বিশ্ব ক্রিকেটে দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকারী অস্ট্রেলিয়া কি তবে ধীরে ধীরে তাদের দাপট হারাচ্ছে? এক সময় বড় টুর্নামেন্টগুলোর শিরোপার দৌড়ে যাদের নাম সবার আগে আসত, সেই দলটিই এখন একের পর এক ব্যর্থতার কারণে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়, ওয়ানডে সিরিজে পরাজয়, নিজেদের ঘরের মাঠে বাংলাদেশের কাছে ঐতিহাসিক টেস্ট হার এবং সর্বশেষ দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে সিরিজ খুইয়ে টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থান হারানো—সব মিলিয়ে প্যাট কামিন্সদের পুরুষ ক্রিকেট দলের জন্য উদ্বেগের কারণ এখন অনেক। তবে এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা কি সত্যিই একটি যুগের অবসানের ইঙ্গিত দিচ্ছে, নাকি এটি কেবল সাময়িক একটি সংকট?
সাম্প্রতিক সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে। তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজের প্রথম লড়াইয়ে ২১৪ রানের বিশাল জয় নিয়ে দারুণ সূচনা করেছিল অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু পরবর্তী দুই ম্যাচে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। গেবেখায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় টেস্টে ইনিংস ও ৩১ রানে হারের পর কেপটাউনের সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচেও ১৭৬ রানে পরাজিত হয় সফরকারীরা। এর ফলে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ হারানোর পাশাপাশি আইসিসির টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থানটি হাতছাড়া করে অস্ট্রেলিয়া।
বিশেষ করে শেষ দুটি টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং বিপর্যয় ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গেবেখায় প্রথম ইনিংসে তারা মাত্র ৯৯ রানেই অলআউট হয়ে যায়। অন্যদিকে কেপটাউনে প্রথম ইনিংসে ৪২৯ রান তুলে ১০০ রানের লিড নেওয়া সত্ত্বেও দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ১১১ রানে গুটিয়ে যায় পুরো দলটি। দক্ষিণ আফ্রিকার স্পিনার সাইমন হারমার মাত্র ১৬ রানে ৬ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংক্রমকে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেন।
এই ধরনের ব্যর্থতা অবশ্য নতুন কিছু নয়। গত আগস্টে নিজেদের মাঠেই বাংলাদেশের কাছে ৯ উইকেটে হেরেছিল অস্ট্রেলিয়া। ডারউনের সেই ম্যাচে প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয়ের ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ। যদিও পরের টেস্টে ইনিংস ও ৫১ রানে জিতে সিরিজ ১-১ সমতায় শেষ করেছে অস্ট্রেলিয়া, তবে ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা যে পুরোপুরি কাটেনি তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাটিংয়ে ধারাবাহিকতার অভাব। স্টিভ স্মিথ, মার্নাস লাবুশেন ও ট্রাভিস হেডের মতো প্রতিষ্ঠিত ব্যাটার দলে থাকলেও নিয়মিত বড় জুটি গড়তে ব্যর্থ হচ্ছে দলটি। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের পর এই সমস্যার কথা স্বীকার করেছিলেন ট্রাভিস হেড নিজেও। তার মতে, “একজনের বড় ইনিংসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে অস্ট্রেলিয়া।” প্রয়োজনের সময়ে ব্যাটাররা সম্মিলিতভাবে অবদান রাখতে পারছেন না বলে মনে করেন তিনি।
তবে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে ম্যাট রেনশ ছিলেন ব্যতিক্রম। প্রথম টেস্টে ১৯০ রানের এক দুর্দান্ত ইনিংস খেলে দলের জয়ে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন তিনি। পুরো সিরিজে মোট ৩৬৯ রান করে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন রেনশ। দ্বিতীয় টেস্টে ট্রাভিস হেড ১২১ রানের ইনিংস খেললেও ব্যক্তিগত সাফল্য দলীয় ব্যর্থতাকে আটকাতে পারেনি। এছাড়া শেষ টেস্টে ঘাড়ের চোটে স্টিভ স্মিথের অনুপস্থিতিও ব্যাটিংয়ের সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
শুধু টেস্ট নয়, সীমিত ওভারের ক্রিকেটেও অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান এখন প্রশ্নবিদ্ধ। বছরের শুরুতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় ২০২১ সালের চ্যাম্পিয়নরা। জিম্বাবুয়ে ও শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে সুপার এইটে ওঠার সুযোগ হারায় মিচেল মার্শের নেতৃত্বাধীন দল। বিশ্বকাপের আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজেও তারা হোয়াইটওয়াশ হয়েছিল।
বিশ্বকাপে এই ব্যর্থতার পেছনে চোট এবং অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের অনুপস্থিতিও বড় প্রভাব ফেলেছে। প্যাট কামিন্স ও জশ হ্যাজলউডের চোট এবং আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে মিচেল স্টার্কের অবসরের ফলে বোলিং আক্রমণে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করতে পারেননি তরুণ বোলাররা।
ওয়ানডে ফরম্যাটেও স্বস্তিতে নেই অস্ট্রেলিয়া। সেপ্টেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তিন ম্যাচের সিরিজ ২-১ ব্যবধানে হেরেছে তারা। প্রথম দুটি ম্যাচেই রান তাড়া করতে নেমে ব্যর্থ হয় অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ। শেষ ম্যাচ জিতে হোয়াইটওয়াশ এড়ানো সম্ভব হলেও সিরিজ হার আটকাতে পারেনি দলটি। বর্তমানে আইসিসির ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ে তাদের অবস্থান পঞ্চম।
তবে এতসব ব্যর্থতার মাঝেও অস্ট্রেলিয়াকে এখনই পুরোপুরি শক্তিহীন দল বলা যাবে না। চলতি বছরের জানুয়ারিতেই ইংল্যান্ডকে ঘরের মাঠে ৪-১ ব্যবধানে হারিয়ে অ্যাশেজ ধরে রেখেছিল তারা। দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের প্রথম টেস্টেও বড় জয় পেয়েছে কামিন্সের দল।
এমনকি টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থান হারালেও অস্ট্রেলিয়া এখনো দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। টি-টোয়েন্টি র্যাঙ্কিংয়ে তাদের অবস্থান তৃতীয়। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের চলতি চক্রেও ১৩টি ম্যাচের ৯টিতে জিতে তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছে অস্ট্রেলিয়া, যাদের পয়েন্টের শতাংশ ৬৯ দশমিক ২৩। অর্থাৎ সাম্প্রতিক ব্যর্থতার পরও শীর্ষ দলগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সামর্থ্য তারা হারায়নি।
তবে চিন্তার বিষয় অন্য জায়গায়। গত পাঁচ টেস্টের তিনটিতেই হেরেছে অস্ট্রেলিয়া। অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের ওপর দীর্ঘদিনের অতি-নির্ভরতা, ব্যাটিংয়ে বড় জুটির অভাব এবং নতুনদের স্থায়ী জায়গা করে নেওয়ার অনিশ্চয়তা তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে কঠিন করে তুলেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে সিরিজ হারার পর অধিনায়ক প্যাট কামিন্সও পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করেছেন। তার মতে, বিশ্বের এক নম্বর দল হতে হলে অস্ট্রেলিয়াকে আরও উন্নতি করতে হবে। প্রয়োজনে খেলার ধরন কিংবা কয়েকটি জায়গায় খেলোয়াড় পরিবর্তনের বিষয়েও ভাবতে হবে।
সামনে সেই পরিবর্তনের কার্যকারিতা যাচাইয়ের বড় সুযোগ রয়েছে। নভেম্বরে ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিনটি ওয়ানডে ও পাঁচটি টি-টোয়েন্টি খেলবে অস্ট্রেলিয়া। এরপর ডিসেম্বরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চার টেস্টের সিরিজ। আগামী বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ভারতের মাটিতে পাঁচ ম্যাচের বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফিও রয়েছে। বিশেষ করে ভারতের স্পিন সহায়ক কন্ডিশনে ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
অস্ট্রেলিয়ার পুরুষ ক্রিকেট এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে অতীতের সাফল্য আর ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। শক্তিশালী বোলিং আক্রমণ, অভিজ্ঞ নেতৃত্ব এবং প্রতিভাবান খেলোয়াড় এখনো তাদের বড় শক্তি। কিন্তু ব্যাটিংয়ের অস্থিরতা ও বড় প্রতিযোগিতায় সাম্প্রতিক ব্যর্থতা একটি সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের জাহাজ এখনো ডুবে যায়নি। তবে সেটিকে আগের গতিতে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সময়োপযোগী পরিবর্তন। আগামী কয়েকটি বড় সিরিজেই বোঝা যাবে, এটি কেবল সাময়িক ছন্দপতন, নাকি সত্যিই বিশ্ব ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘ আধিপত্য নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।