মহাকাশে দ্রুতগতির একটি মহাকাশ বর্জ্যের সম্ভাব্য আঘাত থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ (বিএস-১)। গত ২৩ আগস্ট এই স্যাটেলাইটটির মাত্র ৮৫২ মিটারের মধ্যে চলে এসেছিল ওই বিপজ্জনক মহাকাশ বর্জ্যটি। তবে নাসার পক্ষ থেকে আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার পর গাজীপুরে অবস্থিত গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারদের দ্রুত ও দক্ষ পদক্ষেপের মাধ্যমে শেষ মুহূর্তে স্যাটেলাইটটির অবস্থান সামান্য পরিবর্তন করে বড় ধরনের সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান এই ঘটনার বিস্তারিত তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, “২৩ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে নাসা থেকে বিএসসিএলকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। এতে জানানো হয়, একটি দ্রুতগতির মহাকাশ বর্জ্য পরবর্তী ১২ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে বিএস-১-এর ৮৫২ মিটারের মধ্যে চলে আসতে পারে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই সংঘর্ষ ঘটলে স্যাটেলাইটটির বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা ছিল।

চুক্তি অনুযায়ী, নাসা প্রতি দুই ঘণ্টা অন্তর স্যাটেলাইটটির নিরাপত্তা পরিস্থিতির সর্বশেষ আপডেট বা হালনাগাদ তথ্য প্রদান করে থাকে। তবে ওই নির্দিষ্ট দিনের সর্বশেষ বার্তাটি ছিল অত্যন্ত জরুরি এবং সতর্কতামূলক।

ড. ইমাদুর রহমান জানান, ওই সংকটময় পরিস্থিতিতে বিএস-১-এর অবস্থান পরিবর্তন করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না। স্যাটেলাইটটিকে সামনে, পেছনে কিংবা ডানে সরানোর সুযোগ ছিল না। অন্যদিকে, বাঁ দিকে সরালে অন্য একটি সক্রিয় স্যাটেলাইটের খুব কাছাকাছি চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতো। ফলে অত্যন্ত সীমিত সময়ের মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটা ছিল বেশ কঠিন চ্যালেঞ্জের বিষয়।

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রকৌশলীরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে স্যাটেলাইটটিকে সামান্য বাঁ দিকে সরিয়ে নেন। মহাকাশ বর্জ্যটি নিরাপদে অতিক্রম করার পর বিএস-১-কে পুনরায় তার আগের নির্ধারিত অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

বিএস‌সিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, “ঘটনাটি উচ্চ প্রযুক্তির একটি স্পর্শকাতর ব্যবস্থা পরিচালনায় দেশের নিজস্ব প্রকৌশলীদের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে।”

বিএসসিএল থেকে জানানো হয়েছে, নাসার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী স্যাটেলাইটটির দিকে এগিয়ে আসা ওই মহাকাশ বর্জ্যটি ছিল ভারতের ইনস্যাট-১এ স্যাটেলাইটের একটি অংশ। ভারত ১৯৮২ সালের ১০ এপ্রিল এই স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ করেছিল। তবে যান্ত্রিক ত্রুটি এবং জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর স্যাটেলাইটটি অকার্যকর হয়ে যায় এবং আর্থ স্টেশনের সঙ্গে এর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ২০১৮ সালের মে মাসে প্রথমবারের মতো মহাকাশে নিজস্ব কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠায়। ১২ মে বাংলাদেশ সময় রাত ২টা ১৪ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে স্পেসএক্সের ফ্যালকন-৯ ব্লক ৫ রকেটের মাধ্যমে বিএস-১ উৎক্ষেপণ করা হয়।

ফ্রান্সের থালেস এলিনিয়া স্পেস নির্মিত এই স্যাটেলাইটটি ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে ভূস্থির কক্ষপথে অবস্থান করছে। এই স্যাটেলাইটটির নির্মাণ ও উৎক্ষেপণ প্রক্রিয়ায় ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। এর নির্ধারিত কার্যকাল ধরা হয়েছে প্রায় ১৫ থেকে ১৮ বছর।

বিএস-১ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের সেই সব দেশের তালিকায় যুক্ত হয়েছে যারা নিজস্ব কৃত্রিম উপগ্রহের অধিকারী। এর ফলে দেশের দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ সুবিধা সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে।