চাঁদের বুকে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের মাধ্যমে সেখানে স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণ এবং খনিজ উত্তোলনের ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের পাশাপাশি তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করছেন বিজ্ঞানীরা।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বসানোর এক তীব্র প্রতিযোগিতায় নেমেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ঘোষণা করেছে যে, ২০৩০ সালের মধ্যে তারা চাঁদে একটি পারমাণবিক চুল্লি তৈরি করবে। অন্যদিকে, রাশিয়া ও চীন যৌথভাবে ২০৩৬ সালের মধ্যে এই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করছে। মূলত মহাকাশ অনুসন্ধান ও গবেষণাকে আরও সামনে এগিয়ে নেওয়াই তাদের এই প্রচেষ্টার মূল উদ্দেশ্য।
তবে এই ঘোষণাগুলোর পর মহাকাশে অস্ত্রের ব্যবহার এবং জিপিএস, যোগাযোগ ও গোয়েন্দা উপগ্রহগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, এ ধরনের প্রকল্পে তেজস্ক্রিয় দুর্ঘটনার প্রবল ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে, কোনো চুল্লি চালু থাকা অবস্থায় যদি পৃথিবীতে ফিরে আসে, তবে তা এক বিশাল বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
চাঁদের গর্তে জমে থাকা বরফ উত্তোলনের জন্য এই চুল্লিগুলোর উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হবে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই বরফ থেকে পানীয় জল, শ্বাস নেওয়ার বাতাস এবং রকেটের জ্বালানি তৈরি করা সম্ভব হবে।
প্রকৃতপক্ষে, পরাশক্তিগুলোর মধ্যে চলমান সামরিক প্রতিযোগিতা এই মহাকাশ দৌড়কে আরও তীব্র করে তুলেছে। গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল যে, তারা কক্ষপথে অস্ত্র মোতায়েন করেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এসব অস্ত্র মার্কিন বাহিনীকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হবে। যদিও এই অস্ত্রগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়নি, তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এগুলো উপগ্রহ ধ্বংস করার অস্ত্র নয়, বরং যোগাযোগ ব্যবস্থায় বাধা সৃষ্টিকারী বিশেষ যন্ত্র হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নাসার ‘লুনার রিঅ্যাক্টর ১’ থেকে ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কোনো রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই টানা পাঁচ বছর সচল থাকতে পারবে। চুল্লিটি আকারে ছোট হবে এবং এর ওজন হবে ৬ হাজার কেজির কম। এটি এমন একটি রকেটের ভেতরে স্থাপন করা যাবে যার দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৭ মিটার এবং প্রস্থ ৫ দশমিক ৫ মিটার।
অন্যদিকে, রাশিয়া তাদের ‘সেলেনা’ নামক একটি পারমাণবিক চুল্লি তৈরি করছে। এটি ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এবং রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই ১০ বছর চলবে। সংশ্লিষ্টদের আশা, ২০৩৬ সালের দিকে চীনের নেতৃত্বাধীন চাঁদের ঘাঁটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য এটি প্রস্তুত হবে। সেলেনার ওজন হবে প্রায় ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ কেজি, যার ফলে চাঁদের পৃষ্ঠে এটি তুলনামূলক সহজে ও নিরাপদে অবতরণ করানো সম্ভব হবে।
মহাকাশে পারমাণবিক চুল্লি পাঠানোর ঘটনাটি সম্পূর্ণ নতুন নয়। গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষভাগ থেকে আশির দশক পর্যন্ত তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর কক্ষপথে ৩০টির বেশি পারমাণবিক চুল্লি পাঠিয়েছিল। স্নায়ুযুদ্ধের সময় গোয়েন্দা উপগ্রহগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য এগুলো ব্যবহৃত হতো। প্রায় ১ হাজার কেজি ওজনের এই চুল্লিগুলো ইউরেনিয়াম পরমাণু বিভাজনের মাধ্যমে তাপ তৈরি করত এবং সেই তাপ থেকে ৩ থেকে ৫ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হতো। বর্তমানে এই চুল্লিগুলো আর সচল নেই এবং এরপর অন্য কোনো দেশ মহাকাশে পারমাণবিক চুল্লি পাঠায়নি।
চাঁদে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য কেবল সৌরশক্তি যথেষ্ট নয়। এছাড়া ব্যাটারি ও ডিজেল পৃথিবী থেকে পাঠানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাই পারমাণবিক শক্তিকেই সবচেয়ে যৌক্তিক সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ৭০ বছরে যুক্তরাষ্ট্র মহাকাশে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের উন্নত কর্মসূচিতে ২ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করেছে। তবে ১৯৬৫ সালের একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প ছাড়া দেশটি সফলভাবে মহাকাশে পারমাণবিক চুল্লি পাঠাতে পারেনি। ওই পরীক্ষায় উপগ্রহে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করা হলেও, একটি অ-পারমাণবিক বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ৪৩ দিন পর চুল্লিটি বন্ধ হয়ে যায়। সেটি এখনো মহাকাশে ভাসছে। বাজেটের অগ্রাধিকার পরিবর্তনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আগের বেশ কিছু মহাকাশ পারমাণবিক প্রকল্প মাঝপথে থেমে গিয়েছিল।
প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে পৃথিবীতে চুল্লি তৈরি করা হবে এবং এরপর একটি রোবটচালিত মহাকাশযানে করে তা চাঁদে পাঠানো হবে। মহাকাশযানটি রকেট ইঞ্জিনের সাহায্যে ধীরে ধীরে চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ করবে। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয় পক্ষই জানিয়েছে, চাঁদে পৌঁছানোর আগে চুল্লিগুলো বন্ধ থাকবে, যাতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেও তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি কম থাকে। স্থাপনের পর এগুলো বছরের পর বছর রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই চলবে এবং খনিজ উত্তোলন ও গবেষণায় নিয়োজিত ঘাঁটিগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া মূলত চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে ঘাঁটি নির্মাণ করতে আগ্রহী, কারণ সেখানে বরফের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই বরফ এমন কিছু গর্তে অবস্থান করছে যেখানে লাখ লাখ বছর ধরে সূর্যের আলো পৌঁছায়নি। বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি বরফ উত্তোলনেও এই চুল্লিগুলো কার্যকর হবে। বরফ থেকে প্রাপ্ত পানি চাঁদে বসবাস ও গবেষণায় ব্যবহৃত হবে। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক চাঁদ থেকে অ্যালুমিনিয়াম, টাইটানিয়াম ও সিলিকনের মতো খনিজ উত্তোলনের কথা বলেছেন, যা দিয়ে উপগ্রহ তৈরি করা সম্ভব। সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে এই ঘাঁটিগুলো চালানো কঠিন, কারণ চাঁদের অনেক স্থানে সূর্যের আলো থাকে মাত্র অর্ধেক সময়, ফলে মাসে প্রায় দুই সপ্তাহ বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ থাকে।
যুক্তরাজ্যের ব্যাঙ্গোর ইউনিভার্সিটির নিউক্লিয়ার ফিউচারস ইনস্টিটিউটের পরিচালক সাইমন মিডলবার্গ আল-জাজিরাকে বলেন, “চাঁদের ঘাঁটিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সৌরশক্তি যথেষ্ট নয়। ব্যাটারি ও ডিজেলও ব্যয়বহুল। কারণ, সবকিছু পৃথিবী থেকে পাঠাতে হবে।” তাঁর মতে, পারমাণবিক শক্তিই সবচেয়ে যৌক্তিক সমাধান, তবে তা দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হবে। মিডলবার্গ আরও বলেন, “চাঁদের বরফ উত্তোলন ও ঘাঁটি পরিচালনার জন্য তিন বা চারটি চুল্লি একসঙ্গে চালানোর প্রয়োজন হতে পারে।”
এই প্রতিযোগিতার মূলে রয়েছে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি পাঠানোর নির্দেশ দেন। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও একই ধরনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। চলতি বছরের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহনমন্ত্রী শন ডাফি বলেন, “আমরা চাঁদে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় আছি, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আছি।”
সাইমন মিডলবার্গের মতে, ২০৩০ সালের লক্ষ্যটি সম্ভবত চুল্লি তৈরির সময়সীমা। তবে চাঁদে এটি অবতরণ ও নিরাপদে স্থাপন করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, “সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পারমাণবিক প্রযুক্তি নয়। বরং উৎক্ষেপণের অনুমোদন, উৎক্ষেপণযানের প্রাপ্যতা এবং চাঁদের পৃষ্ঠে নিরাপদে অবতরণ ও ব্যবস্থা স্থাপন।”
মিডলবার্গের মতে, উৎক্ষেপণের সময় দুর্ঘটনা ঘটলে ঝুঁকি কম থাকে কারণ ইউরেনিয়াম তখন খুব বেশি তেজস্ক্রিয় হয় না। তবে চুল্লি চালু হওয়ার পর ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, চালু অবস্থায় কোনো চুল্লি পৃথিবীতে ফিরে এলে বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘কসমস ৯৫৪’ নামের একটি উপগ্রহ পৃথিবীতে ভেঙে পড়লে এর তেজস্ক্রিয় পদার্থ কানাডার উত্তরাঞ্চলের প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিল। তখন তেজস্ক্রিয় ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করতে ব্যয়বহুল সামরিক অভিযান চালাতে হয়। তবে মিডলবার্গের মতে, চাঁদে একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে দূষিত এলাকা খুব সীমিত থাকবে।
আইনগতভাবে চাঁদের মালিকানা কোনো নির্দিষ্ট দেশের নয়। ১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তি অনুযায়ী, কোনো দেশ চাঁদ বা এর কোনো অংশের মালিকানা দাবি করতে পারে না, তবে তারা নিজেদের পাঠানো যন্ত্রপাতির মালিক হতে পারে। এই চুক্তিতে মহাকাশে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। লুনার পলিসি প্ল্যাটফর্মের পরিচালক আন্তোনিনো সালমেরি আল-জাজিরাকে বলেন, “শান্তিপূর্ণ ব্যবহার ও ক্ষতিকর দূষণ এড়ানোর মতো চুক্তির নীতিগুলো মেনে চললে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বসানো আইনসম্মত হতে পারে।”
অ্যারিজোনার প্ল্যানেটারি সায়েন্স ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী নরবার্ট শর্গোফার জানান, শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে চাঁদের পৃষ্ঠে খনিজ উত্তোলনের অধিকার সব চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশের রয়েছে। তবে যে দেশ আগে উন্নত মানের বরফ খুঁজে পাবে, তারা সেখানে একটি ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ ঘোষণা করতে পারে। এটি সরাসরি ভূখণ্ডের মালিকানা দাবি না হলেও, তেজস্ক্রিয়তার আশঙ্কায় অন্য দেশগুলো ওই এলাকায় প্রবেশ করতে চাইবে না। আন্তোনিনো সালমেরির মতে, নিরাপত্তা অঞ্চল ঘোষণা করলে ভূখণ্ডগত অধিকার তৈরি হয় না, কিন্তু পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করলে কার্যত অন্যদের প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
লুনার পলিসি প্ল্যাটফর্মের গত মাসের এক প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, চাঁদে দীর্ঘমেয়াদি বিপজ্জনক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটলে দায় কার হবে? প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বর্তমান আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার নিয়মগুলো পর্যাপ্ত নয়।