স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন অ্যামচেম বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল। তাঁর মতে, এই অতিরিক্ত তিন বছর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এই সময়টিকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতির বিদ্যমান দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠা, অর্জিত সাফল্য ধরে রাখা এবং উত্তরণ-পরবর্তী তীব্র প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব।

সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল মনে করেন, প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়ানোর অসাধারণ সক্ষমতার মাধ্যমেই বাংলাদেশের মানুষ দেশকে এলডিসি উত্তরণের পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। এর পেছনে ছিল উদ্যোক্তাদের সাহসী উদ্যোগ, রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রসার এবং মানবসম্পদের ধারাবাহিক উন্নয়ন। তাই উত্তরণের সময়সীমা বৃদ্ধি পাওয়াকে কোনোভাবেই পিছিয়ে যাওয়া হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতির ভিত আরও মজবুত করতে হবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবেশ আমূল বদলে যাবে। বিশেষ করে রপ্তানিতে শুল্কসুবিধা, মেধাস্বত্বের ছাড়, শিল্পে সরকারি সহায়তা এবং উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। ফলে এখন পর্যন্ত যেসব বিশেষ সুবিধার কারণে বাংলাদেশের পণ্য বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে ছিল, ভবিষ্যতে সেই সুবিধাগুলো আর নাও থাকতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে হলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, পণ্যের মান উন্নয়ন, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন এবং উদ্ভাবনের ওপর নির্ভর করতে হবে।

বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, এলডিসি স্ট্যাটাসের কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘকাল অনেক সুবিধা পেয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি পণ্যের প্রায় ৭৩ শতাংশ এলডিসি হিসেবে পাওয়া বিশেষ বাণিজ্যসুবিধার আওতায় পড়ে। এই সুবিধাগুলো পর্যায়ক্রমে উঠে গেলে বিভিন্ন বাজারে বাংলাদেশকে উচ্চতর শুল্ক দিতে হতে পারে এবং পণ্যের উৎসসংক্রান্ত শর্তাবলি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার প্রস্তুতি এখনই শুরু করতে হবে বলে তিনি মনে করেন। এর জন্য শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা, মানবাধিকার এবং সুশাসনসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রয়োজন। পাশাপাশি জাপান, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে হবে। এসব দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার কথা বলেন তিনি, যাকে তিনি 'অর্থনৈতিক কূটনীতি' হিসেবে অভিহিত করেন।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়মকানুনের পরিবর্তনের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিশেষ করে ওষুধশিল্পে মেধাস্বত্বের ক্ষেত্রে এলডিসি হিসেবে পাওয়া ছাড় একসময় শেষ হবে এবং শিল্পে ভর্তুকি দেওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ বাড়তে পারে। এসব পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রতিটি শিল্প খাতের জন্য আলাদা প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিকল্প সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের অত্যধিক নির্ভরশীলতা তৈরি পোশাকের ওপর বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিজিএমইএর তথ্যানুসারে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট পণ্য রপ্তানির ৮০ দশমিক ৬২ শতাংশ এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই সাফল্য ধরে রাখার পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা জরুরি। তৈরি পোশাকে উচ্চ মূল্য সংযোজনের দিকে যাওয়ার পাশাপাশি ওষুধ, চিকিৎসাপ্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবা, চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি করতে হবে।

এই পরিবর্তনের মূল ভিত্তি হতে হবে প্রযুক্তির ব্যবহার ও দক্ষ জনশক্তি। কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় আধুনিক প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, শুধু কম খরচে পণ্য উৎপাদন করলে চলবে না; আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে উন্নত মানের পণ্য নিয়মিতভাবে সরবরাহ করার সক্ষমতা এবং নির্ভরযোগ্যতা অর্জন করতে হবে।

এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিতে বিদেশি বিনিয়োগের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তি, দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা পাওয়া যাবে এবং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হতে পারবে। তবে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে ব্যবসার পরিবেশে পরিবর্তন আনতে হবে। কর ও নীতিমালার স্থিতিশীলতা, দ্রুত অনুমোদন, স্বচ্ছ কাস্টমস-ব্যবস্থা, চুক্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া বন্দর ও পরিবহনব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং বিনিয়োগকারীরা যাতে বৈধ মুনাফা ও মূলধন সহজে দেশে ফিরিয়ে নিতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার কথা বলে তিনি জানান, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৯ শতাংশ। সরকারের মোট রাজস্ব ও প্রাপ্ত অনুদানের পরিমাণ ছিল জিডিপির ৮ শতাংশ। সরকারের আয় বাড়াতে করের আওতা সম্প্রসারণ এবং কর আদায়ে ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়াতে হবে। ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করলে অবকাঠামো, শিক্ষা ও জনসেবায় বিনিয়োগের জন্য সরকারের হাতে বাড়তি অর্থ থাকবে। এছাড়া সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ও বহিস্থ খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ভবিষ্যতে ঋণের কঠিন শর্তাবলি বিবেচনায় রাখতে হবে।

এলডিসি উত্তরণের পর জলবায়ু ও উন্নয়ন খাতে বিশেষ সহায়তা পাওয়ার সুযোগ বদলে যেতে পারে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এখন থেকেই অর্থায়নের বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে। জলবায়ু অভিযোজন, স্বল্প সুদের ঋণ এবং সরকারি-বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।

শ্রম অধিকার ও পরিবেশগত মান উন্নয়নের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন পণ্য কেনার ক্ষেত্রে উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় শ্রমিকের অধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়গুলো বিবেচনা করেন। এসব ক্ষেত্রে উন্নতি করতে পারলে রপ্তানি বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা অন্য শিল্প খাতেও কাজে লাগানো যেতে পারে।

এই বাড়তি তিন বছর সময়কে কাজে লাগাতে হলে সরকারের নেতৃত্বে সুনির্দিষ্ট ও সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে, যেখানে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। প্রথম বছরে কোন খাতে কী ধরনের শুল্ক ও বাণিজ্যবিধি পরিপালনসংক্রান্ত ঝুঁকি আছে, তা চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি কোন দেশ বা অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা অগ্রাধিকার পাবে, তা নির্ধারণ ও সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে বণ্টন করতে হবে। দ্বিতীয় বছরে শুল্ক, জ্বালানি, পরিবহন, ব্যাংক খাত, বিনিয়োগ ও দক্ষতা উন্নয়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করতে হবে। তৃতীয় বছরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো উত্তরণের জন্য কতটা প্রস্তুত, তা যাচাই করে বাকি সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে। উত্তরণের পরও যাতে প্রস্তুতি ও সংস্কারের ধারাবাহিকতা থাকে, সে ব্যবস্থা করতে হবে।

সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, “অ্যামচেম বাংলাদেশ মনে করে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা ও সহযোগিতা থাকা প্রয়োজন। আমাদের সদস্যপ্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন দেশের বাজারে কাজ করছে। তাদের অভিজ্ঞতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণ এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে আমরা সহযোগিতা করতে চাই।”

বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী হয়ে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্ভাবনা নিয়ে আমরা আশাবাদী। তবে ২০২৯ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়; বরং এই তিন বছর সময় কাজে লাগিয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে। শেষ পর্যন্ত এই তিন বছরের সাফল্য নির্ভর করবে কতটা সংস্কার করা গেল, কত বিনিয়োগ এল ও দেশের মানুষের জন্য কত নতুন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হলো, তার ওপর।”