গত ৯ আগস্ট সন্ধ্যায় বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনে একটি জরুরি সতর্কবার্তা পৌঁছায়। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার পাঠানো ওই বার্তায় জানানো হয়, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ (বিএস-১)-এর দিকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছে ভারতের একটি পুরোনো স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ বা ডেব্রিস। মহাকাশে কোনো বস্তুর অতি নিকটবর্তী অবস্থান সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি করে, যার ফলে স্যাটেলাইটটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কিংবা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মহাকাশে সংঘর্ষের ভয়াবহতা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় ২০০৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার। সে সময় রাশিয়ার অকেজো স্যাটেলাইট কসমস-২২৫১ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সচল যোগাযোগ স্যাটেলাইট ইরিডিয়াম-৩৩ একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
এমন চরম ঝুঁকির মুখে বিএসসিএলের প্রকৌশলীদের হাতে সময় ছিল খুবই সীমিত। গাজীপুরে অবস্থিত গ্রাউন্ড স্টেশনে পরবর্তী চার দিন চরম উদ্বেগের মধ্য দিয়ে কাটে তাঁদের। রাজধানীর বাংলামোটরে বিএসসিএল কার্যালয়ে আজ বুধবার সকালে সেদিনের সেই টানটান উত্তেজনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ওই কয়েকটি দিন খুবই উদ্বেগের মধ্যে কেটেছে। হাতে সময় কম। আবার বিএস-১ কে সরানোর সুযোগও ছিল সীমিত। তবে শেষ পর্যন্ত বিপদ হয়নি। স্যাটেলাইটটি রক্ষা করা গেছে।”
মহাকাশে কেবল সচল স্যাটেলাইটই থাকে না, বরং বিভিন্ন সময়ে উৎক্ষেপণ করা স্যাটেলাইটের অকেজো অংশ কিংবা নিয়ন্ত্রণ হারানো মহাকাশযানের বিভিন্ন টুকরো পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরতে থাকে, যা 'স্পেস ডেব্রিস' বা মহাকাশের বর্জ্য হিসেবে পরিচিত। বিএসসিএল জানিয়েছে, নাসার স্পেস ট্র্যাকার সার্বক্ষণিক মহাকাশে নজর রাখে এবং কোনো স্যাটেলাইটের সঙ্গে বর্জ্যের সংঘর্ষের সম্ভাবনা দেখা দিলে তারা সতর্ক করে। নাসার তথ্যানুযায়ী, বিএস-১-এর দিকে ছুটে আসা ধ্বংসাবশেষটি ছিল ভারতের ইনস্যাট-১এ নামের একটি স্যাটেলাইটের অংশ। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (আইএসআরও) তথ্যমতে, ইনস্যাট-১এ ১৯৮২ সালের ১০ এপ্রিল উৎক্ষেপণ করা হলেও কয়েক মাস পরেই সমস্যা দেখা দেয় এবং ১৯৮২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর এটি নিষ্ক্রিয় করা হয়।
বিএসসিএলের তথ্য অনুযায়ী, এটিই প্রথমবার নয় যে বিএস-১ এমন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর আগে ২০২১ এবং ২০২৫ সালেও দুবার অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে। ২০২১ সালে রাশিয়ার একটি স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষের কারণে ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল এবং ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্যাটেলাইট বিএস-১-এর খুব কাছাকাছি চলে আসে।
২০১৮ সালের ১২ মে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয় এই স্যাটেলাইটটি, যা তখন 'বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১' নামে পরিচিত ছিল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এর নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ রাখা হয়। প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে নিজস্ব স্যাটেলাইটের মালিক হয়, যদিও বিপুল এই ব্যয় নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল।
ফ্রান্সের থালেস অ্যালেনিয়া স্পেস ২০১৮ সালে বিএস-১ তৈরি করে। শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়ার তিনটি গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে ফরাসি এই কোম্পানিটি যৌথভাবে এর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করত। তবে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, তিন বছর পর অর্থাৎ ২০২১ সাল থেকে এর দেখাশোনার পূর্ণ দায়িত্ব বুঝে নেয় বিএসসিএল। বর্তমানে গাজীপুরের জয়দেবপুরে অবস্থিত গ্রাউন্ড স্টেশনটিই এর মূল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। এখানে ৫০ জনের বেশি প্রকৌশলী ২৪ ঘণ্টা পালা করে তদারকি করেন।
বিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমাদুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “নাসার কাছ থেকে বার্তা পাওয়ার পরপরই কর্মীদের সতর্ক করা হয় এবং ছুটি বাতিল করা হয়। ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর টেলিযোগাযোগ উপদেষ্টা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছিলেন। স্পেস ট্র্যাকার থেকেও সময়ে সময়ে ধ্বংসাবশেষটির অবস্থান জানিয়ে বার্তা পাঠানো হচ্ছিল।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ধ্বংসাবশেষটি এড়িয়ে বিএস-১ কে সরানো হবে কি না, সরানো হলে কোন দিকে এবং কতটা সরানো যাবে—এসব বিষয় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিবেচনা করতে হয়েছিল। ইমাদুর রহমান বলেন, “স্যাটেলাইটটি নতুন কোনো অবস্থানে নিলে ঝুঁকি তৈরি হবে কি না, তা–ও হিসাব করতে হচ্ছিল।”
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৩ আগস্ট প্রকৌশলীরা বিএস-১ কে সামান্য বাঁ দিকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর ধ্বংসাবশেষটি সম্পূর্ণ অতিক্রম করা পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ সময় পার হওয়ার পর স্যাটেলাইটটিকে পুনরায় আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা হয়। সর্বশেষ জানা গেছে, ধ্বংসাবশেষটি বিএস-১-এর ৮৫২ মিটারের মধ্যে চলে এসেছিল। ইমাদুর রহমান বলেন, “পুরো প্রক্রিয়ায় বড় কোনো ক্ষতি হয়নি। এটি বিএসসিএলের প্রকৌশলীদের জন্য একটি সাফল্য।”
বিএস-১-এর মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার রয়েছে, যার মধ্যে ২০টি বাংলাদেশের জন্য এবং ২০টি আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য সংরক্ষিত। এই ট্রান্সপন্ডারগুলো বিদেশে ইজারা দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল এই স্যাটেলাইটের সেবা গ্রহণ করছে।
এই পুরো বিষয়টি নিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. খলিলুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “মহাকাশে কোনো বস্তু স্যাটেলাইটের খুব কাছাকাছি চলে এলে সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করে দুর্ঘটনা এড়ানো অবশ্যই একটি দক্ষতার বিষয়। দেশের প্রকৌশলীরা এতে সফল হলে নিঃসন্দেহে সেটা প্রশংসা পাওয়ার মতো ব্যাপার।”