সন্তানের অবাধ্যতা, ঔদ্ধত্য কিংবা ভুল আচরণের কারণে অনেক সময় বাবা-মা চরম মানসিক কষ্টের সম্মুখীন হন। এই তীব্র ক্ষোভ ও রাগের বশবর্তী হয়ে অনেক অভিভাবকই সন্তানকে অভিশাপ বা বদদোয়া দিয়ে বসেন। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে বাবা-মায়ের এই বদদোয়া সন্তানের ইহকাল ও পরকাল—উভয় জগতের জন্যই এক ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

ইসলামিক বিশ্বাস অনুযায়ী, আল্লাহর কাছে একজন পিতা বা মাতার দোয়ার যে বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, তা অন্য কারও ক্ষেত্রে নেই। বাবা-মা যখন অন্তরের গভীর থেকে সন্তানের জন্য দোয়া করেন, তা যেমন সরাসরি আল্লাহর আরশে পৌঁছে যায়, তেমনি তাঁরা যখন তীব্র কষ্ট বা রাগের মাথায় বদদোয়া করেন, সেটিও অত্যন্ত দ্রুত কবুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

এই বিষয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া নিঃসন্দেহে কবুল হয়—মজলুমের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং সন্তানের ওপর পিতা-মাতার দোয়া।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৫৩৬)

এর অর্থ হলো, বাবা-মায়ের সামান্য রাগও সন্তানের জীবনের সমস্ত বরকত ও কল্যাণ নষ্ট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। তাই সতর্ক থাকা প্রয়োজন যেন রাগের মাথায় এমন কিছু বলা না হয় যা সন্তানের জীবনকে বিপর্যস্ত করে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এই বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের ওপর বদদোয়া কোরো না, তোমাদের সন্তানদের ওপর বদদোয়া কোরো না এবং তোমাদের সম্পদের ওপর বদদোয়া কোরো না। এমন যেন না হয় যে তোমরা আল্লাহর কাছে এমন একটি সময়ে বদদোয়া করলে, যা দোয়া কবুলের সময়, আর আল্লাহ তোমাদের সেই বদ দোয়া কবুল করে নিলেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩০০৯)

সন্তান যতই অবাধ্য হোক না কেন, ইসলাম পিতা-মাতাকে রাগের মাথায় বদদোয়া দিতে নিষেধ করেছে। কারণ, রাগের বশবর্তী হয়ে দেওয়া বদদোয়া যদি আল্লাহর দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্তের সঙ্গে মিলে যায়, তবে তা সন্তানের জীবনে স্থায়ী ধ্বংস ডেকে আনে। আর এর চূড়ান্ত ফল হিসেবে পরবর্তীতে বাবা-মাকেই অনুতপ্ত হতে হয়।

মায়ের রাগের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার বাস্তব প্রমাণ মেলে হাদিসে বর্ণিত বনি ইসরাইলের জুরাইজ নামক এক ইবাদতগুজার ব্যক্তির ঘটনায়। জুরাইজ তাঁর উপাসনালয়ে নফল নামাজ পড়ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর মা তাঁকে ডাকেন। জুরাইজ দ্বিধায় পড়েছিলেন যে তিনি নামাজ ছেড়ে দেবেন নাকি মায়ের ডাকে সাড়া দেবেন; শেষ পর্যন্ত তিনি নামাজ চালিয়ে যান। এতে মা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে বদদোয়া দিলেন যে ‘হে আল্লাহ, কোনো ব্যভিচারিণীর মুখ দেখার আগে তুমি জুরাইজের মৃত্যু দিয়ো না।’

এই বদদোয়ার প্রভাব ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। এক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে জুরাইজকে এক ব্যভিচারিণীর কারণে চরম লাঞ্ছনা ও বিপদের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। যদিও আল্লাহর অশেষ রহমতে তিনি পরবর্তীতে মুক্তি পেয়েছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪৩৬)

এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, সন্তানের ব্যক্তিগত ইবাদত বা নেক আমলও বাবা-মায়ের রাগের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে তাকে পুরোপুরি বাঁচাতে পারে না।

সন্তান ভুল করলে তাকে শাসন করার পূর্ণ আইনি ও নৈতিক অধিকার পিতা-মাতার রয়েছে, তবে সেই শাসন যেন কখনোই ধ্বংসাত্মক বদদোয়ার রূপ না নেয়। ইবনে কাসির (রহ.) উল্লেখ করেছেন, রাগের সময় মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না; তাই সন্তান যতই অবাধ্য হোক না কেন, পিতা-মাতার উচিত তাদের হেদায়েত ও সংশোধনের জন্য আল্লাহর কাছে সুন্দর দোয়া করা, বদদোয়া নয়। কারণ বদদোয়া সন্তানের ইহকাল–পরকাল উভয়ই ধ্বংস করে দেয়। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, সুরা ইসরার ২৩-২৪ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা, দারু তাইয়িবাহ, রিয়াদ, ১৯৯৯)

একইভাবে ইবনে আবিদিন (রহ.) লিখেছেন, সন্তান অবাধ্য হলে তাকে শাসন করার অধিকার পিতা-মাতার রয়েছে, কিন্তু এমন কোনো ভাষা বা বাক্য ব্যবহার করা মাকরুহ (অপছন্দনীয়), যা সন্তানের স্থায়ী ক্ষতির কারণ হয়। (ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, ৬/৪২৮, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)

পিতা-মাতার অন্তর হলো সন্তানের জন্য এক বিশাল রহমতের ছায়া। রাগের মাথায় বদদোয়া না দিয়ে সন্তানের সুমতি ও হেদায়েতের জন্য দোয়া করাই হলো নবীজির আদর্শ। অন্যদিকে সন্তানেরও উচিত সবসময় সতর্ক থাকা, যেন তার কোনো আচরণ বা কথায় বাবা-মায়ের অন্তর সামান্যতমও আহত না হয়; কারণ তাঁদের অসন্তুষ্টির মাঝেই লুকিয়ে আছে উভয় জগতের চরম ব্যর্থতা।