সৃষ্টিকর্তা দয়াময় আল্লাহ মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা এবং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করার জন্য বিবেক দান করেছেন। তবে পবিত্র কোরআনে এমন কিছু হতভাগ্য মানুষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের অন্তরে আল্লাহ সিলগালা বা মোহর মেরে দেন। এর ফলে সেই মানুষটি সত্য উপলব্ধি করার এবং সঠিক পথে ফিরে আসার যাবতীয় যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। আল্লাহ পরম করুণাময় হওয়া সত্ত্বেও কেন নির্দিষ্ট কিছু মানুষের অন্তরে মোহর মেরে দেন, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
অহংকার ও স্বৈরাচারী মনোভাব অন্তরে মোহর পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। যখন সত্য সুস্পষ্টভাবে সামনে উপস্থিত হয়, তখন তা মেনে নেওয়ার পরিবর্তে কেবল অহংকারের বশবর্তী হয়ে প্রত্যাখ্যান করলে অন্তরে মোহর পড়ে যায়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘এভাবেই আল্লাহ প্রত্যেক অহংকারী ও স্বৈরাচারীর অন্তরে মোহর মেরে দেন।’ (সুরা গাফির, আয়াত: ৩৫)
ইমাম তাবারি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনের ওপর নিজেকে বড় মনে করে এবং সত্যকে তাচ্ছিল্য করে, আল্লাহ তার অন্তরকে এমনভাবে অবরুদ্ধ করে দেন যে সেখানে আর কোনো খোদায়ি আলো প্রবেশ করতে পারে না।” (আত-তাবারি, জামিউল বয়ান ফি তাওয়িলিল কুরআন, ২১/৩৬৫, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০০০)
পাপের পথে অবিচল থাকা এবং অনুতপ্ত না হওয়া হৃদয়ে কালো দাগ তৈরি করে। ধারাবাহিকভাবে পাপ করে গেলে একসময় এই পাপের আস্তর পুরো হৃদয়কে ঢেকে ফেলে, যা মোহরের রূপ নেয়। এই বিষয়ে মহানবী (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘মুমিন যখন কোনো পাপ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। সে যদি তওবা করে এবং পাপ থেকে ফিরে আসে, তবে অন্তর আবার পরিষ্কার হয়ে যায়। কিন্তু সে যদি পাপ বাড়াতেই থাকে, তবে দাগটিও বাড়তে থাকে; একপর্যায়ে তা পুরো অন্তরকে গ্রাস করে নেয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৩৩৪)
পূর্ববর্তী জাতিগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বারবার আল্লাহর বিধান অমান্য করা এবং ওয়াদা ভঙ্গের কারণেই তাদের অন্তরে মোহর মারা হয়েছিল। আল্লাহর সঙ্গে করা ইমানের চুক্তি কিংবা মানুষের সঙ্গে করা সামাজিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা অন্তরের মৃত্যু ডেকে আনে। এই বিষয়ে আল্লাহ বলেন, ‘অতএব তাদের চুক্তি ভঙ্গের কারণে এবং আল্লাহর আয়াতসমূহ অস্বীকার করার কারণে... আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন; ফলে অল্পসংখ্যক ছাড়া তারা ইমান আনবে না।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৫৫)
দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহে অন্ধ হয়ে যারা পরকালের অনন্ত জীবনকে ভুলে যায় এবং পার্থিব স্বার্থকেই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানিয়ে নেয়, আল্লাহ তাদের অন্তরকে সত্য গ্রহণের অযোগ্য করে দেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘এটা এ জন্য যে তারা পরকালের চেয়ে দুনিয়ার জীবনকে বেশি ভালোবেসেছে... এরাই তারা, যাদের অন্তর, কান ও চোখের ওপর আল্লাহ মোহর মেরে দিয়েছেন এবং এরাই হলো গাফেল বা উদাসীন।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ১০৭-১০৮)
ইসলামের দৃষ্টিতে অন্তরে অবিশ্বাস লুকিয়ে রেখে মুখে ইমানের দাবি করা বা সুবিধাবাদী আচরণ করা অত্যন্ত ভয়ংকর অপরাধ। মোনাফেকরা বারবার ইমান আনে এবং পুনরায় কুফরিতে ফিরে যায়। এই দ্বিমুখী আচরণের ফলে তাদের অন্তরে মোহর পড়ে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘এটা এ জন্য যে তারা ইমান আনার পর আবার কুফরি করেছে; ফলে তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেওয়া হয়েছে, তাই তারা এখন আর বুঝতে পারে না।’ (সুরা মোনাফেকুন, আয়াত: ৩)
ইমাম গাজালি উল্লেখ করেছেন, “মোনাফেকি হলো আত্মার একধরনের ক্যানসার, যা ধীরে ধীরে মানুষের আধ্যাত্মিক স্নায়ুগুলো অকেজো করে দেয়; ফলে অন্তরে মোহর পড়ে যায় এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য করার বোধ চিরতরে বিলুপ্ত হয়।” (আল-গাজালি, ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন, ৩/১৩, দারুল মারিফাহ, বৈরুত, ১৯৮২)
মূলত হৃদয়ে মোহর পড়ে যাওয়া আল্লাহর কোনো প্রাথমিক শাস্তি নয়; বরং এটি মানুষের দীর্ঘদিনের অবাধ্যতা, চরম অহংকার এবং বারবার সত্য প্রত্যাখ্যান করার চূড়ান্ত পরিণতি। তাই মুমিনের উচিত সর্বদা নিজের অন্তরের সুরক্ষার জন্য আল্লাহর কাছে সেই দোয়াটি করা, যা মহানবী (সা.) সবচেয়ে বেশি করতেন, ‘হে অন্তরসমূহ পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে আপনার ধর্মের ওপর অবিচল রাখুন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২১৪০)