জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বাড়িটি রংপুর শহরের দর্শনা মোড়ে, রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের পাশে। বাড়ির নাম ‘পল্লী নিবাস’। বলা যায় বাড়িটি প্রায় অভিভাবকহীন। অনেকে মনে করেন, জাতীয় পার্টির (জাপা) বর্তমান অবস্থার সঙ্গে বাড়িটির অনেক মিল আছে। রংপুরে দলটির অবস্থা আগের মতো শক্ত নেই।

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাতটায় ওই বাড়িতে গিয়ে দেখলাম, মূল ফটক বন্ধ। ভেতরে বিভিন্ন তলায় আলো দেখা গেল। ডাকাডাকির পরও কেউ ফটক খুললেন না। ছোট ফটকটি লাল সুতা দিয়ে বাঁধা ছিল। সুতা খুলে ভেতরে ঢুকে ডাকাডাকি করে কোনো সাড়া পাওয়া গেল না।

রাস্তার উল্টো দিকে শহিদুল ইসলামের চায়ের দোকান। দোকানে দুই কোনায় লাঙ্গলের প্রার্থীর পোস্টার আকারের ব্যানার ঝোলানো। সন্ধ্যায় চায়ের দোকান মানেই সেখানে নির্বাচনী আড্ডা। এখানে প্রথমে কথা হয় ট্রাকচালক নূর আলমের সঙ্গে। তিনি ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার। বললেন, ‘রংপুরবাসী জাতীয় পার্টিকেই ভোট দেবে।’

বেঞ্চের উল্টো দিকে এসে বসলেন আলু ব্যবসায়ী আনিসুর রহমান। ঢুকলেন কথার মাঝে। বললেন, ‘ভোটটা মাগনা নাকি। মানুষ জাতীয় পার্টিকে ভোট দিয়ে ভোট নষ্ট করবে কেন। এবার কনটেস্ট হবে ধানের শীষ আর দাঁড়িপাল্লার মধ্যে। এরশাদ ছিলেন, অন্য কথা।’ আলু ব্যবসায়ীর কথায় বোঝা গেল না তিনি কোন পক্ষের।

চায়ের দোকানে মানুষ আসছেন, যাচ্ছেন। এরপর এলেন জনা সাতেক একসঙ্গে। প্রত্যেকের বুকে ধানের শীষ প্রতীক। তাঁরা জাতীয়তাবাদী ব্যাটারিচালিত অটো শ্রমিক দলের সদস্য। একজন দিবাকর ভৌমিক বলেন, ‘এখানে আমাদের অবস্থান ভালো। জাতীয় পার্টি এখানে দাঁড়াতেই পারবে না।’

চায়ের দোকানের একটু পেছনেই অন্য একটি দোকানে বসে ছিলেন দর্শনা বাজার মসজিদের ইমাম আল ইমরান ও জাতীয় পাটির একজন সমর্থক সিরাজুল ইসলাম। আল ইমরানের দাবি, তিনি কোনো দলের সমর্থক নন। সবাই তাঁর মুসল্লি। তাঁর ধারণা, এখানে লড়াইটা হবে দাঁড়িপাল্লা আর লাঙ্গলের মধ্যে।

একসময় প্রায় শতভাগ মানুষ লাঙ্গলের সমর্থক ছিল, এখন সমর্থন কমে ২০ শতাংশে এসে ঠেকেছে বলে মনে করেন সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি ভাঙছে বারবার। রওশন এরশাদ, জি এম কাদেরদের মধ্যে ‘কামড়াকামড়ি’। রংপুরবাসী বিভ্রান্ত, আছে দোটানায়।

জাপার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান ব্যক্তি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রংপুরের মানুষ। শহরে তাঁদের পুরোনো বাড়ি রয়েছে। ১৯৯১ সালে প্রথম নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে তিনি জেল থেকে নির্বাচন করে পাঁচটি আসনে দাঁড়িয়ে সব কটিতেই জিতেছিলেন। সেই থেকে রংপুর জাতীয় পার্টির মূল ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। দেশের অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক শক্তি, জনসমর্থন উত্তরাঞ্চলে বেশি, বিশেষ করে রংপুর জেলায়।

১৯৯১ সালে রংপুরের ছয়টি আসনই পায় জাপা। এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও ফলাফল একই ছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করে। ওই নির্বাচনে তিনটি আসনে জাপা জেতে, আওয়ামী লীগ জেতে তিনটিতে। দেশের ইতিহাসে এই চারটি নির্বাচন ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। চারটি নির্বাচনেই রংপুরে জাপার অবস্থান দৃঢ় ছিল। এবার দলটি রংপুরের ছয় আসনেই প্রার্থী দিয়েছে। তবে রংপুর-১ (গঙ্গাচড়া ও সিটি করপোরেশন) আসনে তাদের প্রার্থী দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে ভোটের আগেই বাদ পড়েছেন।

বুধ, বৃহস্পতি ও শুক্রবার—তিন দিনে জেলার বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে ধারণা পাওয়া যায়, নিজের ঘাঁটিতে দুর্বল হয়ে পড়েছে জাপা। এর আগে পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলা ঘুরেও ভোটারদের মুখে জাপার কথা শোনা যায়নি। যে আওয়ামী লীগকে দেশের মানুষ ক্ষমতা থেকে তাড়িয়েছে, তার সঙ্গে দলটির সখ্য ছিল। এ ছাড়া নতুন প্রজন্মের ভোটারদের পছন্দের তালিকায়ও নেই দলটি।

এরশাদের ছোট ভাই জি এম কাদের নির্বাচনী প্রচারে এখন রংপুরে। গতকাল শুক্রবার সকালে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘জাতীয় পার্টির ঘাঁটি অটুট আছে। আমার মনে হয় অবস্থা আগের চেয়ে ভালো।’

অনেকে মনে করেন, আওয়ামী লীগের জন্য গোপালগঞ্জ বা বিএনপির জন্য বগুড়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক জাতীয় পার্টির জন্য তেমনই গুরুত্বপূর্ণ রংপুর। তবে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারা মনে করেন, জাতীয় পার্টির সেই অবস্থান এখন নেই।

রংপুর মহানগর জামায়াতের আমির এ টি এম আজম খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, রংপুর একসময় জাতীয় পার্টির ঘাঁটি ছিল। এটা এখন অতীত। মানুষ জানে, দলটি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছিল।

একই সুরে বললেন বিএনপির প্রার্থী ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সামসুজ্জামানও। মুক্তকণ্ঠকে তিনি বলেন, রংপুরের মানুষ জাতীয় পার্টিকে বর্জন করেছেন। রংপুর এখন আর জাতীয় পার্টির ঘাঁটি নয়।

গতকাল সকাল থেকে কাউনিয়ার হারাগাছা থেকে মোটরসাইকেলে শোডাউন ও গণসংযোগ করেন রংপুর-৪ আসনের ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী ও এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন। জাতীয় পার্টির বর্তমান অবস্থা ও অবস্থান প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন জাতীয় পার্টির লোকজন দলে দলে এনসিপিতে যোগ দিচ্ছেন। গতকাল জাতীয় পার্টির ৫০ জনের মতো লোক আমাদের দলে যোগ দিয়েছেন। দলটি আর কোনো প্রজন্ম তৈরি করতে পারেনি। এটাই জাতীয় পার্টির শেষ প্রজন্ম।’

রংপুরে অন্য যেকোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ের চেয়ে জাতীয় পার্টির কার্যালয় আকারে বড় ও সাজানো-গোছানো। বৃহস্পতিবার রাতে সেখানে কথা হয় দলটির কেন্দ্রীয় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রংপুর মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াসিরের সঙ্গে। তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটার এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ জাতীয় পার্টিকে ভোট দেবে।

নাগরিক সমাজের সদস্যরাও মনে করেন, জাতীয় পার্টি এখন নড়বড়ে অবস্থানে। জেলা মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রুম্মানা খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, জাতীয় পার্টি তাদের অবস্থান ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের ভোটব্যাংক এবার ভাগ হবে।

সাধারণ মানুষও মনে করছেন, জাতীয় পার্টি তাঁদের দল নয়। গতকাল সকালে গঙ্গাচড়ার হাবু পাঁচমাথায় রাস্তার পাশে চায়ের দোকানের সামনে জনা দশেক মানুষের সঙ্গে কথা হয়। তাঁদের প্রত্যেকের বয়স ৫০-এর ওপরে। কেউ কেউ জাতীয় পার্টি বা এরশাদের ভক্ত ছিলেন। তাঁদের একজন বলেন, ‘জাতীয় পার্টির জন্য ভোট চাওয়া লাগত না, প্রচার লাগত না, মানুষ ভালোবেসে ভোট দিত। কিন্তু এখন আর দেবে না।’