মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং বিধ্বংসী সব বিস্ফোরণ পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ‘নিল গেহরেলস সুইফট অবজারভেটরি’। দীর্ঘ প্রায় ২২ বছর একটানা সেবার পর মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এই ঐতিহাসিক মহাকাশ অভিযানের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির ঘোষণা দিয়েছে। মূলত দুই বছরের জন্য এই অভিযানটি শুরু করা হলেও প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে সফলভাবে কাজ করে গেছে এই মহাকাশযানটি। যদিও কক্ষপথ নিম্নমুখী হওয়ার কারণে বায়ুমণ্ডলের ঘর্ষণে এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে, তবে এর সংগ্রহ করা তথ্যের বিশাল ভাণ্ডার আগামী কয়েক দশক ধরে নতুন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০০৪ সালের নভেম্বরে এই টেলিস্কোপটি উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। গভীর মহাকাশে ঘটা ক্ষণস্থায়ী কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী গামা-রে বিস্ফোরণগুলো খুঁজে বের করাই ছিল এই টেলিস্কোপের প্রধান লক্ষ্য। সুইফটের বিশেষ দ্রুত প্রযুক্তির মাধ্যমে এটি দ্রুত ক্যামেরা ঘুরিয়ে সেই বিস্ফোরণগুলো ধারণ করতে পারত। একই সাথে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অন্যান্য টেলিস্কোপগুলোকে পরবর্তী পর্যবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় বার্তা পাঠিয়ে দিত এই যানটি।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে নাসা সদর দপ্তরের অ্যাস্ট্রোফিজিকস বিভাগের পরিচালক শন ডোম্যাগাল–গোল্ডম্যান বলেন, ‘দুই বছরের প্রাথমিক অভিযানের জন্য তৈরি হলেও সুইফট ১০ গুণের বেশি সময় কার্যকর থেকে দেশের জন্য অসাধারণ ও দীর্ঘস্থায়ী অবদান রেখেছে। এই দীর্ঘ সময়ে সুইফট আমাদের পরিবর্তনশীল মহাবিশ্ব বোঝার অগ্রগতিতে একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। সুইফট আমাদের বহু তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পর্যবেক্ষণের একটি অসাধারণ আর্কাইভ তৈরি করে দিয়েছে। কর্মজীবনে টেলিস্কোপটি দুই হাজারের বেশি গামা–রে বিস্ফোরণ রেকর্ড করেছে। প্রায় ১ হাজারটি ৪০০টির বেশি সুপারনোভা পর্যবেক্ষণ করেছে।’
সাম্প্রতিক সময়ে বায়ুমণ্ডলের টান বা ড্র্যাগের কারণে স্যাটেলাইটটিকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে স্থির রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। চলতি বছরের শুরুর দিকে কক্ষপথের উচ্চতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হলেও তা ব্যর্থ হয়, যার ফলে মহাকাশযানটি দ্রুত নিচে নামতে শুরু করে। অক্টোবরের শেষ দিকে যখন উচ্চতা ১৭১ মাইলের নিচে নেমে আসে, তখন বায়ুমণ্ডলের প্রবল ঘর্ষণ প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতির চাপে পড়ে টেলিস্কোপটি সেফ মোডে চলে যায় এবং পরবর্তীতে গ্রাউন্ড অপারেটররা এটিকে চূড়ান্তভাবে বন্ধ করার নির্দেশ প্রদান করেন।
মেরিল্যান্ডের গ্রিনবেল্টে নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের মিশনের প্রধান গবেষক এস ব্র্যাডলি সেনকো জানান, সুইফটকে গামা–রে বিস্ফোরণ অধ্যয়নের জন্য নিবেদিত একটি স্যাটেলাইট হিসেবে ডিজাইন করা হয়েছিল। এই বিস্ফোরণগুলো এত দ্রুত আসত এবং চলে যেত যে বিশাল টেলিস্কোপ দিয়ে কোনোটি লক্ষ করা সম্ভব হতো না। সুইফট গামা–রে বিস্ফোরণ শনাক্ত করা, অবস্থান নির্ধারণ করা এবং অন্যান্য মানমন্দিরে সেই তথ্য পৌঁছানোর পর নিজের টেলিস্কোপ ঘুরিয়ে ছবি তুলতে পারত। বিস্ফোরণের আলো মিলিয়ে যাওয়ার আগেই তা করতে হতো। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে সুইফটের সময় লাগত প্রায় এক মিনিট। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সুইফট পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে নিরাপদে পুনঃপ্রবেশ করবে।