১৯৯৭ সালে যাত্রা শুরু করা জনপ্রিয় ব্যান্ড ভাইকিংস আগামী বছর তাদের পথচলার ৩০ বছর বা তিন দশক পূর্ণ করতে যাচ্ছে। এই বিশেষ মাইলফলক উদযাপনে ব্যান্ডটি তাদের পুরোনো গানগুলোকে নতুন আঙ্গিকে সাজিয়ে আনছে। একই সঙ্গে তাদের দীর্ঘ তিন দশকের অভিজ্ঞতার কথা বলে নির্মাণ করা হচ্ছে একটি স্বল্পদৈর্ঘী সিনেমা। অ্যালবাম এবং সিনেমা—উভয়েরই নাম রাখা হয়েছে ‘ভাইকিংস রিপ্লেইড’। এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছেন মনজুর কাদের।
ব্যান্ডটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, তাদের প্রথম দুটি অ্যালবামের মোট ১১টি গান নতুন সংগীতায়োজনে পুনরায় প্রকাশ করা হবে। এর পাশাপাশি ৪৫ মিনিটের একটি সিনেমা নির্মিত হচ্ছে, যেখানে ব্যান্ডের দীর্ঘ পথচলার গল্প ফুটে উঠবে। আগামী ১ জানুয়ারি অ্যালবামটি প্রকাশিত হবে এবং তার এক সপ্তাহের মধ্যেই মুক্তি পাবে সিনেমাটি।
কোন ১১টি গান নতুন করে সাজানো হচ্ছে, সে বিষয়ে এখনই বিস্তারিত কিছু জানাতে রাজি নন ব্যান্ডের ভোকাল ও দলনেতা তন্ময় তানসেন। তিনি বিষয়টিকে শ্রোতাদের জন্য একটি চমক হিসেবে রাখতে চান। তবে তিনি জানিয়েছেন, অ্যালবামের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। পুরোনো গানের এই নতুন উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি একদিকে যেমন পুরোনো শ্রোতাদের সেই চেনা সময়ে ফিরিয়ে নিতে চান, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের কাছেও ভাইকিংসের গান পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছেন।
এই উদ্যোগ সম্পর্কে তন্ময় তানসেন বলেন, ‘আমাদের একটা শ্রোতাগোষ্ঠী আছে। অ্যালবাম দুটি যখন প্রকাশিত হয়েছিল, তখন গানগুলো শ্রোতাদের পছন্দের তালিকায় ছিল। এর মধ্যে সময়ের অনেক পরিবর্তন হয়েছে, শ্রোতাদের রুচিও বদলেছে। তাই পুরোনো শ্রোতাদের পাশাপাশি জেন-জির কাছেও গানগুলো পৌঁছে দিতে নতুন সংগীতায়োজনে উপস্থাপন করছি। সাউন্ডে বড় ধরনের পরিবর্তন পাবেন শ্রোতারা। এই সময়ের কথা ভেবে প্রযুক্তির ব্যবহারও করেছি। পুরোনো গানগুলো দিয়ে এই সময়ের মানুষকে নতুন করে সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দিতে চাই।’
অ্যালবাম থেকে সিনেমার যাত্রা
ভাইকিংসের সংগীত যাত্রার দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০০ সালে তাদের প্রথম অ্যালবাম ‘জীবনের কোলাহল’ প্রকাশিত হয়। ২০০১ সালে তারা ‘ভালোবাসি যারে’ শিরোনামে একটি একক গান প্রকাশ করে। এরপর ২০০২ সালে আসে দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘দিন যত দুঃখ তত’। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয় তৃতীয় অ্যালবাম ‘রানআউট’। একই নামে একটি সিনেমাও পরিচালনা করেন তন্ময় তানসেন।
সেই ‘রানআউট’ সিনেমার ছয়টি গান নিয়ে তৈরি হয়েছিল অ্যালবামটি। পরবর্তীতে ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত পাঁচটি একক গান নিয়ে তারা ‘বয়স যখন একুশ’ নিয়ে আসে।
নতুন সংগীত আয়োজন এবং সিনেমার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পুরো দল নিয়ে কক্সবাজারে যান তন্ময় তানসেন। শহরের কোলাহল থেকে দূরে থেকে গানের প্রাথমিক কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে ঢাকা থেকে প্রয়োজনীয় স্টুডিও সরঞ্জাম সঙ্গে নেওয়া হয়। কক্সবাজারের ওশান প্যারাডাইস হোটেলের প্রেসিডেনশিয়াল স্যুটে টানা ১৫ দিন অবস্থান করেন তাঁরা। এই সময়েই গানগুলোর স্কেচ তৈরির পাশাপাশি সিনেমার শুটিং সম্পন্ন হয়।
তন্ময় তানসেনের চলচ্চিত্র নির্মাণে পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকায় তাঁর জন্য কাজটি সহজ ছিল। তিনি এর আগে ‘রান আউট’ ও ‘পদ্ম পাতার জল’ সিনেমা দুটি পরিচালনা করেছেন। তবে ব্যান্ডের অন্য সদস্যদের অভিনয় বা পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকায় তাঁদের জন্য এটি ছিল সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতা।
এই অভিজ্ঞতা নিয়ে তন্ময় তানসেন বলেন, ‘গান বানানোর বিষয়টা আমাদের চেনা, কিন্তু সেটি যখন সিনেমা হয়ে উঠছে, তখন সংলাপ, অভিনয়—এসবও মাথায় রাখতে হয়েছে। সবাই কি যে করেছি...উফ। সেসব আর মনে করতে চাই না। এটা আসলে আমাদের কাজ না, তারপরও আমরা চেষ্টা করেছি। অন্য রকম একটা অভিজ্ঞতা।’
‘ভাইকিংস রিপ্লেইড’ সিনেমায় ব্যান্ডের শুরুর দিনগুলো থেকে বর্তমান পর্যন্ত পথচলার নানা দিক ফুটিয়ে তোলা হবে। সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, সাফল্য এবং ব্যান্ডের উত্থানের নেপথ্যের গল্পগুলো এতে স্থান পাবে। তন্ময় তানসেন বলেন, ‘আমরা ব্যান্ডের প্রথম দিককার সময় থেকে এখন পর্যন্ত পুরো যাত্রাটা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এখানে আমাদের হাসি, আনন্দ, দুঃখ, বেদনা, সাফল্য—সব ধরনের গল্পই থাকবে। ভাইকিংসের উঠে আসার পেছনের গল্পগুলো মানুষ জানতে পারবেন। এ ধরনের সিনেমার ধারণা আমাদের দেশে নতুন হলেও দেশের বাইরে এমন কাজ নিয়মিত হয়।’
মঞ্চে ফেরার প্রত্যাশা
‘অপেক্ষা’, ‘অপেক্ষা ২’, ‘ঈশ্বর’, ‘যদি’, ‘ভয়’ ও ‘জীবনের কোলাহল’-এর মতো জনপ্রিয় গানের মাধ্যমে শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নিয়েছে ভাইকিংস। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মঞ্চে তাদের উপস্থিতি কিছুটা কমেছে। এ বিষয়ে তন্ময় তানসেন জানান, ‘২০২৪ সালের পর স্টেজ শো অনেক কম। তারপরও হাতেগোনা কয়েকটি করেছি। এই সময়ে আমরা অ্যালবাম ও সিনেমা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, নিজেরাও কিছুটা চুপচাপ ছিলাম। অ্যালবাম ও সিনেমা প্রকাশের পর আবার গতি ফিরবে।’
১৯৯৭ সালে তন্ময় তানসেন, এলাহি আল শামস রিপ্পি, সায়মন মাজিদ, জনি, মাহবুব বিন মুতাহির বাবু ও সেতু চৌধুরীকে নিয়ে ভাইকিংসের যাত্রা শুরু হয়েছিল। তবে সময়ের আবর্তে তন্ময় তানসেন ছাড়া পুরোনো সদস্যদের কেউ এখন আর ব্যান্ডে নেই; কেউ দল ছেড়েছেন, কেউ পরলোকগমন করেছেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য তন্ময় তানসেনের সঙ্গে ব্যান্ডের সদস্য হিসেবে আছেন লিড গিটারিস্ট ফারুক হোসেন শুভ ও আজমাইন আদিল, বেজ গিটারিস্ট জিয়া সোপান, কি-বোর্ডিস্ট মাহবুব চৌধুরী এবং ড্রামার শুয়ে শুয়ে সিং সিং চৌধুরী।
তন্ময় তানসেন জানান, ‘ভাইকিংস রিপ্লেইড’ প্রকাশের পর তারা মৌলিক গান নিয়ে নতুন অ্যালবামের কাজ শুরু করতে চান। তিনি আশা করেন, পুরোনো গানের নতুন রূপ এবং নিজেদের জীবনযুদ্ধের গল্প নিয়ে তৈরি এই সিনেমা শ্রোতাদের সঙ্গে ব্যান্ডের পুনরায় গভীর যোগাযোগ স্থাপনে বড় ভূমিকা রাখবে।