মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ৮ উইকেটের বড় পরাজয় বাংলাদেশকে কেবল সিরিজেই পিছিয়ে দেয়নি, বরং বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের (ডব্লিউটিসি) পয়েন্ট তালিকায় তাদের অবস্থানকেও নিচে নামিয়ে দিয়েছে। ২০২৫-২৭ চক্রের বর্তমান standings-এ চতুর্থ স্থান থেকে পঞ্চম স্থানে নেমে গেছে টাইগাররা। এই হারের ফলে কমেছে তাদের পয়েন্টের শতাংশও (পিসিটি)। যদিও ফাইনালে খেলার গাণিতিক আশা এখনো টিকে আছে, তবে আগামী পাঁচ টেস্টে বড় ধরনের সাফল্যের পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর ফলাফলও বাংলাদেশের অনুকূলে যেতে হবে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সিরিজের প্রথম টেস্টের চতুর্থ দিনেই বাংলাদেশের বিপক্ষে জয় নিশ্চিত করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। স্বাগতিকদের দেওয়া ১৭০ রানের লক্ষ্য মাত্র ৩৫ দশমিক ১ ওভারে ২ উইকেট হারিয়ে অনায়াসেই পেরিয়ে যায় ক্যারিবীয়রা। এই জয়ের ফলে দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেছে রোস্টন চেজের নেতৃত্বাধীন দল।
এই পরাজয়ের আগে ডব্লিউটিসির চলতি চক্রে ছয় ম্যাচে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ৪০ পয়েন্ট। তিন জয়, দুই হার ও একটি ড্রয়ের ফলে পয়েন্টের শতাংশ ছিল ৫৫ দশমিক ৫৬। সেই হিসাব অনুযায়ী চতুর্থ স্থানে অবস্থান করছিল নাজমুল হোসেন শান্তর দল।
তবে মিরপুরের এই হারের পর সাত ম্যাচেও বাংলাদেশের মোট পয়েন্ট অপরিবর্তিত থেকে ৪০-এই রয়ে গেছে। কিন্তু ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পয়েন্টের শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪৭ দশমিক ৬২। এর ফলে এক ধাপ নিচে নেমে পঞ্চম স্থানে চলে গেছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে, ৫১ দশমিক ৫২ শতাংশ পয়েন্ট নিয়ে চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে ভারত।
বর্তমানে ডব্লিউটিসির পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে নিউজিল্যান্ড। ছয় ম্যাচে চার জয় ও একটি ড্রয়ে তাদের পয়েন্টের শতাংশ ৭২ দশমিক ২২। সাত ম্যাচে পাঁচ জয় নিয়ে ৭১ দশমিক ৪৩ শতাংশ পয়েন্টসহ দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। আর ১৩ ম্যাচে ৯ জয় নিয়ে ৬৯ দশমিক ২৩ শতাংশ পয়েন্টসহ তৃতীয় স্থানে আছে অস্ট্রেলিয়া।
বাংলাদেশের পেছনে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে ইংল্যান্ড (৩৮.৫৪ শতাংশ)। এরপর যথাক্রমে শ্রীলঙ্কা (৩৩.৩৩), ওয়েস্ট ইন্ডিজ (২৬.৯২) ও পাকিস্তান (৪.৬৩)। মিরপুরের এই জয়ের ফলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের পয়েন্টের শতাংশ ২০ দশমিক ৮৩ থেকে বেড়ে ২৬ দশমিক ৯২ হয়েছে। তবে তারা তালিকার অষ্টম স্থানেই রয়ে গেছে। চলতি চক্রে ১৩ ম্যাচে তিন জয় ও দুই ড্রয়ে ৪৪ পয়েন্ট অর্জন করলেও মন্থর ওভার রেটের কারণে ২ পয়েন্ট কর্তন হওয়ায় তাদের চূড়ান্ত সংগ্রহ ৪২।
ফাইনালে উঠতে কী করতে হবে বাংলাদেশকে?
ডব্লিউটিসির নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি টেস্ট জয়ে ১২, ড্রয়ে ৪ এবং টাই হলে ৬ পয়েন্ট পাওয়া যায়। তবে কেবল মোট পয়েন্টের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং অর্জিত পয়েন্টের শতাংশের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় দলগুলোর অবস্থান। চক্র শেষে শীর্ষ দুই দল ২০২৭ সালের ফাইনালে খেলার সুযোগ পাবে।
বাংলাদেশের সামনে এখনো পাঁচটি টেস্ট ম্যাচ বাকি রয়েছে। আগামী ৫ নভেম্বর সিলেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট খেলবে টাইগাররা। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে দুটি এবং আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আরও দুটি টেস্ট ম্যাচ নির্ধারিত রয়েছে।
বাকি পাঁচ ম্যাচের সবগুলোই জিততে পারলে বাংলাদেশের মোট সংগ্রহ দাঁড়াবে ১০০ পয়েন্টে। মোট ১২ ম্যাচে সম্ভাব্য ১৪৪ পয়েন্টের মধ্যে ১০০ পয়েন্ট পেলে পয়েন্টের শতাংশ হবে ৬৯ দশমিক ৪৪। অর্থাৎ সব ম্যাচ জিতলে প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছানোর সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের।
তবে সব ম্যাচ জিতলেও ফাইনাল নিশ্চিত হবে না। কারণ নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান পয়েন্টের শতাংশ ইতিমধ্যেই ৬৯-এর ওপরে। এছাড়া ভারতেরও সাতটি টেস্ট বাকি রয়েছে। ফলে বাংলাদেশকে নিজেদের ম্যাচ জেতার পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর ফলাফলের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে।
পাঁচ ম্যাচের চারটিতে জয় ও একটিতে ড্র করলে বাংলাদেশের পয়েন্টের শতাংশ হবে ৬৩ দশমিক ৮৯। চার জয় ও এক হারে তা দাঁড়াবে ৬১ দশমিক ১১। আর তিন জয় ও দুই ড্রয়ে শতাংশ হবে ৫৮ দশমিক ৩৩। এসব ক্ষেত্রেও গাণিতিকভাবে ফাইনালে ওঠার সুযোগ থাকতে পারে, তবে সেক্ষেত্রে অন্য দলগুলোর ফল বাংলাদেশের পক্ষে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়বে।
আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সিলেট টেস্ট। সেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারাতে পারলে আট ম্যাচে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়াবে ৫২ পয়েন্টে এবং পয়েন্টের শতাংশ বেড়ে হবে ৫৪ দশমিক ১৭। কিন্তু ম্যাচটি ড্র হলে তা কমে দাঁড়াবে ৪৫ দশমিক ৮৩ এবং হারলে নেমে যাবে ৪১ দশমিক ৬৭ শতাংশে।
মিরপুরে বাংলাদেশ–ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম টেস্টের পর | ৩১ অক্টোবর ২০২৬
এবারের চক্রে বাংলাদেশের শুরুটা যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক ছিল। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজ হারলেও পরবর্তীতে পাকিস্তানকে ঘরের মাঠে ২-০ ব্যবধানে পরাজিত করে টাইগাররা। এরপর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট জয় পায় বাংলাদেশ। সেই সাফল্যই প্রথমবারের মতো ডব্লিউটিসির ফাইনালে খেলার আশা জাগিয়েছিল।
তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মিরপুরে ব্যাটিং ব্যর্থতায় বড় সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে শান্তদের। প্রথম ইনিংসে ২৭২ রান করার পর প্রতিপক্ষকে ২৪৫ রানে অলআউট করে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ১৪২ রানে গুটিয়ে যাওয়ায় সেই সুবিধা কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
এখন ফাইনালের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে সিলেটে ঘুরে দাঁড়ানোই বাংলাদেশের প্রথম লক্ষ্য। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার কঠিন সফর এবং ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাঠে ধারাবাহিক সাফল্য প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে তাকিয়ে থাকতে হবে পয়েন্ট তালিকার ওপরের সারির দলগুলোর ফলাফলের দিকেও।