মানব ইতিহাসের এক অন্ধকার ও কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে পরিচিত জাহিলি যুগ। সেই সময়ে নারী জাতির সম্মান ও মর্যাদার কোনো অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে। নারীদের কেবল পুরুষের ভোগ্যবস্তু হিসেবে গণ্য করা হতো এবং তারা প্রতিনিয়ত নানাভাবে নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত হতেন। এমনকি কন্যাসন্তান জন্ম নিলে তাদের জীবন্ত পুঁতে ফেলার মতো নৃশংস প্রথা প্রচলিত ছিল।

যেসব কন্যা শিশু বড় হয়ে উঠত, তাদের বিয়ের উপযুক্ত হওয়ার পর কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা নিয়ম ছাড়াই পুরুষের অধীনে ন্যস্ত করা হতো। তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় নারীরা নিজেদের মৌলিক অধিকার পাওয়ার কথা চিন্তাই করতে পারতেন না। পুরুষের অনুগ্রহে সামান্য যা কিছু পাওয়া যেত, তা-ই ছিল তাদের জন্য বড় প্রাপ্তি। এমনকি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদে তাদের চোখ তুলে তাকানোকেও অন্যায় হিসেবে দেখা হতো।

জাহেলি যুগে বিয়ের নামে নারী ও পুরুষ কীভাবে চরম নির্যাতনের শিকার হতেন, তার একটি বাস্তব ও বিস্তারিত চিত্র হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। হাদিসের এক দীর্ঘ বর্ণনায় সে সময়ের অদ্ভুত ও অমানবিক বিবাহপ্রথাগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

আয়েশা (রা.) বলেছেন, জাহিলি যুগে চার প্রকার বিয়ের প্রচলন ছিল।

প্রথম প্রথা: এই ধরনের বিয়ে ছিল বর্তমান সময়ের বিয়ের মতোই। বিয়ে করতে ইচ্ছুক পুরুষ পাত্রীর পুরুষ অভিভাবকের কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যেতেন। এরপর উভয় পক্ষের সম্মতিতে মোহর নির্ধারণ করে বিয়ে সম্পন্ন করা হতো।

দ্বিতীয় প্রথা: এই প্রথায় স্বামী তার স্ত্রীকে বলতেন, “তুমি মাসিক ঋতু থেকে পবিত্র হওয়ার পর অমুক ব্যক্তির কাছে যাও এবং তার সঙ্গে মিলিত হও।” এরপর স্বামী তার স্ত্রী থেকে পৃথক থাকতেন। স্ত্রী ওই ব্যক্তির সঙ্গ গ্রহণ করতেন এবং যতক্ষণ না তিনি সন্তানসম্ভবা হতেন, ততক্ষণ স্বামী তার কাছে ফিরে আসতেন না। যখন গর্ভ সুস্পষ্ট হতো, তখন স্বামীর ইচ্ছা হলে তারা একত্রে থাকতেন। মূলত সন্তানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিরূপণ এবং উন্নত জাতের সন্তান লাভের উদ্দেশ্যেই এমনটা করা হতো। জাহেলি যুগে এই প্রথাকে ‘নিকাহ আল–ইস্তিবদা’ বলা হতো।

তৃতীয় প্রথা: এই প্রথাটি ছিল আরও ভয়াবহ। এখানে অনধিক ১০ জন পুরুষ পর্যায়ক্রমে একজন স্ত্রীলোকের সঙ্গে মিলিত হতেন। এরপর সেই নারী গর্ভবতী হয়ে সন্তান প্রসব করতেন। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর কিছুদিন অতিবাহিত হলে ওই নারী সবাইকে তাঁর কাছে আসার জন্য পত্র প্রেরণ করতেন এবং পত্র পাওয়ার পর তাঁরা সবাই তাঁর কাছে আসতে বাধ্য হতেন। সবাই উপস্থিত হওয়ার পর ওই নারী বলতেন, “তোমরা তোমাদের কর্ম সম্পর্কে অবশ্যই অবগত আছ, যার ফলে আমি এ সন্তান জন্ম দিয়েছি।” এরপর তিনি উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে তাঁর পছন্দমতো একজনের নাম ধরে সম্বোধন করে বলতেন, “হে অমুক, এ সন্তান তোমার।” তখন ওই ব্যক্তি শিশুটিকে গ্রহণ করতে বাধ্য থাকতেন এবং ওই নারী তাঁর স্ত্রীরূপে গণ্য হতেন।

চতুর্থ প্রথা: এই প্রথাটি ছিল চরম অবক্ষয়ের নিদর্শন। বহু লোক একসঙ্গে হয়ে পালাক্রমে একজন নারীর নিকট গমন করত। আর যে-ই তার শয্যাসঙ্গী হওয়ার উদ্দেশ্যে আসত, তিনি কাউকেই বারণ করতেন না। এদের পরিচয় ছিল ‘বারবণিতা’। তারা তাদের ঘরের দরজায় বিশেষ নিশান লাগিয়ে রাখত, যা ছিল তাদের অপকর্মের চিহ্ন। যে কেউ সেই নিশান দেখে তাদের নিকট গিয়ে শয্যাসঙ্গী হতে পারত। এভাবে যদি ওই নারী গর্ভবতী হতেন, তবে সন্তান প্রসবের পর তিনি তার সঙ্গ গ্রহণকারী সবাইকে উপস্থিত করতেন এবং একজন ‘কাফাহ’ ডাকতেন। কাফাহ বলতে তাদের বোঝানো হতো, যারা সন্তানের মুখ অথবা শরীরের অঙ্গ দেখে বলতে পারে যে, সে অমুকের ঔরসজাত সন্তান। সেই কাফাহ সন্তানটিকে ওই ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত করত, যার সঙ্গে শিশুর শারীরিক সাদৃশ্য দেখা যেত। এরপর ওই ব্যক্তিকে সন্তানের পিতা হিসেবে ডাকা হতো এবং তিনি তা অস্বীকার করতে পারতেন না।

এরপর আল্লাহ–তাআলা মুহাম্মাদকে রাসুল হিসেবে প্রেরণ করেন। তিনি এসে জাহেলি যুগে প্রচলিত ওই সব বিবাহপ্রথাকে বাতিল ঘোষণা করেন এবং বর্তমানে ইসলামের বিধিবদ্ধ যে বিবাহরীতি চালু আছে, তা বলবৎ রাখেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২২৭২)

ইসলামের আগমনের পর নারী জাতি তাদের সামগ্রিক অধিকার ফিরে পায়। মা, বোন ও স্ত্রী হিসেবে তারা সমাজে সম্মান ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়। বিয়েতে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বামী ব্যতীত অন্য পুরুষের হিংস্র আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং সন্তান জন্মদানের পর তারা যথাযথ মর্যাদা ও অধিকার লাভ করেন।

— মাহমুদ হাসান ফাহিম, আলেম ও লেখক