বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার নৌযানের অবস্থান শনাক্ত করা, সমুদ্রে চলাচল পর্যবেক্ষণ এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহে স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা গড়তে চায় সরকার। এই লক্ষ্য অর্জনে স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থার (এআইএস) একটি উন্নত সংস্করণ ব্যবহারের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল)।
সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, কম উচ্চতার চারটি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে এই নজরদারি কার্যক্রম পরিচালিত হবে। পুরো প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় হতে পারে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা।
উল্লেখ্য যে, ২০১৮ সালে বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল। তবে সেটি মূলত মহাকাশ থেকে সিগন্যাল আদান-প্রদান ও সম্প্রচারের কাজ করে। বিএসসিএলের প্রস্তাবিত এই সামুদ্রিক নজরদারি ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রযুক্তিগত উদ্দেশ্যে তৈরি করা হবে। বর্তমানে এই প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম বা এআইএস হলো মূলত নৌযানের পরিচয়, অবস্থান, গতি ও চলাচলের দিকসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের একটি ব্যবস্থা। প্রচলিত পদ্ধতিতে উপকূলীয় রেডিও অবকাঠামোর মাধ্যমে এই তথ্যগুলো গ্রহণ করা হয়। তবে স্যাটেলাইটভিত্তিক এআইএস ব্যবস্থায় উপগ্রহের মাধ্যমে সমুদ্রে থাকা নৌযানের সংকেত গ্রহণ করে অনেক দূরবর্তী অবস্থান থেকেও তার চলাচল সম্পর্কে নিখুঁত তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে। তবে এই ব্যবস্থার একটি সীমাবদ্ধতা হলো, কেবল যেসব নৌযানে উপযুক্ত যন্ত্র স্থাপন করা থাকবে এবং সংকেত গ্রহণ করা সম্ভব হবে, সেগুলোর তথ্যই পাওয়া যাবে।
২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধ নিষ্পত্তির পর বঙ্গোপসাগরে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকার অধিকার পায় বাংলাদেশ। সরকারের কর্মকর্তাদের দাবি, এই বিশাল সমুদ্র এলাকায় মৎস্য আহরণ, নৌযান চলাচল ও সামুদ্রিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহার তদারকির জন্য একটি কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা অত্যন্ত প্রয়োজন।
বিএসসিএলের নথিপত্রে দেখা গেছে, এই নজরদারির জন্য চারটি স্যাটেলাইট, দুটি গ্রাউন্ড স্টেশন এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য স্থানীয় সার্ভার অবকাঠামোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে পুরো বঙ্গোপসাগরীয় এলাকায় সর্বোচ্চ ৩০ মিনিটের ‘রিভিজিট টাইম’র লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় স্যাটেলাইটের পুনরায় পর্যবেক্ষণের মধ্যবর্তী সময় হবে সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট।
বিএসসিএল সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় পর্যায়ে সামুদ্রিক তথ্যের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং বিদেশি তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্দেশ্যেই দেশের অভ্যন্তরে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণের জন্য স্থানীয় সার্ভার ব্যবহার করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে বিএসসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহাম্মদ ইমাদুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “অক্টোবরের মধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর প্রকল্পের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য চূড়ান্ত করে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিয়োগে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে হবে। চলতি বছরের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে ২০২৮ সালের মধ্যে এটি সম্পন্ন করা সম্ভব।”
ইউএসএআইডির অর্থায়নে পরিচালিত আন্তর্জাতিক মৎস্য গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ডফিশের ইকোফিশ-২ অ্যাকটিভিটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ৫০ লাখের বেশি মানুষের আয়ের প্রধান উৎস হলো সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ। এর বাইরে বঙ্গোপসাগরে ট্রলার ডুবে জেলেদের মৃত্যু কিংবা ঢেউয়ের তোড়ে ভেসে ভিনদেশের জলসীমায় চলে যাওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটে। অনেক মাছ ধরার ট্রলারগুলোয় দিকনির্ণয়ের আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকে না, ফলে জেলেরা গভীর সাগরে আকাশের তারা দেখে দিক নির্ণয় করেন। ঝড়ের কবলে পড়লে তাঁরা দিকহারা হয়ে ভিনদেশে ভেসে যান।
জেলেদের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক দাতব্য প্রতিষ্ঠান লয়েডস রেজিস্টার ফাউন্ডেশনের ‘ফিশসেফ’ ২০২৫ প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর ১ হাজার ৩৫০ জনেরও বেশি জেলে শুধু নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাবে সাগরে মারা যান।
মৎস্য অধিদপ্তরের সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. নজরুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সমুদ্রে মাছ ধরার নৌযান পর্যবেক্ষণে স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে নৌযানের অবস্থান শনাক্ত করা এবং মাছ ধরার নির্ধারিত নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে।”
মো. নজরুল ইসলাম আরও বলেন, “বর্তমানে নির্দিষ্ট গভীরতার বাইরে মাছ ধরার নিয়ম থাকলেও কিছু নৌযান তা মানে না। নৌযানের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও চেকপোস্টের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবহার করা গেলে আইন বাস্তবায়ন ও নজরদারিতে সুবিধা হবে।”
বিএসসিএল বলছে, নৌযানের অবস্থান ও চলাচলের তথ্য ব্যবহার করে যাত্রাপথ পরিকল্পনা করা গেলে জেলেদের অপ্রয়োজনীয় চলাচল কমবে, যা জ্বালানি সাশ্রয়ে সহায়ক হবে। সংস্থাটি জ্বালানি সাশ্রয়ের একটি হিসাব দিয়ে জানিয়েছে, পরিকল্পিতভাবে যাত্রা করলে একটি নৌকা একবারের যাত্রায় ১৫০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল সাশ্রয় করতে পারবে। এই হিসাবে বছরে মোট জ্বালানি সাশ্রয় হবে ৪ কোটি ৫০ লাখ লিটার, যার আর্থিক মূল্য ধরা হয়েছে ৪৫৯ কোটি টাকা।
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে দেশে প্রায় ৩০ হাজার ক্ষুদ্র বা আর্টিসানাল মাছ ধরার নৌকা নিবন্ধিত রয়েছে। তবে অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, এর বাইরে অন্তত আরও ৭০ হাজার অনিবন্ধিত নৌকা রয়েছে। বিএসসিএলের দাবি, স্যাটেলাইট নজরদারির মাধ্যমে এই অবৈধ নৌযানগুলো সহজেই শনাক্ত করা যাবে।
তবে বিশেষজ্ঞেরা মনে করছেন, যেসব নৌযানে এআইএস যন্ত্র নেই বা যারা ইচ্ছাকৃতভাবে সংকেত বন্ধ রাখে, তাদের শনাক্ত করা প্রচলিত এআইএস ব্যবস্থায় কঠিন। ফলে প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় কত ধরনের নৌযান শনাক্ত করা যাবে এবং নজরদারির জন্য অন্য কোনো প্রযুক্তির প্রয়োজন হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওকলাহোমার স্কুল অব কম্পিউটার সায়েন্সের অধ্যাপক মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এআইএসের পাশাপাশি সিনথেটিক অ্যাপারচার রাডারের (এসএআর) মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে এআইএসের সংকেত না পাঠানো নৌযানও শনাক্ত করা সম্ভব।”
বিনিয়োগের আগে প্রকল্পটির কারিগরি ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন স্যাটেলাইট বিশেষজ্ঞ আতিকুজ্জামান। তিনি বলেন, “চারটি স্যাটেলাইট দিয়ে প্রয়োজনীয় এলাকায় নজরদারি সম্ভব কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। প্রকল্পের ব্যয় ও সুফল কতটা এবং আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে একই ধরনের সেবা নেওয়া তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী হবে কি না, সেসব বিষয়ও বিশ্লেষণ করা দরকার।”