পোল্যান্ডের সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের প্রধানকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দেশটিতে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমান ইউরোপপন্থী সরকারের এই পদক্ষেপকে অন্যায্য বলে মনে করছেন বিক্ষোভকারীরা। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাতে গতকাল শুক্রবার বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী ট্রাইব্যুনালের সামনে জড়ো হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ট্রাইব্যুনাল এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভ চলাকালীন কিছু আন্দোলনকারী ট্রাইব্যুনালের বেড়া ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারার ঘটনা ঘটে। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে পুলিশ তিনজনকে আটক করেছে।

এদিকে, পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরোকি যখন এই ঘটনার সময় সেনেগালের উদ্দেশ্যে আকাশপথে যাত্রা করেছিলেন। তবে দেশের উত্তাল পরিস্থিতির কথা জানতে পেরে স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত ১১টার দিকে তিনি জানান যে, তিনি তাঁর ফ্লাইট ঘুরিয়ে দেশে ফিরছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘এমন মুহূর্তে প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই পোল্যান্ডে থাকতে হবে। আমি সেনেগাল যাত্রা সংক্ষিপ্ত করছি। আমি ফিরে আসছি।’

পোল্যান্ডের শীর্ষ বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনাল নিয়ে বর্তমানে দুই রাজনৈতিক শিবিরের মধ্যে চরম বিরোধ চলছে। একদিকে রয়েছে বর্তমান ইউরোপপন্থী সরকার এবং অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে রয়েছে জাতীয়তাবাদী-রক্ষণশীল ল অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি (পিআইএস)। উল্লেখ্য, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পোল্যান্ডে পিআইএস সরকারের শাসন ছিল।

পোল্যান্ড ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সমালোচকদের দাবি, পিআইএস শাসিত সময়ে দলটি সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালসহ গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক অঙ্গনগুলোর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। পিআইএসের এই বিতর্কিত সংস্কারের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পোল্যান্ডের ওপর জরিমানা আরোপ করেছিল। পরবর্তীতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০২৩ সালে ডোনাল্ড টাস্কের নেতৃত্বাধীন ইউরোপপন্থী সরকার ক্ষমতায় আসে।

তবে ক্ষমতায় আসার পর থেকে সরকারের এই সংস্কার উদ্যোগগুলো বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পিআইএস-ঘনিষ্ঠ দুই প্রেসিডেন্ট ভেটো দেওয়ার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াগুলো আটকে দিয়েছেন, যাদের মধ্যে একজন হলেন কারোল নাওরোকি। সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের প্রধান বগদান শভিয়েঞ্চকোভস্কিকে সাময়িক বরখাস্ত করার তথ্য স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার দিকে আদালতের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। তবে এর কিছুক্ষণ পরেই ওয়েবসাইটটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে তাঁকে বরখাস্ত করার আনুষ্ঠানিক কারণগুলো বার্তা সংস্থা স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করতে পারেনি।

বগদান শভিয়েঞ্চকোভস্কি পিআইএস সরকারের আমলেই সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান। প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন যে, সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের দ্বারা নির্বাচিত বিচারকদের তিনি ট্রাইব্যুনালে দায়িত্ব নিতে বাধা দিচ্ছেন। গতকাল সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী টাস্ক এক্সে লিখেছেন, ‘আইনের শাসন পুনরুদ্ধার করা আমাদের দায়িত্ব।’

গত আগস্টে ‘কাম্পুস পলস্কা’ অনুষ্ঠানে সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন টাস্ক। তিনি জানান, ট্রাইব্যুনালে পুনরায় বৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকদের বসানো নিশ্চিত করতে তাঁর সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, তাঁর এই পদ্ধতি সবার কাছে পছন্দ নাও হতে পারে।

বর্তমানে পোল্যান্ডের সবচেয়ে বড় বিরোধী শক্তি হিসেবে পরিচিত পিআইএস-এর রাজনীতিকেরা শভিয়েঞ্চকোভস্কির সাময়িক বরখাস্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। সাবেক বিচারমন্ত্রী জবিগনিয়েফ জিওব্রো গতকাল সন্ধ্যায় এক্সে লিখেছেন, ‘এটি সাংবিধানিক ব্যবস্থার ওপর এক নির্লজ্জ, অপরাধমূলক আক্রমণ। সে কারণেই আমি প্রতিরোধের ডাক দিচ্ছি—যে প্রতিরোধ হবে সোচ্চার, দৃঢ়, সংহতিপূর্ণ ও নির্ভীক।’