ঢাকার রায়েরবাজার এলাকায় অবস্থিত একটি জীর্ণ দালান, যার সাথে মিশে আছে মৃৎশিল্পের সমৃদ্ধ বাণিজ্য, মানবকল্যাণকর নানা উদ্যোগ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ এবং একটি রক্তাক্ত সময়ের করুণ স্মৃতি। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি স্থানীয়ভাবে ‘গদিঘর’ নামে পরিচিত। তৌহিদুল ইসলাম সম্প্রতি এই রহস্যময় ও প্রাচীন ভবনটি দেখতে গিয়েছিলেন।
রায়েরবাজারের মোহাম্মদীয়া আলিম মাদ্রাসা গলির মুখে শেরে বাংলা রোড-লাগোয়া ভবনের পাশে অবস্থিত এই স্থাপনাটিতে কোনো নামফলক নেই। তবে ১১ সেপ্টেম্বর সেখানে গিয়ে দেখা যায়, অযত্নে থাকা একটি কালো সাইনবোর্ডে সাদা অক্ষরে লেখা আছে—‘গদিঘর, স্থাপিত ১৯১৮ ইং’। প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে জরাজীর্ণ এক দালান। লোনা ধরা দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে, কোথাও জমেছে শেওলা। ভবনের পেছনের ভঙ্গুর দেয়ালে গজিয়েছে লতাগুল্ম ও পরগাছা। সামনে রয়েছে একটি ছোট মাঠ, যার পূর্ব ও দক্ষিণ পাশে বড় বড় গাছ। ভাদ্র মাসের প্রচণ্ড দুপুরেও এই গাছের ছায়ায় প্রাঙ্গণটি বেশ স্নিগ্ধ ও শীতল থাকে।
১৩ শতক জমির এই ভূখণ্ডের দক্ষিণ অংশে মাঠ এবং উত্তর অংশে গদিঘর ভবনটি অবস্থিত। ভবনটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ৪০ ফুট এবং প্রস্থে ৩০ ফুট, যার দেয়াল প্রায় ১ ফুট ৮ ইঞ্চি চওড়া। দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে দেখা যায় শৈল্পিক নকশার কারুকাজ। এই প্রাঙ্গণের পাকা বারান্দায় প্রায়ই ক্লান্ত পথচারী বা শ্রমজীবী মানুষকে বিশ্রাম নিতে দেখা যায়। এছাড়া শিশু-কিশোরেরা এখানে খেলাধুলা করে এবং শীতকালে স্থানীয় তরুণ-যুবকেরা ব্যাডমিন্টন ও রাতে ক্রিকেট খেলে। স্থানীয়দের জন্য এই মাঠটি অবসরযাপন ও উৎসবের প্রধান কেন্দ্র।
গদিঘরের ইতিহাস অনুসন্ধান করলে জানা যায়, একসময় রায়েরবাজারের পৌর মার্কেটের মসজিদ (মসজিদুল আরাফাহ)-লাগোয়া খালে একটি নৌঘাট ছিল। এই খালটি পশ্চিমে পুরোনো বুড়িগঙ্গা এবং উত্তরে তুরাগ নদে গিয়ে মিশত। বর্তমানে সেই ঘাট ও খালের অস্তিত্ব নেই; খালের ওপরই গড়ে উঠেছে সাদেক খান রোডের একাংশ। একসময় বিভিন্ন স্থান থেকে মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলসিসহ নানা তৈজসপত্র নিয়ে এই ঘাটে ভিড়ত ছোট-বড় নৌযান, যেখান থেকে পণ্যগুলো বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ত। এই বাণিজ্য কার্যক্রমকে গতিশীল করতে ১৮৭৬ সালে ‘রায়েরবাজার পাল সমিতি ট্রাস্ট’ গঠিত হয়। তবে দীর্ঘ সময় পর দ্বন্দ্ব ও মামলা-মোকদ্দমার কারণে ট্রাস্টের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।
তৎকালীন সাবডিভিশনাল অফিসার খানবাহাদুর সৈয়দ আবদুল লতিফের পরামর্শে স্থানীয় বাসিন্দা মহেশ কুমার মজুমদার, অভয়াকুমার দত্ত, তালুকদার শেখ জাফর আলী মণ্ডল ও কিশোরীমোহন পালের নেতৃত্বে ট্রাস্টটি পুনর্গঠিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯১৮ সালে গদিঘর ভবনটি নির্মাণ করা হয়, যা মূলত ট্রাস্টের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এই গদিঘরেই মৃৎশিল্পের পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের টোল আদায় করা হতো।
ট্রাস্টের দক্ষ ব্যবস্থাপনায় তৎকালীন ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে মৃৎশিল্পের বাহারি পণ্য রপ্তানি হতো, যার ফলে এলাকার ব্যবসায়িক সমৃদ্ধি ও ট্রাস্টের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীতে ট্রাস্টের উদ্যোগে মসজিদ, মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং খাল খননের মতো নানা জনকল্যাণমূলক কাজ করা হয়, যা হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে।
তবে এই সম্প্রীতির ইতিহাসে রয়েছে এক রক্তাক্ত অধ্যায়। ১৯৬৪ সালে রায়েরবাজারের হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায় এবং মোহাম্মদপুর এলাকার অবাঙালি বিহারি সম্প্রদায়ের মধ্যে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ৮১ বছর বয়সী বিশ্বনাথ পাল, যিনি রায়েরবাজার শ্রীশ্রী মহাপ্রভু আখড়া মন্দিরের সভাপতি। তিনি বলেন, “দাঙ্গার সময় গদিঘরসহ গোটা রায়েরবাজার এলাকায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। গদিঘরে রক্ষিত মূল্যবান জিনিসপত্র, দলিল-দস্তাবেজ ও সোনা-রুপা লুট করা হয়েছে। বিহারিদের আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়ে শহীদ হন জিন্নাত আলী ও মাহেন্দ্র পাল।”
২০১৪ সালের ২১ আগস্ট সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনে নূর সুমনের লেখা একটি নিবন্ধে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৬৪ সালের ১৫ জানুয়ারি বিকেল ৪টার দিকে জিন্নাত আলী খবর পান যে, কিছু সন্ত্রাসী এলাকার হিন্দুদের ওপর আক্রমণ করতে এসেছে। সে সময় রায়েরবাজারের ১২ ঘর ও কাটাসুরে ১৬ ঘর মুসলমান ছাড়া বাকি সব ছিল হিন্দু পরিবার। প্রতিবেশীদের রক্ষায় জিন্নাত আলী রশিদ, নাহিরশ্বা, সামছু গোয়ালা, হাসেম মাস্টার ও চান মিয়াদের সঙ্গে নিয়ে কাটাসুরে যান এবং দাঙ্গাকারীদের বাধা দেন। সন্ত্রাসীদের ছুরিকাঘাতে সেখানেই প্রাণ হারান জিন্নাত আলী।
স্বামীর মৃত্যুর খবর শুনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সামনে এগিয়ে যান তাঁর স্ত্রী ফুলনেছা বিবি। সন্ত্রাসীরা তাঁকে ছুরি দিয়ে মাথা, পিঠ ও ডান হাতে আঘাত করে। গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। স্থানীয়রা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও ১১ দিন পর ফুলনেছা বিবিও মারা যান।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনা কবি জসীমউদ্দীনকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। ১৯৬৪ সালের ১৫ মে প্রকাশিত তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘জীবন কথা র’ এর উৎসর্গপত্রে কবি লিখেছেন, “সুসাহিত্যিক বন্ধুবর আমির হোসেন চৌধুরী, ঢাকা রায়েরবাজারের জিন্নাত আলী মাস্টার ও তাঁহার পরিবারের যে সকল মহৎপ্রাণ ব্যক্তি গত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় অসহায় হিন্দুদের রক্ষা করিতে যাইয়া জীবনদান করিয়াছেন, তাঁহাদের পবিত্র স্মৃতির উদ্দেশে...এই পুস্তক উৎসর্গ করিলাম।”
জিন্নাত আলীর নাতি ব্যবসায়ী মাহি বি সিনহা, যিনি রায়েরবাজারের জাফরাবাদ এলাকায় থাকেন, বলেন, “তাঁর দাদা ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মানুষের ন্যায্য অধিকার রক্ষায় কাজ করেছেন। আর সে জন্য দাদা-দাদি দুজনকেই প্রাণ দিতে হয়েছে। গদিঘর হচ্ছে সেই ইতিহাসের সাক্ষী। দুঃখের বিষয়, স্থানীয় প্রভাবশালী একটি মহল গদিঘর ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণের পাঁয়তারা করছে। গদিঘর রক্ষা করে সংরক্ষণ করতে হবে। এ জন্য সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।”
সচেতন মহলের মতে, যথাযথ সংস্কার করা হলে এই রুগ্ণ-ভগ্ন গদিঘর একটি পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। তবে প্রাচীন এই স্থাপত্য রক্ষায় সরকারি উদ্যোগের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। স্থানীয় যুবসমাজ ও সচেতন নাগরিকরা গদিঘরটিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন, যাতে প্রভাবশালী মহলের হাত থেকে এটি রক্ষা পায়।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) সাবিনা আলম জানান, “গদিঘরটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংস্কারের প্রয়োজন হলে প্রথমে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে গেজেটভুক্ত করতে হবে। এ লক্ষ্যে সরেজমিনে পরিদর্শন করে সংরক্ষণযোগ্যতা নিশ্চিত হওয়ার পর জেলা প্রশাসনের মতামত গ্রহণ করে গেজেটভুক্ত করার প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে।”
উল্লেখ্য, ১৯৮৮ থেকে তিন বছর গদিঘরটি মন্দির হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের সময় মন্দিরটি বিলুপ্ত হয় এবং পাল সমিতির ট্রাস্টের কার্যক্রম সংকুচিত হয়ে পড়ে। ট্রাস্টের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সুখেন পাল জানান, ট্রাস্টের অনেক সহায়-সম্পদ বেহাত হয়ে গেছে, যা পুনরুদ্ধারে বর্তমানে আদালতে মামলা চলছে।
বর্তমানে দালানটির দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছে বৈশাখী যুব সংগঠন, যাদের কার্যালয় গদিঘর প্রাঙ্গণে অবস্থিত। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দীন বলেন, “গত পয়লা বৈশাখ আমরা গদিঘর মাঠে উদ্যাপন করেছি। যুবসমাজকে নিয়ে ভবিষ্যতে কীভাবে গদিঘরকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়ানো যায়, সেই চেষ্টা করছি।”