‘টাকডুম টাকডুম বাজাই বাংলাদেশের ঢোল’, ‘তুমি এসেছিলে পরশু, কাল কেন আসোনি’ কিংবা ‘তোরা কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া’—এমন অসংখ্য কালজয়ী গানের স্রষ্টা শচীন দেববর্মন। উপমহাদেশের প্রখ্যাত এই সংগীতশিল্পীর জন্ম কুমিল্লায়। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, তাঁর পৈতৃক বাড়িটি বছরের অধিকাংশ সময় চরম অযত্নে পড়ে থাকে।

শচীন দেববর্মনের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বছরে দু-একবার মেলার আয়োজন করা হলেও বাড়িটির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সংগীতচর্চা কিংবা স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

কুমিল্লা নগরের দক্ষিণ চর্থায় অবস্থিত এই বাড়িটিতে ২০১৮ সাল থেকে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ‘শচীন মেলা’ আয়োজন করা হচ্ছে। প্রতিবছর মেলার সময় বাড়িটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সাজানো হলেও বছরের বাকি সময়টুকুতে এর দেখভালের বিষয়টি নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যায়।

উল্লেখ্য, ১৯০৫ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লার দক্ষিণ চর্থায় জন্মগ্রহণ করেন শচীন দেববর্মন। দীর্ঘ জীবন অতিবাহিত করে ১৯৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর ভারতের মুম্বাইয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।

কুমিল্লার ইতিহাস গবেষক আহসানুল কবীর মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “কুমিল্লার নাগরিক সমাজ দীর্ঘদিন ধরে বাড়িটিতে পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছে। বিভিন্ন সময়ে শুধু আশ্বাস পাওয়া গেছে। তবে কার্যকর কিছু হয়নি।”

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মেলা উপলক্ষে সাময়িকভাবে বাড়িটি পরিষ্কার করা হলেও বছরের বেশির ভাগ সময় এটি অরক্ষিত অবস্থায় থাকে। অনেক সময় এখানে মাদকসেবীদের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে বাড়িটির দেখভালের জন্য একজন অস্থায়ী পাহারাদার থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে নিয়মিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে না।

সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ঐতিহ্য কুমিল্লা’র পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম ২০১৪ সাল থেকে বাড়িটি সংরক্ষণের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। তিনি বলেন, “সংস্কারের পর বাড়িটিতে শচীন কমপ্লেক্স করার কথা ছিল; কিন্তু এত বছরেও তা হয়নি। ফলে বাড়িটি আবারও পরিত্যক্ত অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।” তিনি আরও জানান, কুমিল্লার সাধারণ মানুষ দ্রুত সেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স দেখতে চান।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বাড়িটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে এর বড় একটি অংশ দখল করে সরকারি মুরগির খামার গড়ে তোলা হয়েছিল। পরবর্তীতে সাংস্কৃতিক সংগঠকদের তীব্র দাবি ও আন্দোলনের মুখে ২০১৪ সালে বাড়িটির একাংশ উদ্ধার করা হয়। এরপর সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সোয়া এক কোটি টাকা ব্যয়ে জেলা প্রশাসন বাড়িটি সংস্কার করে। ২০১৮ সালে সংস্কারকাজ শেষ হলেও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাড়িটির অবস্থা আবারও খারাপ হতে শুরু করে। এমনকি বাড়ির অনেক মালামালও চুরি হয়ে গেছে বলে জানা গেছে।

শচীন দেববর্মনের বাবা নবদ্বীপ চন্দ্র দেব ছিলেন ত্রিপুরার রাজপরিবারের সন্তান ও একজন সংগীতশিল্পী। দক্ষিণ চর্থার এই বাড়িতেই শচীন দেববর্মনের শৈশব ও কৈশোর কাটে। ১৯২৪ সালে তিনি কুমিল্লা ছেড়ে কলকাতায় যান এবং ১৯৪৪ সালে সপরিবার মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান। সেখানে চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালক ও গায়ক হিসেবে তিনি বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেন। ভারত সরকার তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ পদ্মশ্রী খেতাবে ভূষিত করে। তাঁর স্ত্রী মীরা দেবীও ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম গায়িকা ও দক্ষ গীতিকার। তাঁদের একমাত্র ছেলে রাহুল দেববর্মন, যিনি আর ডি বর্মন নামে সংগীতজগতে পরিচিত। এছাড়া শচীন দেববর্মনের পুত্রবধূ ছিলেন খ্যাতিমান সংগীতশিল্পী আশা ভোসলে।

শচীন দেববর্মনের স্মরণে প্রতিবছর কুমিল্লায় মেলার আয়োজন করা হয় জানিয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আলী রাজিব মাহমুদ মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “এ ছাড়া সারা বছর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্থানীয় শিল্পীরা তাঁকে নিয়ে সংগীত পরিবেশন করেন। তাঁর বাড়িতে পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স নির্মাণের দাবি অনেক দিনের। তবে বর্তমানে বাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণসহ যাবতীয় দায়িত্ব প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের।”

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান বলেন, “বাড়িটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি। এটি সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনে তাঁরা কাজ করবেন। এখানে শচীন দেববর্মনের সৃষ্টি নিয়ে সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ তৈরির জন্য সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বাড়িটির সীমানাপ্রাচীর ও প্রধান ফটক সংস্কারের চেষ্টা চলছে।”

এদিকে, শচীন দেববর্মনের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার থেকে কুমিল্লায় শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী ‘শচীন মেলা-২০২৬’। দক্ষিণ চর্থায় তাঁর পৈতৃক বাড়ি প্রাঙ্গণে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এই মেলার উদ্বোধন করা হয়। মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক রোজী আকতার। শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মেলার প্রথম দিনের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। শনিবার কুইজ প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভা, পুরস্কার বিতরণী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মেলার সমাপনী অনুষ্ঠিত হবে।