রাজধানীতে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ। হাসপাতালের নির্ধারিত বেড পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় কোথাও বারান্দায়, কোথাও মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের। একদিকে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা, অন্যদিকে চিকিৎসাসেবা নিয়ে রয়েছে রোগী ও স্বজনদের মিশ্র অভিজ্ঞতা। রাজধানীর তিনটি হাসপাতাল সরেজমিনে ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট ঘুরে ডেঙ্গু রোগীর চাপ দেখা যায়। ঢাকা মেডিকেলে বেড না পেয়ে বারান্দা ও মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন অনেকে। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডেও কোনো বেড খালি দেখা যায়নি। অন্যদিকে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকলেও সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন কয়েকজন রোগীর স্বজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ১৮ হাজার ৫০২ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ৩৬৮ জন। ২০০০ সালে ডেঙ্গুর তথ্য সংরক্ষণ শুরুর পর সংক্রমণের হিসাবে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে মারা গেছেন চারজন। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫১২ জন।
ঢাকা মেডিকেলে বেডের সংকট, মেঝেতে চিকিৎসা
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত বেড পূর্ণ হয়ে গেছে। জায়গা না পেয়ে অনেক রোগীকে বারান্দা ও মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
যাত্রাবাড়ীর কোনাবাড়ীর বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান অপু কয়েকদিন ধরে জ্বর, প্রচণ্ড মাথাব্যথা ও পাতলা পায়খানায় ভুগছিলেন। বাসায় ওষুধ, স্যালাইন ও তরল খাবার খাচ্ছিলেন তিনি। তবে বুধবার বিকেলে পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়ায় ভয় পেয়ে হাসপাতালে আসেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানতে পারেন, তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত।
রাতে হাসপাতালে এলেও বেড না পেয়ে মেঝেতে থেকেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তাকে। অপু জানান, হাসপাতালে আসার পর আর পায়খানার সঙ্গে রক্ত যায়নি। আগের চেয়ে কিছুটা ভালো বোধ করছেন তিনি। এর আগে তার প্লাটিলেট ২ লাখ থেকে কমে ১ লাখ ৭৫ হাজারে নেমেছিল। বৃহস্পতিবার আবার সিবিসি পরীক্ষা দেওয়া হয়েছে, তবে প্রতিবেদন তখনো পাওয়া যায়নি।
হাসপাতালের সেবা নিয়ে অপু বলেন, চিকিৎসক ও নার্সরা সাধ্যমতো সেবা দিচ্ছেন এবং খোঁজখবর রাখছেন। তবে রোগীর চাপ বেশি থাকায় বেড পাননি তিনি।
প্লাটিলেট কমে উদ্বিগ্ন রোগীর স্বজনেরা
শরীয়তপুরের জাজিরা থেকে ছেলেকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে এসেছেন ইজুমিয়া হাওলাদার। তার ১৮ বছর বয়সি ছেলে হাসান চার দিন আগে ১০৪ ডিগ্রি জ্বর ও ৯৬ হাজার প্লাটিলেট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়।
ইজুমিয়া হাওলাদার জানান, চার দিন চিকিৎসা নেওয়ার পর ছেলে এখন অনেকটা ভালো আছে। বর্তমানে তার প্লাটিলেট বেড়ে ২ লাখ ৪১ হাজার হয়েছে। সরকারি ছুটির দিনেও চিকিৎসকদের কাছ থেকে ভালো সেবা পেয়েছেন বলে জানান তিনি। তবে চিকিৎসক কম থাকার বিষয়টিও উল্লেখ করেন।
একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১৩ বছর বয়সি হিমেলের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে ধীরে ধীরে। রাজধানীর লালবাগের বাসিন্দা সুমি আক্তারের ছেলে হিমেল গত রোববার ১০৪ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। ভর্তির সময় তার প্লাটিলেট ছিল ২ লাখ ২০ হাজার। সোমবার তা কমে ১ লাখ ৩২ হাজার, মঙ্গলবার ৬০ হাজার এবং বুধবার ৬২ হাজারে নেমে আসে। বৃহস্পতিবার তা বেড়ে ৬৮ হাজার হয়েছে।
ছেলের প্লাটিলেট ধীরে বাড়ায় উদ্বিগ্ন সুমি আক্তার। হাসপাতালের সেবা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সময়মতো চিকিৎসক আসেন না। রোগীর তুলনায় চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যাও কম বলে মনে হচ্ছে তার।
সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলেও বেড খালি নেই
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ড ৪২০-এ গিয়ে কোনো বেড খালি দেখা যায়নি। সব বেডেই রোগী ভর্তি ছিলেন। হাসপাতালটিতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত নতুন করে সাতজন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন বলে জানা গেছে।
তবে সেখানে ভর্তি রোগীদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে দায়িত্বে থাকা নার্সরা অনুমতি দেননি।
শিশু হাসপাতালে পরিষ্কার পরিবেশ, সেবা নিয়ে মিশ্র অভিজ্ঞতা
রাজধানীর শ্যামলীতে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটেও ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। হাসপাতালের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকলেও সেবার মান নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ জানিয়েছেন রোগীর স্বজনেরা। সরেজমিনে গিয়ে চারটি বেড খালি দেখা যায়। অনেক শিশুকে মশারি টানিয়ে শুয়ে থাকতে দেখা গেছে।
মিরপুর-১০ থেকে ছেলেকে নিয়ে এই হাসপাতালে এসেছেন সুলতানা ফেরদৌস। তার ১১ বছর বয়সি ছেলে ইবনে জিহাদ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সোমবার রাতে ভর্তি হয়।
সুলতানা ফেরদৌস জানান, হাসপাতালে আনার সময় ছেলের শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। তখন তার প্লাটিলেট ছিল মাত্র ৪৫ হাজার। পরে তা বেড়ে ৬৬ হাজার হয়েছে। বর্তমানে আগের তুলনায় কিছুটা ভালো থাকলেও ছেলের অসুস্থতা নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটেনি তার।
হাসপাতালের সেবা নিয়ে তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতাল হিসেবে সেবার মান মোটামুটি। তবে হাসপাতালের পরিবেশ বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। ছেলের দ্রুত সুস্থতা ফিরে পাওয়াই এখন তার একমাত্র চাওয়া।
জলবায়ু পরিবর্তনে বছরজুড়ে থাকতে পারে ডেঙ্গুর ঝুঁকি
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আতিকুল্লাহ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণতা এবং কার্যকরভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার কারণে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে।
তিনি জানান, আগে ডেঙ্গুর প্রকোপ মূলত বর্ষাকালে বেশি দেখা যেত। কিন্তু এখন উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া দীর্ঘ সময় ধরে থাকায় মশার বংশবৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। এ কারণে ভবিষ্যতে সারা বছরই ডেঙ্গুর ঝুঁকি থাকতে পারে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত সেখানে ৪ হাজার ২১৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে ভর্তি রয়েছেন ২৮৯ জন। এ পর্যন্ত হাসপাতালে ডেঙ্গুতে ৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
ডা. সৈয়দ আতিকুল্লাহ আরও বলেন, ভিন্ন ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলে জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, চোখে ব্যথা, শরীর ব্যথা, ক্ষুধামন্দা, বমি বা পেটব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজনে পরীক্ষা করে ডেঙ্গু নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী চলতে হবে।
২৬ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ডেঙ্গু সংক্রমণ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গু রোগী শনাক্তের তথ্য সংরক্ষণ শুরুর পর সংক্রমণের হিসাবে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ২০০০ সালে দেশে ৫ হাজার ৫৫১ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হন। ওই বছর মারা যান ৯৩ জন। এরপর বিভিন্ন সময়ে সংক্রমণ বাড়লেও ২০২৩ সালে তা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। ওই বছর হাসপাতালে ভর্তি হন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন এবং মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন।
২০২৪ সালে হাসপাতালে ভর্তি হন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং মারা যান ৫৭৫ জন। ২০২৫ সালে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১। ওই বছর ডেঙ্গুতে মারা যান ৪১৩ জন।
চলতি বছরের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৫০২। মৃত্যু হয়েছে ৩৬৮ জনের। এই পরিসংখ্যান শুধু হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. আ.ন.ম. বজলুর রশীদ জানান, অক্টোবরের মধ্যেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
তিনি আরও জানান, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও রোগটি নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রচেষ্টায় কোনো ঘাটতি নেই। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সবাই কাজ করছে।