চীনের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক টানাপোড়েনের মুখে রিয়াল মাদ্রিদের তারকা ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পের পাশে দাঁড়িয়েছেন কোচ হোসে মরিনহো। মাও সেতুংকে নিয়ে করা মন্তব্যের জেরে চরম বিতর্কের মুখে পড়েছেন ফরাসি এই তারকা। ক্ষমা প্রার্থনা করার পরেও তিনটি চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি হারিয়েছেন এমবাপ্পে। এমনকি চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে লা লিগার সম্প্রচারও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মরিনহোর দাবি, এমবাপ্পে এবং রিয়াল মাদ্রিদ যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, তাই এখন আর নতুন করে কিছু করার নেই। তবে বর্তমান বিশ্বের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রকাশ্য মন্তব্যের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন এই পর্তুগিজ কোচ।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) রেসিং সান্তান্দারের বিপক্ষে লা লিগার ম্যাচের আগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এমবাপ্পেকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক নিয়ে প্রশ্ন করা হয় মরিনহোকে। চীনের সাবেক নেতা মাও সেতুংকে নিয়ে ফরাসি তারকার মন্তব্যের ফলে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন রিয়াল কোচ।

মরিনহোর মতে, এমবাপ্পে এবং রিয়াল মাদ্রিদ—উভয় পক্ষই অত্যন্ত দ্রুত এবং দায়িত্বশীলতার সাথে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তাদের এই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।

রিয়াল কোচ বলেন, ‘আমি শান্ত আছি, কারণ আমার ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ এবং সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড় কিলিয়ান এমবাপ্পে। দুজনই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় নিজেদের মর্যাদার পরিচয় দিয়েছে। কোচ হিসেবে আমার ক্লাব ও খেলোয়াড়ের অবস্থানে আমি সন্তুষ্ট।’

তবে বিতর্কিত মন্তব্যের সম্ভাব্য পরিণতির কথা মনে করিয়ে দিয়ে মরিনহো বলেন, বর্তমান সময়ে প্রকাশ্যে কিছু বলার আগে অনেক বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন। পর্তুগিজ এই কোচ বলেন, ‘এটাই আজকের বিশ্বের বিপদ। অনেক সময় সবচেয়ে ভালো কাজ হলো মুখ না খোলা। কারণ আপনি যা বলেন বা মন্তব্য করেন, তার অনেক কিছুতেই ঝুঁকি থাকে।’

এমবাপ্পের দায়িত্বশীল আচরণের প্রশংসা করে মরিনহো আরও বলেন, ‘আমি তাকে খুব দায়িত্বশীল আচরণ করতে দেখেছি। ক্লাবও যথেষ্ট মর্যাদার সঙ্গে পরিস্থিতি সামলেছে। আমাদের দিক থেকে বিষয়টি এখানেই শেষ। আমাদের আর কিছু করার নেই।’

পুরো ঘটনার সূত্রপাত হয় ফরাসি অনুষ্ঠান ‘দ্য ব্রিজ’-এর একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে। সেখানে নিজের পছন্দের একটি ইন্টারনেট মিম নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এমবাপ্পে এমন একজন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যাকে তার ধারণায় চীনা স্বৈরশাসক মনে হয়েছিল। যদিও এমবাপ্পে সরাসরি কারও নাম বলেননি, তবে ভিডিওতে প্রদর্শিত মিমটিতে চীনের সাবেক নেতা মাও সেতুংয়ের ছবির ওপর ফরাসি তারকার মুখ বসানো ছিল। ভিডিওটি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার পর চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে তিনি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন।

তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে চীনের জনগণের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান এমবাপ্পে। নিজের মন্তব্যকে অনুচিত বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, এতে কেউ আঘাত পেয়ে থাকলে তিনি দুঃখিত। সেই সঙ্গে চীনের ইতিহাস ও জনগণের প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধার কথা জানান ফরাসি অধিনায়ক।

পরিস্থিতি শান্ত করতে রিয়াল মাদ্রিদ আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায় এবং স্প্যানিশ লা লিগা কর্তৃপক্ষও দুঃখ প্রকাশ করে। এমনকি লা লিগা সভাপতি হাভিয়ের তেবাস স্পেনে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও জিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই সংকট মোকাবিলায় একটি বিশেষ ম্যানেজমেন্ট টিম বা সংকট ব্যবস্থাপনা দল গঠন করা হয়।

এত উদ্যোগ সত্ত্বেও চীনে বিতর্কের প্রভাব পুরোপুরি দূর হয়নি। দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা চায়না মিডিয়া গ্রুপ লা লিগার ম্যাচ সম্প্রচার স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সম্প্রচারমাধ্যম মিগুর সূচিতে আগামী রোববার রেসিং সান্তান্দারের বিপক্ষে রিয়াল মাদ্রিদের ম্যাচটি রাখা হয়নি। চলতি সপ্তাহে লা লিগার অন্য নয়টি ম্যাচের সম্প্রচার তালিকায় থাকলেও রিয়ালের ম্যাচটি বাদ পড়েছে।

আর্থিকভাবেও বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন এমবাপ্পে। চীনা দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মেংনিউ, সাংহাই মিল্কগ্রাউন্ড ফুড টেক এবং পানীয় প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ইস্ট্রক বেভারেজ তার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। তবে এই চুক্তি বাতিলের ফলে তিনি ঠিক কত টাকা হারিয়েছেন, তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম চায়না ডেইলিও এমবাপ্পের মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, এই ঘটনা চীনা সমর্থকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করার পাশাপাশি তার বাণিজ্যিক সম্পর্কগুলোকেও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

তবে মাঠের বাইরের এই বিতর্ক এমবাপ্পের পারফরম্যান্স বা মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন না মরিনহো। বরং কঠিন সময়ে ফরাসি তারকার পরিণত আচরণের প্রশংসা করেন তিনি।

মরিনহো বলেন, ‘কিলিয়ান খুবই বুদ্ধিমান ও পরিণত একজন মানুষ। নিজের সামর্থ্যের ওপর তার অনেক আত্মবিশ্বাস আছে। একই সঙ্গে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতেও জানে।’

সম্প্রতি ব্যালন ডি’অরে হ্যারি কেইনের কাছে মাত্র ২৮ পয়েন্টের ব্যবধানে হেরে দ্বিতীয় হয়েছেন এমবাপ্পে। এই ফলাফল মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রেও শিষ্যের আচরণের প্রশংসা করেন রিয়াল কোচ।

মরিনহোর ভাষায়, ‘হ্যারি ব্যালন ডি’অর জেতার পর কিলিয়ান যেভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, সেখানে আমি শুধু শ্রদ্ধা ও পরিণত আচরণই দেখেছি। নিজেকে সেরা মনে করা এক বিষয়, আর পুরস্কার জেতার জন্য কঠোর পরিশ্রম করা অন্য কাউকে সম্মান দেখানো আরেক বিষয়।’

আগামী রোববার (১ নভেম্বর) লা লিগায় রেসিং সান্তান্দারের মাঠে খেলতে নামবে রিয়াল মাদ্রিদ। বর্তমানে পয়েন্ট তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে মরিনহোর দল, যারা শীর্ষস্থানীয় আতলেতিকো মাদ্রিদের চেয়ে চার পয়েন্ট পিছিয়ে। গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচের আগে এমবাপ্পেকে ঘিরে চলমান বিতর্ক আর বাড়াতে চান না মরিনহো। রিয়াল ও ফরাসি তারকার ক্ষমা প্রার্থনাকে তিনি যথেষ্ট মনে করলেও চীনের সম্প্রচার ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের সংকট এখনো বিদ্যমান। ফলে রিয়াল কোচ বিষয়টির ইতি টানতে চাইলেও চূড়ান্ত সমাধান এখনো অনিশ্চিত।