পবিত্র কোরআন পাঠের ফজিলত ও মর্যাদা অপরিসীম। মহানবী (সা.) বলেছেন, তোমরা কোরআন পাঠ করো, কারণ কেয়ামতের দিন তা পাঠকারীর জন্য সুপারিশকারী হিসেবে আগমন করবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮০৪)

কোরআন পাঠের ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত বাহ্যিক নিয়মকানুন—যেমন অজু করা, শুদ্ধভাবে তাজবিদ মেনে উচ্চারণ করা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর বেশি জোর দিয়ে থাকি। তবে কোরআনের মূল সুধা ও অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবনের জন্য হৃদয়ের অনুভূতির প্রয়োজন রয়েছে।

কালজয়ী ইসলামি চিন্তাবিদ ইমাম আবু হামিদ গাজালি তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থে কোরআন অনুধাবনের তেমনই ৫ গোপন রহস্য তুলে ধরেছেন। (আল-গাজালি, কিতাবুল আরবাইন ফি উসুলিদ ধর্ম, ১/৬৪, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৩)

পবিত্র অজুর পানি যেমন শরীরের বাহ্যিক অপবিত্রতা দূর করে, তেমনি অন্তরের কলুষতা দূর না হলে কোরআনের গভীর অর্থ মানুষের কাছে উন্মোচিত হয় না।

কোরআন পাঠ শুরুর প্রথম রহস্যটি হলো বাণীর মহান বক্তা অর্থাৎ আল্লাহর অসীম মহত্ত্ব হৃদয়ে ধারণ করা। পাঠকারীকে শুরুতেই স্মরণ করতে হবে যে তিনি যা পাঠ করছেন তা কোনো সাধারণ মানুষের কথা নয়; বরং তা আসমান, জমিন, আরশ, ফেরেশতা, মানবজাতি, জিন ও পুরো সৃষ্টিজগতের একচ্ছত্র মালিকের শাশ্বত বাণী।

সৃষ্টির সবকিছু যাঁর নিয়ন্ত্রণে এবং যাঁর দয়ার ওপর নির্ভরশীল, সেই পরম সত্তার গুণাবলি, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা তাঁর বাণীর ভেতরে প্রতিফলিত হচ্ছে।

পবিত্র অজুর পানি যেমন শরীরের বাহ্যিক অপবিত্রতা দূর করে, তেমনি অন্তরের কলুষতা দূর না হলে কোরআনের গভীর অর্থ মানুষের কাছে উন্মোচিত হয় না।

দ্বিতীয় রহস্যটি হলো অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে অর্থ বুঝে পাঠ করা, যাকে ইসলামি পরিভাষায় ‘তাদাব্বুর’ বলা হয়। না বুঝে শুধু দ্রুত গতিতে পৃষ্ঠা উল্টে যাওয়া কোরআনের আসল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে।

অসচেতন মন নিয়ে শুধু জিভের উচ্চারণে যে পাঠ করা হয়, তা অন্তরে কোনো স্থায়ী প্রভাব ফেলে না।

এ বিষয়ে আলী (রা.) একটি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করে বলেছেন, যে ইবাদতে অনুধাবন নেই তাতে কোনো কল্যাণ নেই, আর যে পাঠে গভীর চিন্তাভাবনা নেই তারও কোনো ফল নেই। (আল-গাজালি, কিতাবুল আরবাইন ফি উসুলিদ ধর্ম, ১/৬৬, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৩)

নিশ্চয়ই আমি তাদের অন্তরের ওপর আবরণ দিয়ে রেখেছি যেন তারা তা অনুধাবন করতে না পারে এবং তাদের কানে দিয়েছি বধিরতা।

তৃতীয় গোপন দিকটি হলো কোরআনের আয়াতের বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য লক্ষ করা। তাহলে পাঠের সঙ্গে সঙ্গ অনুভূতিরও বদল হবে।

আল্লাহর নাম, গুণ ও মহিমার বর্ণনা আসে, তখন অন্তরে তৈরি হবে অসীম শ্রদ্ধার অনুভূতি। যখন হেদায়েতের বাণী আসে, তখন হৃদয়ে জাগবে আল্লাহর রহমতের আশা। আর যখন পূর্ববর্তী নবী-রাসুলদের জীবনে প্রাপ্ত আল্লাহর দয়া ও নেয়ামতের গল্প উঠে আসে, তখন অন্তরে কৃতজ্ঞতা ও উদারতার স্পন্দন তৈরি হবে।

আয়াতের ধরণ অনুধাবন করে সেই অনুযায়ী মানসিক প্রস্তুতি নেওয়াই হলো অনুধাবনের মূল চাবিকাঠি।

চতুর্থ রহস্যটি হলো কোরআন অনুধাবনের পথে প্রধান বাধা বা মানসিক পর্দাগুলো দূর করা। অনেক সময় মানুষের অন্তরের ওপর একধরনের অদৃশ্য আবরণ পড়ে যায়, যা বাণীর সত্য অনুধাবনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, নিশ্চয়ই আমি তাদের অন্তরের ওপর আবরণ দিয়ে রেখেছি যেন তারা তা অনুধাবন করতে না পারে এবং তাদের কানে দিয়েছি বধিরতা। (সুরা কাহফ, আয়াত: ৫৭)

সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এই পর্দা তৈরি হয় ক্ষতিকর সংশয় কিংবা পার্থিব কামনাবাসনায় মগ্ন থাকার কারণে। তবে যারা একাগ্র মনে ধার্মিকতার চর্চা করেন, তাদের ক্ষেত্রেও দুটি সূক্ষ্ম বাধা তৈরি হতে পারে।

প্রথমত, পাঠকারী তাজবিদের কড়াকড়ি উচ্চারণে এতটাই মগ্ন হয়ে পড়েন যে বাক্যের সুর হারিয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত, কোরআনের শুধু বাহ্যিক আক্ষরিক অর্থে নিজেকে আটকে রাখা এবং বাণীর মূল নির্যাস এড়িয়ে যাওয়া। যেমন পার্থিব চোখের সীমাবদ্ধতা এবং পরকালের দর্শনের বিষয়টি সঠিকভাবে না বুঝলে কোরআনের আক্ষরিক ও গভীর অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবনে বৈপরীত্য তৈরি হতে পারে। (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৪৩)

যখন একজন পাঠকারী তাঁর চিন্তা, অন্তর ও শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে কোরআনের এই অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারেন, তখনই কোরআন পাঠ এক মহিমান্বিত অভিজ্ঞতায় রূপ নেয়।

কোরআন পাঠের চূড়ান্ত রহস্যটি হলো বাণীর দ্যুতি শুধু মাথায় ধারণ করে ক্ষান্ত না হয়ে তা আচরণ ও শারীরিক অভিব্যক্তিতে ফুটিয়ে তোলা। পাঠকৃত প্রতিটি আয়াতের গুণাবলিতে নিজেকে সজ্জিত করতে হবে।

যখন ক্ষমার সুসংবাদ বা বেহেশতের বিবরণ আসবে, তখন অন্তরে পরম আনন্দের জোয়ার বইবে; যখন আল্লাহর রাগ বা জাহান্নামের শাস্তির কথা আসবে, তখন অন্তরে ভীতি ও অনুশোচনা জেগে উঠবে। আর যখন পরম আল্লাহর মহাসমহিম রূপের বর্ণনা আসবে, তখন বিনয়ে মাথা নত হয়ে আসবে।

এই আত্মিক অনুভূতির প্রতিফলন ঘটবে চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু বা চেহারার বিনম্র ভাবের মধ্য দিয়ে।

যখন একজন পাঠকারী তাঁর চিন্তা, অন্তর ও শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে কোরআনের এই অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারেন, তখনই কোরআন পাঠ এক মহিমান্বিত অভিজ্ঞতায় রূপ নেয় এবং আল্লাহর বরকত তাঁর সমগ্র অস্তিত্বকে আলোকিত করে তোলে।