মিনহাজুল ইসলাম রোজান এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন, তবে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পরীক্ষার ফলাফল দেখার সুযোগ পাননি তিনি। ঐচ্ছিক বিষয় জীববিজ্ঞানের ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আগেই এই মেধাবী শিক্ষার্থীর অকাল মৃত্যু ঘটে। গতকাল শনিবার ছেলের পরীক্ষার ফলাফল সামনে আসতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা সাজ্জাদুল মিরাজ।
গতকাল এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, জীববিজ্ঞান বাদে অন্য বিষয়গুলোতে জিপিএ ৪ দশমিক ৩৩ পেয়েছেন মিনহাজুল ইসলাম রোজান। তবে জীববিজ্ঞানের ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারায় কেবল এই একটি বিষয়েই তিনি অকৃতকার্য হয়েছেন।
রোজান ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষার্থী ছিলেন। গত ১২ আগস্ট এইচএসসির ব্যবহারিক পরীক্ষা চলাকালীন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এরপর হাসপাতালে টানা ১০ দিন লাইফ সাপোর্টে ছিলেন রোজান। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
ছেলের পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিনে আনন্দের পরিবর্তে শোকের স্মৃতিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাবা সাজ্জাদুল মিরাজের মন। মুক্তকণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘ছেলের ফলাফল বের হয়েছে। আজ ওর কথা খুব মনে পড়ছে। অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণে ও দুটি ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। পরীক্ষা দিতে পারলে ওর ফলাফল আরও ভালো হতো।’
স্কুলের একজন শিক্ষক রোজানের ফলাফলের কাগজটি বাবা সাজ্জাদুল মিরাজের কাছে পাঠিয়েছিলেন। সেই ফল দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। মুক্তকণ্ঠকে তিনি জানান, চতুর্থ বিষয় বাদ দিয়ে তার ফল জিপিএ ৪ দশমিক ৩৩ হয়েছে। জীববিজ্ঞানের ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এ বিষয়ে এ প্লাস পেলে তার চূড়ান্ত ফলাফল হতো জিপিএ ৪ দশমিক ৮৩।
ছেলের অসুস্থতা এবং মৃত্যুর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো নিয়ে গভীর আক্ষেপ রয়েছে মা-বাবার মনে। বাবা সাজ্জাদুল মিরাজ ও মা ফাহমিদা আক্তার জানান, পরীক্ষার চাপের পাশাপাশি ছেলের ডায়াবেটিস ছিল, যা তাঁরা আগে জানতেন না।
পরিবারের ভাষ্যমতে, ৬ আগস্ট অসুস্থ হওয়ার পর রোজানকে বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। চিকিৎসকদের কেউ বলেছিলেন, রোজান পরীক্ষা নিয়ে চিন্তা করেছেন; কেউ বলেছিলেন, প্যানিক অ্যাটাক হয়েছে। আবার কেউ তাকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। পরিবারের অভিযোগ, সেই সময়ে ডায়াবেটিসসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগুলো করা হয়নি। তাকে কেবল স্যালাইন ও ঘুমের ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়েছিল।
১৩ আগস্ট রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় রোজানের রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে ৩৮ মিলিমোল/লিটারে পৌঁছায়। সেদিনই প্রথম ছেলের ডায়াবেটিসের কথা জানতে পারেন মা-বাবা।
রোজানের পরিবার জানিয়েছে, তিনি শুধু পড়াশোনাতেই নন, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন দায়িত্ব পালনেও ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। অষ্টম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর ক্লাস ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। অমায়িক ব্যবহারের কারণে শিক্ষকদের আস্থা ও সহপাঠীদের ভালোবাসা পেয়েছিলেন রোজান। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।