লক্ষ্য অর্জন অনেক সহজ হবে। এজন্য এলডিসি উত্তরণ সংক্রান্ত প্রতিটি আলোচনায় বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগে যুক্ত পাঁচ পক্ষ হলো বাংলাদেশের জনগণ, বেসরকারি খাত, জাতিসংঘ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন জোট। উপদেষ্টার মতে, এ ধরনের সর্বসম্মত অংশীদারত্বের দৃষ্টান্ত আগে দেখা যায়নি এবং এই পাঁচ পক্ষের অংশগ্রহণ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বৃদ্ধি করবে।

সংস্কার প্রক্রিয়ায় আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা
জাতিসংঘের ভূমিকা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জানান, সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত প্রস্তাবে জাতিসংঘ ব্যবস্থাকে কারিগরি সহায়তাসহ সব ধরনের সহযোগিতা প্রদানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেবেন জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক।

এছাড়া সরকারের চিহ্নিত অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কার কর্মসূচিতে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) এবং ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক (আইএসডিবি)।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, “সরকারের সামনে এখন বাড়তি তিন বছরের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ। এ সময়ে বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন রপ্তানি বাজার তৈরি, উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে অগ্রগতি হলে এলডিসি উত্তরণের ধাক্কা সামাল দেওয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের ভিত্তিও তৈরি হবে।”