প্রথম ইনিংসে সাদমান ইসলামের সেঞ্চুরিতে ভালো শুরুর পরও সুবিধা ধরে রাখতে পারেনি বাংলাদেশ। দুই ইনিংসেই ব্যাটিং বিপর্যয়ের মাশুল দিতে হলো স্বাগতিকদের। শেষদিকে নাঈম হাসানের লড়াকু অর্ধশতকে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ১৭০ রানের লক্ষ্য দেওয়া গেলেও সেটি আটকানোর মতো বোলিং করতে পারেননি বাংলাদেশের বোলাররা। ব্র্যান্ডন কিংয়ের অপরাজিত ৮১ রানের ইনিংসে মাত্র দুই উইকেট হারিয়েই জয় তুলে নিয়েছে সফরকারীরা। মিরপুরে আট উইকেটের এই জয়ে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে প্রথম টেস্টের চতুর্থ দিনে ১৭০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৩৫.১ ওভারে ২ উইকেটে ১৭০ রান তুলে জয় নিশ্চিত করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ১১৫ বলে ১০টি চার ও একটি ছক্কায় ৮১ রানে অপরাজিত থাকেন কিং। অন্য প্রান্তে ২৭ বলে চারটি চার ও একটি ছক্কায় ৩১ রান করেন কাভেম হজ।

জয়সূচক রানটিও আসে কিংয়ের ব্যাট থেকে। তাইজুল ইসলামের করা ৩৬তম ওভারের প্রথম বলেই চার মেরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয় নিশ্চিত করেন তিনি। এতে এক দিন বাকি থাকতেই শেষ হয় মিরপুর টেস্ট।

লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই ইতিবাচক ব্যাটিং করেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই ওপেনার ব্র্যান্ডন কিং ও জন ক্যাম্পবেল। মিরপুরের স্পিন সহায়ক উইকেটেও বাংলাদেশের বোলারদের ওপর চাপ তৈরি করেন তাঁরা। প্রথম ওভারেই মেহেদী হাসান মিরাজের বলে একাধিকবার এলবিডব্লিউর আবেদন থেকে বেঁচে যান ক্যাম্পবেল। বাংলাদেশের নেওয়া রিভিউতেও আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।

শুরুর সেই চাপ কাটিয়ে দ্রুত রান তুলতে থাকেন দুই ব্যাটার। একের পর এক বাউন্ডারিতে লক্ষ্য ক্রমেই ছোট করে আনেন তারা। কিং এক প্রান্ত আগলে রাখার পাশাপাশি সুযোগ বুঝে আক্রমণাত্মক শট খেলেছেন। অন্যদিকে ক্যাম্পবেলও রান তোলার গতি বাড়ান।

এর মধ্যে বৃষ্টি, বজ্রপাত ও আলোকস্বল্পতার কারণে কয়েক দফা খেলা বন্ধ হয়। তবে বিরতির পরও ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটারদের ছন্দ নষ্ট হয়নি। উদ্বোধনী জুটিতে শতাধিক রান তুলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই নিজেদের হাতে নিয়ে নেন কিং ও ক্যাম্পবেল।

বাংলাদেশের বোলাররা শেষ পর্যন্ত দুই উইকেট তুলে নিলেও ততক্ষণে জয়ের পথ অনেকটাই সহজ হয়ে যায় সফরকারীদের। ক্যাম্পবেল বিদায় নেওয়ার পর ত্যাগনারায়ণ চন্দরপলকে মাত্র ১ রানে ফেরান হাসান মাহমুদ। ২৬.৪ ওভারে ১২০ রানে দ্বিতীয় উইকেট হারায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

তবে এরপর আর কোনো সুযোগ দেয়নি সফরকারীরা। নতুন ব্যাটার কাভেম হজকে নিয়ে অবিচ্ছিন্ন ৫০ রানের জুটি গড়ে দলের জয় নিশ্চিত করেন কিং। বাংলাদেশের স্পিনাররা চেষ্টা চালিয়েও এই জুটি ভাঙতে পারেননি।

এর আগে চতুর্থ দিনের শুরুতে বাংলাদেশের আশা ছিল লিড দুইশর কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার। তৃতীয় দিন শেষে ৬ উইকেটে ৭৯ রান করা স্বাগতিকরা এগিয়ে ছিল ১০৬ রানে। কিন্তু দিনের প্রথম ওভারেই ফিরে যান জাকের আলী। জোমেল ওয়ারিক্যানের বলে স্লিপে ক্যাচ দেওয়ার আগে তাঁর ব্যাট থেকে আসে ২২ রান।

জাকেরের বিদায়ে বাংলাদেশের স্বীকৃত ব্যাটারদের সবাই সাজঘরে ফিরে যান। তবে এরপরও হাল ছাড়েননি নাঈম হাসান। নিচের সারির ব্যাটারদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রান যোগ করতে থাকেন এই অফস্পিনার।

হাসান মাহমুদ ও তাইজুল ইসলামের সঙ্গে ছোট দুটি জুটি গড়ে বাংলাদেশের লিড দেড়শর ওপরে নিয়ে যান নাঈম। ব্যক্তিগত ২১ ও ২৯ রানে জীবনও পান তিনি। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ৮৭ বলে পূর্ণ করেন টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম অর্ধশতক।

শেষ পর্যন্ত ৯১ বলে চারটি চারে ৫২ রান করে শেষ ব্যাটার হিসেবে আউট হন নাঈম। রোস্টন চেজকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে লং অনে ক্যাচ দেন তিনি। ৪৮.৪ ওভারে ১৪২ রানে থামে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস। অপরাজিত ৭ রান করেন শরিফুল ইসলাম।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক চেজ ৩৬ রানে ৫ উইকেট নেন। এটি তার টেস্ট ক্যারিয়ারের পঞ্চম পাঁচ উইকেট শিকার। প্রথম ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়া ওয়ারিক্যান দ্বিতীয় ইনিংসেও দুর্দান্ত বোলিং করেন। ৬৩ রান খরচায় তুলে নেন চার উইকেট।

ম্যাচের মোড় ঘুরে যায় মূলত তৃতীয় দিনেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে প্রথম ইনিংসে ২৪৫ রানে অলআউট করে ২৭ রানের লিড পেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সেই সুবিধা কাজে লাগাতে পারেননি ব্যাটাররা। দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতেই মাত্র ৫৩ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে বড় বিপদে পড়ে স্বাগতিকরা।

চেজের ঘূর্ণিতে একে একে ফিরে যান সাদমান ইসলাম, নাজমুল হোসেন শান্ত ও তাওহিদ হৃদয়। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করা সাদমান দ্বিতীয় ইনিংসে করেন মাত্র ১৩ রান। অধিনায়ক শান্তর ব্যাট থেকে আসে ১০ রান। রানের খাতাই খুলতে পারেননি হৃদয়। তানজিদ হাসান তামিমও ফেরেন শূন্য রানে। লিটন দাস করেন মাত্র ৪ রান।

এর আগে প্রথম ইনিংসেও বড় সংগ্রহের সুযোগ হাতছাড়া করে বাংলাদেশ। প্রথম দিন ৩ উইকেটে ২১৩ রান তুলে শক্ত অবস্থানে থাকলেও পরদিন মাত্র ৫৯ রান যোগ করতেই বাকি সাত উইকেট হারায় স্বাগতিকরা। ১০৫ রানের ইনিংস খেলা সাদমানের সেঞ্চুরিও তাই দলকে বড় সংগ্রহ এনে দিতে পারেনি।

বাংলাদেশের ২৭২ রানের জবাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম ইনিংসে করে ২৪৫ রান। সফরকারীদের হয়ে ত্যাগনারায়ণ চন্দরপল ৫৬, জন ক্যাম্পবেল ৫৪, জাস্টিন গ্রেভস ৪৬ ও অধিনায়ক চেজ অপরাজিত ৪৩ রান করেন। বাংলাদেশের হয়ে নাঈম হাসান নেন চার উইকেট। দুটি করে উইকেট পান মিরাজ ও তাইজুল।

প্রথম ইনিংসে এগিয়ে থেকেও দ্বিতীয় ইনিংসের ব্যর্থতায় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে বাংলাদেশ। নাঈমের অর্ধশতকে কিছুটা প্রতিরোধ গড়া গেলেও শেষ পর্যন্ত লড়াই জমাতে পারেনি স্বাগতিকরা। ব্যাটিং ব্যর্থতার পর বোলিংয়েও নিষ্প্রভ থেকে আট উইকেটে হারতে হলো শান্তর দলকে।

সিরিজ বাঁচাতে এখন দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ঘুরে দাঁড়াতে হবে বাংলাদেশকে। আগামী ৫ নভেম্বর সিলেটে শুরু হবে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচ।