চলতি বছরে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের জন্য অনেক রঙিন স্মৃতি জমা হয়েছে। ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে দুই টেস্টে জয় এবং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের পরাজিত করার মতো সাফল্য এসেছে। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আসন্ন সিরিজটি আগের সিরিজগুলোর চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। পূর্বের জয়গুলো বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলার যে স্বপ্ন তৈরি করেছিল, তা এখন আর কেবল কল্পনা নয়, বরং বাস্তব সম্ভাবনা হিসেবে সামনে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু এই স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এক কঠিন সমীকরণ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আসন্ন দুই টেস্টের সিরিজে জয়লাভ করা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। তবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সিরিজের আগে মাঠের লড়াইয়ের চেয়ে মাঠের বাইরের ঘটনাপ্রবাহই যেন এখন বেশি আলোচিত হয়ে উঠেছে।
সিরিজ শুরুর মাত্র তিন দিন আগে মোহাম্মদ আশরাফুলকে জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া গতকাল বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল ক্রিকেটার এবং কোচিং স্টাফদের সঙ্গে এক দীর্ঘ বৈঠক করেছেন। পাশাপাশি নির্বাচক কমিটিতে পরিবর্তনের গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিরিজের প্রাক্কালে বাংলাদেশ দলের চারপাশে এক ধরণের অস্থিরতা বিরাজ করছে।
আজ মিরপুরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান কোচ ফিল সিমন্সের কাছে এই বিশৃঙ্খলার প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। সরাসরি উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দেন এই ক্যারিবীয় কোচ। তিনি বলেন, “আপনি আমার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে আছেন। আমার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে বিশ্ব ক্রিকেট দেখছেন। কোনো ম্যাচের আগে কি এই প্রথম এমন বিশৃঙ্খলা দেখছেন?”
সিমন্সের এই প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত সবারই জানা। বাংলাদেশ ক্রিকেটে বিতর্ক এবং বিশৃঙ্খলা কোনো নতুন বিষয় নয়। তবে বর্তমান সময়টি ভিন্ন, কারণ টেস্ট দল যখন ছন্দে আছে এবং বড় স্বপ্ন যখন হাতছানি দিচ্ছে, ঠিক তখনই এই অস্থিরতা তৈরি হলো। সিমন্সের কথা বলার ধরন থেকেই বোঝা যায়, বর্তমান পরিস্থিতি তাঁর কাছে মোটেও স্বস্তির নয়।
তবে যা হয়ে গেছে, তা নিয়ে পড়ে থাকতে রাজি নন বাংলাদেশ কোচ। তাঁর সম্পূর্ণ মনোযোগ এখন মাঠের ক্রিকেটের দিকে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আসল বিষয় হলো, আমরা কীভাবে নিজেদের কাজটা করি, সিরিজের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিই। আমার মনে হয়, গত তিন-চার দিনে এখানে যে দলটি ছিল, তারা দারুণ কাজ করেছে। তারা নিজেদের কাজ করেছে। এখন পুরো দল একসঙ্গে হচ্ছে। আগামী দুই দিনে আমরা কী করি, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। বাইরে কী ঘটছে, সেটা নয়; দল হিসেবে প্রস্তুতির জন্য আমরা কী করছি, সেটাই আসল।”
মাঠের বাইরের অস্থিরতার পাশাপাশি প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে বাংলাদেশ। প্রায় এক সপ্তাহ আগে বাংলাদেশে পৌঁছে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল। অন্যদিকে, ত্রিদেশীয় সিরিজের ব্যস্ততা শেষ করে বাংলাদেশ দলের সদস্যরা একসঙ্গে অনুশীলনের সুযোগ পেয়েছেন মাত্র দুই থেকে তিন দিন। যদিও সিমন্স এটিকে বড় কোনো সমস্যা হিসেবে দেখছেন না। যতটুকু প্রস্তুতি হয়েছে, তাতেই তিনি সন্তুষ্ট। তিনি জানান, “আমি খুশি। কারণ, এখানে যে খেলোয়াড়েরা ছিল, তারা নিজেদের করণীয় কাজগুলো করেছে। এখন আমাদের হাতে দুই দিন সময় আছে। এই সময়ে সাদা বলের ক্রিকেট খেলে আসা খেলোয়াড়েরা দলের সঙ্গে যোগ দেবে, সবাই একসঙ্গে মিলে প্রস্তুতি নেব। এই দুই দিনেই আমরা সবকিছু গুছিয়ে নেব।”
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের সমীকরণে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের সামনে এখন ছয়টি ম্যাচ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুটি টেস্টের পর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে আরও দুটি ম্যাচ রয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুই টেস্টের মাধ্যমে শেষ হবে এই চক্রের অভিযান। ফাইনালে খেলার সুযোগ পেতে হলে এই ছয়টি টেস্টের মধ্যে অন্তত চারটিতে জয়লাভ করতে হবে বাংলাদেশকে।
কাজটি কঠিন হলেও অসম্ভব মনে করছেন না সিমন্স। তাঁর বিশ্বাস, ফাইনালে খেলার স্বপ্ন এখন দলের প্রত্যেকের মনে গেঁথে আছে। তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, সবাই টেস্ট ম্যাচ নিয়েই খুব মনোযোগী। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ফাইনালে খেলার লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষা সবার মধ্যে আছে। এবারই প্রথম আমাদের সেখানে খেলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই আমার মনে হয়, টেস্ট ম্যাচগুলোর জন্য সবাই পুরোপুরি প্রস্তুত থাকবে।”