ঘরের মাঠে বাংলাদেশকে পরাজিত করা যে সহজ কাজ নয়, তা খুব ভালো করেই জানেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রধান কোচ ড্যারেন স্যামি। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তার নজর এড়ায়নি। তাই আসন্ন দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজে স্বাগতিকদের এক কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবেই দেখছেন এই ক্যারিবীয় কোচ। তবে বাংলাদেশকে সমীহ করলেও জয়ের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামতে চান তিনি। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বর্তমান চক্রে নিজেদের শেষ সিরিজ থেকে সর্বোচ্চ সম্ভব ফল নিয়ে ফিরতে আগ্রহী স্যামি।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রধান কোচ। আগামী বুধবার এই মাঠেই শুরু হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যকার প্রথম টেস্ট ম্যাচ। সিরিজ শুরুর আগে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ফর্মের প্রশংসা করেন স্যামি। তবে নিজেদের প্রস্তুতি নিয়েও যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী ক্যারিবীয়দের সাবেক এই অধিনায়ক।
সংবাদ সম্মেলনে স্যামি বলেন, ‘আমরা জানি, বাংলাদেশ সম্প্রতি বেশ ভালো ক্রিকেট খেলেছে। তবে আমরাও এ বছর ভালো ক্রিকেট খেলেছি। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের এই চক্র শুরুর সময় আমরা বাস্তবসম্মত কিছু লক্ষ্য ঠিক করেছিলাম। সামনের দুই ম্যাচে ভালো করে চক্রটি সুন্দরভাবে শেষ করার সুযোগ রয়েছে। প্রতিপক্ষকে সম্মান জানিয়েই মাঠে নামব। আমাদের নিজেদের পরিকল্পনা থাকবে। আশা করি, মাঠে সেটির বাস্তবায়ন করতে পারব।’
বাংলাদেশের সঙ্গে ড্যারেন স্যামির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। খেলোয়াড়ি জীবনে তিনি একাধিকবার এই দেশে খেলার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের ভালোবাসার স্মৃতিও তার মনে গেঁথে আছে। সেই প্রসঙ্গ টেনে ক্যারিবীয় কোচ বলেন, ‘বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেটিকে সবাই ভালোবাসে। শুধু আমি নই, আমাদের দলের অনেকের কাছেই বাংলাদেশ দ্বিতীয় পছন্দের দল। আমার ক্যারিয়ারের সেরা কিছু টি-টোয়েন্টি ম্যাচ এখানে খেলেছি। বাংলাদেশের বিপক্ষে দারুণ কিছু সিরিজও খেলেছি।’
তবে পুরোনো স্মৃতি কিংবা বাংলাদেশের প্রতি ব্যক্তিগত অনুরাগ মাঠের লড়াইয়ে কোনো ছাড় দেবে না। স্যামির বিশ্বাস, দুই দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের কথা মাথায় রাখলে এই সিরিজটি অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘দুই দল যেভাবে খেলছে, তাতে ভালো লড়াই হবে বলে আশা করছি। যারা ম্যাচের মোমেন্টাম নিজেদের দিকে রাখতে পারবে, তারাই জিতবে। আমরাও সেটিই করতে চাই।’
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকায় বর্তমানে চতুর্থ স্থানে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। গত আগস্টে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের পর দুই ম্যাচের সিরিজ ১-১ ব্যবধানে ড্র করেছিল টাইগাররা। অন্যদিকে, অষ্টম স্থানে রয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এবারের চক্রে নিজেদের অবস্থান আরও উন্নত করতে চান স্যামি। তার লক্ষ্য হলো সেরা পাঁচে থেকে এই প্রতিযোগিতা শেষ করা। সেই লক্ষ্য অর্জনে খেলোয়াড়দের জন্য বাড়তি প্রণোদনার কথা ঘোষণা করেছেন তিনি।
স্যামি বলেন, ‘আমি ছেলেদের বলেছি, টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে এবার সেরা পাঁচে থাকতে পারলে বাড়তি প্রণোদনা থাকবে। আইসিসি এখানে অনেক অর্থ বিনিয়োগ করেছে। আমরা আট থেকে পাঁচে উঠতে পারলে সেটি ভালো অর্জন হবে। ড্রেসিংরুমেও এসব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। খেলোয়াড়দের বলেছি, মাঠে নিজেদের সামর্থ্য দেখাও।’
চলতি বছরে এখন পর্যন্ত কোনো টেস্ট সিরিজ হারেনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে সিরিজ জয়ের পর পাকিস্তানের সঙ্গে ১-১ ব্যবধানে ড্র করেছে তারা। সেই ধারাবাহিকতা বাংলাদেশেও বজায় রাখতে চান স্যামি।
তিনি বলেন, ‘এ বছর লাল বলের ক্রিকেটে আমরা যেভাবে খেলেছি, এখনো কোনো সিরিজ হারিনি। অনেক দিন পর এমন একটি বছর কাটানোর সুযোগ এসেছে। এবারের চক্রে এটি আমাদের শেষ সিরিজ। ছেলেদের বলেছি, সামনে টেস্ট ক্রিকেটের ১০টি দিন আছে। নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দিতে হবে।’
সিরিজের আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন ক্রিকেটারের অনুপস্থিতি। বিশ্রামে থাকায় বাংলাদেশ সফরের দলে নেই শাই হোপ। অন্যদিকে, চোটের ঝুঁকি এড়াতে পেসার আলজারি জোসেফকেও রাখা হয়নি। তবে নির্দিষ্ট একজনের ওপর নির্ভর করতে রাজি নন ক্যারিবীয় কোচ। তার বিশ্বাস, জাস্টিন গ্রিভস, আমির জাঙ্গু, জন ক্যাম্পবেল, ব্র্যান্ডন কিং ও জোমেল ওয়ারিক্যানের মতো ক্রিকেটাররা এই দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
স্যামি বলেন, ‘শাই হোপ কী করতে পারে, আমরা জানি। সব সংস্করণেই সে দারুণ ছন্দে আছে। কিন্তু আমাদের দলে আরও ভালো ক্রিকেটার আছে। আমরা একজনের ওপর নির্ভর করছি না। চাই, কেউ না কেউ দায়িত্ব নিয়ে মাঠে পারফর্ম করে দেখাক।’
পেসার শামার জোসেফের খেলা নিয়েও কথা বলেছেন স্যামি। এই তরুণ পেসারকে একাদশে অন্তর্ভুক্ত করতে আগ্রহী হলেও তার শারীরিক অবস্থার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন কোচ।
স্যামি বলেন, ‘নেটে শামার খুব ভালো প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে যদি খেলার জন্য প্রস্তুত থাকে, তাহলে ১১০ শতাংশ তাকে দলে নিতে চাইব। সব রিপোর্ট দেখেই তাকে ১৫ সদস্যের দলে রাখা হয়েছে।’
বাংলাদেশ সফরের আগে ভারতের চেন্নাইয়ে প্রস্তুতি কার্যক্রম চালিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটাররা। সেখানে পাওয়া সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্যামি। তার মতে, এখন সেই প্রস্তুতির প্রতিফলন মাঠের লড়াইয়ে দেখানোর সময় এসেছে।
ক্যারিবীয় কোচ বলেন, ‘প্রস্তুতি ভালোভাবে নিতে পারলে ভালো পারফর্ম করার সুযোগও বাড়ে। চেন্নাইয়ে আমরা দারুণ সুযোগ-সুবিধা পেয়েছি। ছেলেরা ভালোভাবেই প্রস্তুত আছে। এখন সেই প্রস্তুতিকে মাঠের পারফরম্যান্সে রূপ দিতে হবে।’
আলোচনার শেষ পর্যায়ে আবারও বাংলাদেশের প্রশংসা করেন ক্যারিবীয় কোচ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সাফল্যের পাশাপাশি বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
স্যামি বলেন, ‘বাংলাদেশকে তাদের মাটিতে টেস্টে হারানো খুবই কঠিন। তারা সেটি প্রমাণ করেছে। চলমান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপেও ভালো খেলেছে। আশা করি, দর্শকদের বিনোদন দিতে পারব। তবে সেই বিনোদনের শেষে যেন ওয়েস্ট ইন্ডিজই জয়ী দল হতে পারে।’
দুই ম্যাচের এই সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টটি আগামী ৫ নভেম্বর সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে।