ছেলের জীবনযাপন নিয়ে শচীনকর্তার মনে ছিল নানা অভিযোগ। তাঁর মনে হতো ছেলে শুয়ে-বসে অযথা সময় নষ্ট করে, শরীরচর্চার প্রতি তার তেমন আগ্রহ নেই। অথচ শচীনকর্তা নিজে ছিলেন অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠ এবং গোছানো। প্রতিদিন ভোরে হাঁটতে বের হওয়া ছিল তাঁর অভ্যাসের অংশ। তিনি চাইতেন তাঁর ছেলেও যেন এই স্বাস্থ্যকর অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়, আর সেই লক্ষ্যেই মাঝেমধ্যে ছেলেকে বকাঝকাও করতেন। এমনই এক সকালে মুম্বাইয়ের জুহুতে হাঁটতে বের হয়েছিলেন শচীনকর্তা। পথে তাঁর সাথে পরিচিত এক ব্যক্তি হঠাৎ বলে উঠলেন, “ওই যে আর ডি বর্মনের বাপ যাচ্ছে!”

কথাটি শুনে শচীনকর্তার মন এক গভীর আনন্দে ভরে উঠল। বাড়ি ফিরে তিনি অত্যন্ত গর্বের সাথে ছেলেকে এই ঘটনার কথা শোনালেন। দীর্ঘ সময় ধরে মানুষ তাঁকে চিনেছেন প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী এসডি বর্মন হিসেবে, কিন্তু সেদিন তিনি আর ডি বর্মনের বাবা হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন। সন্তানের এই পরিচিতি তাঁকে ভীষণভাবে গর্বিত করেছিল।

ছোট কর্তা রাহুল দেববর্মন নিজেই এক সাক্ষাৎকারে এই স্মৃতিচারণ করেছিলেন। ১৯৮৪ সালে ‘ফিল্মফেয়ার’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি কথোপকথনেও পাওয়া যায় ছেলের পরিচয়ে বাবার এই আনন্দিত হওয়ার কথা। নিজের আকাশচুম্বী খ্যাতির পাশাপাশি সন্তানের পরিচিতিকে তিনি সেদিন অত্যন্ত সানন্দে গ্রহণ করেছিলেন।

আজ আমরা কথা বলব সেই মানুষটির সম্পর্কে, যাকে বাংলা গানের শ্রোতারা ভালোবেসে ডাকেন শচীনকর্তা বলে। তিনি শচীন দেববর্মন। হিন্দি সিনেমার জগতে তিনি পরিচিত ‘দাদা বর্মন’ নামে। সুরকার, সংগীত পরিচালক এবং গায়ক—এই তিন ভিন্ন পরিচয়েই তিনি সংগীত জগতে এক স্বতন্ত্র ছাপ রেখে গেছেন। তাঁর সুরের মূর্ছনায় ধরা পড়েছে প্রেম ও বিরহের গল্প, আর মিশে ছিল বাংলার নদী ও মাটির চিরন্তন টান।

আজ তাঁকে স্মরণ করার এক বিশেষ দিন। আজ ৩১ অক্টোবর, তাঁর ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৫ সালের এই দিনে মুম্বাইয়ে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর।

রাজপরিবারের সন্তান হয়েও তাঁর সুরের মূলে ছিল সাধারণ মানুষের জীবন। ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লার এক রাজপরিবারে শচীন দেববর্মনের জন্ম। তাঁর বাবা নবদ্বীপচন্দ্র দেববর্মন ছিলেন ত্রিপুরার রাজপরিবারের সদস্য এবং মা নির্মলা দেবী ছিলেন মণিপুরের রাজকন্যা। ১৯২৪ সালে কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে বিএ পাস করে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি কলকাতায় পাড়ি জমান, যদিও এমএ শেষ করেননি। সংগীতই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রধান সাধনা ও লক্ষ্য।

শৈশব থেকেই লোকগানের সাথে তাঁর নিবিড় পরিচয় ঘটে। তাঁর শুরুর দিকের শিক্ষকদের সবাই প্রথিতযোদ্ধ ওস্তাদ ছিলেন না। তাঁর জীবনী অনুযায়ী, বাড়ির প্রবীণ সহায়ক মাধবের কণ্ঠে তিনি শুনতেন রামায়ণের কাহিনিভিত্তিক গান। আবার মাছ ধরার সঙ্গী আনোয়ার দোতরা বাজিয়ে গাইতেন ভাটিয়ালি। চারপাশের সাধারণ মানুষের মুখে শোনা এই সুরগুলোই তাঁর সংগীতবোধের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি কৃষ্ণচন্দ্র দে, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, ওস্তাদ বাদল খাঁ এবং ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর মতো গুণী ব্যক্তিত্বদের কাছে তালিম নেন। লোকসুরের সহজ আবেদন এবং শাস্ত্রীয় সংগীতের কঠোর শিক্ষা—এই দুইয়ের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল তাঁর মধ্যে।

এই দুই ধারার প্রভাব তাঁর প্রথম রেকর্ডেও স্পষ্ট। ১৯৩২ সালের সেপ্টেম্বরে হিন্দুস্থান রেকর্ড থেকে প্রকাশিত হয় ৭৮ আরপিএমের একটি ডিস্ক। এর এক পিঠে ছিল হেমেন্দ্রকুমার রায়ের লেখা ‘ডাকলে কোকিল রোজ বিহানে’ এবং অন্য পিঠে শৈলেন রায়ের ‘এ পথে আজ এসো প্রিয়’। একটি গান ছিল লোকসুরভিত্তিক এবং অন্যটি ছিল রাগপ্রধান। সুরকার ও গায়ক—উভয় ভূমিকাতেই ছিলেন শচীন দেববর্মন। প্রথম রেকর্ডটিই যেন তাঁর ভবিষ্যৎ সংগীতজীবনের দিকনির্দেশনা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

পরবর্তীতে হিন্দি চলচ্চিত্রের ব্যস্ত জগতে ব্যাপক প্রতিষ্ঠা পেলেও তিনি তাঁর শিকড় থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হননি। লোকগানকে তিনি নিজের সুরের ভাষায় এমনভাবে মিশিয়ে নিয়েছিলেন যে, তাঁর সৃষ্টিতে নদীর টান, বিচ্ছেদের আকুতি এবং প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষা অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে ফুটে উঠত। এমনকি শহুরে প্রেমের দৃশ্যেও কখনো কখনো বাংলার মেঠো সুরের প্রতিধ্বনি শোনা যেত।

শচীনকর্তার গান শুনলেই তাঁকে আলাদা করে চেনা যায়। কণ্ঠের তীক্ষ্ণ টান, উচ্চারণে পূর্ববঙ্গের বিশেষ ছাপ এবং সুরের বাঁকে লোকগানের রেশ তাঁকে অনন্য করে তুলেছে। তাঁর গায়কিতে শব্দের সঠিক প্রয়োগের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। কখনো তিনি একটি শব্দ দীর্ঘ করে টানতেন, আবার কখনো ছোট বিরতি দিয়ে পরের কথাটির আকুতি বাড়িয়ে তুলতেন। মনে হতো, দূর থেকে কেউ অত্যন্ত ব্যক্তিগত কথা জানাচ্ছেন। ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই’ গানটিতে এই বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত স্পষ্ট। কণ্ঠের টান এবং সুরের ওঠানামায় মনের অস্থিরতা ফুটে উঠেছে। বাঁশির প্রতি অনুযোগ থাকলেও তার আকর্ষণ এড়াতে না পারার এক অসহায়ত্ব শোনা যায়। তাঁর গাওয়া গানটির আবেদন কেবল সুরের মাধুর্যে নয়, বরং কথার অভিব্যক্তিতেও। অভিমান, আকুলতা ও সমর্পণ একসঙ্গে ধরা দেয় সেই উচ্চারণে।

হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠ প্রায়ই গল্পের ভাষ্যকারের ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৬৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘বন্দিনী’ ছবির শেষ অংশে শোনা যায় ‘ও রে মাঝি, মেরে সাজন হ্যায় উস পার’। শৈলেন্দ্রর লেখা এবং শচীনকর্তার সুর করা ও গাওয়া এই গানটিতে ভাটিয়ালির প্রভাব প্রবল। মাঝির প্রতি ডাকের মধ্য দিয়ে প্রিয়জনের কাছে পৌঁছানোর আকুতি মিশে গেছে। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রের মানসিক টানাপোড়েনকে এই গানটি আরও গভীর করে তোলে। তাঁর কণ্ঠ যেন চরিত্রের না-বলা কথাগুলোই শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেয়।

আবার ১৯৬৫ সালের ‘গাইড’ ছবির শুরুতে ‘ওয়াহাঁ কৌন হ্যায় তেরা’ গানটি এক ভিন্ন অনুভূতি তৈরি করে। শৈলেন্দ্রর কথায় নিজের সুরে গানটি গেয়েছিলেন শচীনকর্তা। এখানে তাঁর কণ্ঠে এক উদাস জিজ্ঞাসা ফুটে উঠেছে। যদিও তিনি পথিককে সম্বোধন করেছেন, কিন্তু সেই প্রশ্ন যেন সরাসরি দর্শকের মনে পৌঁছে যায়। গল্পের শুরুতেই গানটি একাকীত্ব এবং জীবনের অনিশ্চয়তার এক আবহ তৈরি করে। এই গানগুলোর মাধ্যমেই বোঝা যায়, চলচ্চিত্রে শচীনকর্তার কণ্ঠ কেন এত কার্যকর ছিল। পর্দার দৃশ্যের সাথে তাঁর গান চলত, আবার সেই দৃশ্যের বাইরেও ভাবনার জায়গা তৈরি করে দিত। লোকগানের চেনা টান নিয়ে তিনি মানুষের গভীর অনুভূতির কাছে পৌঁছে যেতেন। তাই গান শেষ হলেও কণ্ঠের সেই ডাক শ্রোতার মনে গেঁথে থাকত।

বাংলা গান ও চলচ্চিত্রের অভিজ্ঞতা নিয়ে শচীনকর্তা হিন্দি সিনেমায় প্রবেশ করেন। সংগীত পরিচালক হিসেবে তাঁর প্রথম হিন্দি ছবি ‘শিকারি’ মুক্তি পায় ১৯৪৬ সালে। পরের বছর ‘দো ভাই’ ছবিটির মাধ্যমে তিনি ব্যাপক সাফল্য পান। গীতা দত্তের গাওয়া ‘মেরা সুন্দর স্বপ্না বিত গয়া’ গানটি শ্রোতাদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেয়।

এরপর একের পর এক স্মরণীয় কাজ উপহার দেন তিনি। ‘পিয়াসা’, ‘চলতি কা নাম গাড়ি’, ‘গাইড’, ‘আরাধনা’, ‘অভিমান’—তাঁর সুরের বৈচিত্র্য বুঝতে এই কয়েকটি ছবির নামই যথেষ্ট। কোথাও ছিল বিষণ্নতা, কোথাও দুষ্টুমি, কোথাও প্রেমের উচ্ছ্বাস, আবার কোথাও ছিল অভিমান। লতা মঙ্গেশকর, মোহাম্মদ রফি, কিশোর কুমার, আশা ভোসলে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এবং মান্না দের মতো কিংবদন্তি শিল্পীরা তাঁর সুরে গান গেয়েছেন। তিনি প্রত্যেকের কণ্ঠের নিজস্ব শক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়েছেন। ফলে তাঁর সৃষ্টির ভুবনে ভিন্ন স্বরের সমাবেশ ঘটলেও সুরকারের নিজস্ব ছাপ কখনো হারায়নি।

ছেলের সংগীতজীবন গড়ার ক্ষেত্রেও শচীনকর্তা ছিলেন অত্যন্ত যত্নবান এবং কঠোর শিক্ষক। আর ডি বর্মনের কাছে বাবা ছিলেন একজন কঠিন গুরু। তাঁর মতে, তাল বুঝতে হবে, যন্ত্র চিনতে হবে এবং নিজের সৃষ্টির ব্যাপারে সৎ থাকতে হবে। ১৯৯৩ সালে সাংবাদিক মৃত্যুঞ্জয় কুমার ঝা আর ডির সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে পুরোনো নোট ও স্মৃতির ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়। সেখানে আর ডি জানিয়েছেন, তাঁর সংগীতজীবন গড়ে তোলার পেছনে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁর বাবার অবদান ছিল অপরিসীম।

ছোটবেলায় হারমোনিকায় সুর শোনানোর পর শচীনকর্তা তাঁকে মৌলিকতার গুরুত্ব বুঝিয়েছিলেন। তবলা শেখার নির্দেশও দিয়েছিলেন তিনি, কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিল একজন সুরকারের ছন্দবোধ তৈরি হওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রতিদিন কয়েকটি করে সুর তৈরির পরামর্শ দিতেন তিনি ছেলেকে। নিয়মিত চর্চার মাধ্যমেই ভালো সুর খুঁজে নিতে হবে—এটাই ছিল তাঁর শিক্ষা। আর ডির স্মৃতিতে বাবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল সরলতার মূল্য। সুর সাজাতে গিয়ে অতিরিক্ত কিছু জুড়ে দিলে তার আবেদন কমে যেতে পারে, তাই কোথায় থামতে হবে তা জানা প্রয়োজন।

সংগীতের বাইরে শচীনকর্তার বড় আবেগ ছিল ফুটবল। তাঁর প্রিয় দল ছিল ইস্টবেঙ্গল। দল যখনই বোম্বেতে খেলতে যেত, তিনি ফুটবলারদের সাথে দেখা করতে পৌঁছে যেতেন। ইস্টবেঙ্গলের শতবর্ষ উপলক্ষে আনন্দবাজার পত্রিকাকে দেওয়া স্মৃতিচারণায় সুরজিৎ সেনগুপ্ত জানিয়েছিলেন, রোভার্স কাপের সময় শচীনকর্তা এমনকি রেকর্ডিংয়ের কাজও বন্ধ রাখতেন। তিনি খেলোয়াড়দের খোঁজ নিতেন এবং মাঠে যাওয়ার আগে তাঁদের উৎসাহ দিতে পিঠ চাপড়ে দিতেন।

সুরজিতের স্মৃতিতে আরও একটি মজার ঘটনা আছে। কুপারেজ স্টেডিয়ামে শচীনকর্তার নামে দুটি চেয়ার দেখেছিলেন তিনি। প্রথমে ভেবেছিলেন একটি হয়তো আর ডির জন্য, কিন্তু পরে জানলেন দুটিই শচীনকর্তার। একটিতে তিনি বসতেন এবং অন্যটিতে পা রাখতেন। ফুটবলার গৌতম সরকারও তাঁর প্রতি শচীনকর্তার আন্তরিকতার কথা স্মরণ করেছেন। তিনি গর্ব করে খেলোয়াড়দের তাঁর তারকাখচিত বৈঠকখানায় নিয়ে আসতেন, তাঁদের সাথে সময় কাটাতেন এবং বাড়িতে আপ্যায়ন করতেন। খ্যাতিমান এই সুরকারের কাছে ফুটবলাররাও তারকার মতো সম্মান পেতেন।

শচীনকর্তা বিদায় নিয়েছেন বহু বছর আগে, তবে তাঁর গান আজও মানুষের কণ্ঠে জীবন্ত। পাড়া-মহল্লার গানের আসর থেকে বড় মঞ্চ—সবখানেই তাঁর সৃষ্টি ফিরে ফিরে আসে। নবীন শিল্পীরা তাঁর গানে খুঁজে পান শেখার পথ এবং নিজেকে প্রকাশের ভাষা। সংগীত প্রতিযোগিতায় তাঁর গান গেয়েই অনেকে নিজেদের সামর্থ্য মেলে ধরেন। কেউ রপ্ত করেন সুরের বাঁক, কেউবা কণ্ঠে ধরতে চান তাঁর গায়কির দরদ। এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নতুন কণ্ঠে বেঁচে আছেন শচীনকর্তা।