‘আবেদন নামঞ্জুর।’ বিকেল চারটায় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এই সংক্ষিপ্ত বার্তাটি পান ছোট দোকানদার জহির (ছদ্মনাম)। যখন তিনি এই সিদ্ধান্তের কারণ জানতে চাইলেন, তখন ব্যাংক কর্মকর্তা কেবল এটুকুই বললেন, ‘সিস্টেম বলছে।’ কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, এই সিস্টেমটি ঠিক কোন তথ্যের ভিত্তিতে বা কী যুক্তিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে?

আসলে এটি হলো এআই ক্রেডিট স্কোরিং বা ঋণযোগ্যতা যাচাইয়ের একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে যন্ত্র আপনার আয়, আর্থিক লেনদেন এবং ঋণ পরিশোধের পূর্ব ইতিহাস বিশ্লেষণ করে অনুমান করার চেষ্টা করে যে, ভবিষ্যতে আপনার ঋণ ফেরত দেওয়ার সম্ভাবনা কতটা। এই ব্যবস্থার কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে, বিশেষ করে তাঁদের জন্য যাঁদের কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাংক-ইতিহাস নেই। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ১৪০ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এখনো ব্যাংকিং সেবার বাইরে। মোবাইল লেনদেনের মতো বিকল্প তথ্যের ব্যবহার করা হলে এই বিশাল জনগোষ্ঠীও ঋণের আওতায় আসতে পারেন।

তবে এই প্রযুক্তির অন্ধকার দিকও আছে। মেশিন যদি অতীতের বৈষম্যপূর্ণ তথ্য থেকে শিক্ষা নেয়, তবে সেই একই বৈষম্য সে পুনরায় তৈরি করতে পারে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, যখন কোনো সিদ্ধান্তের পেছনে নির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করা হয় না, তখন একজন আবেদনকারী সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সুযোগ পান না। এই জটিলতার কথা মাথায় রেখেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের এআই আইনে ঋণ-স্কোরিং প্রক্রিয়াকে উচ্চ ঝুঁকির কাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এখানে স্বচ্ছতা ও মানুষের তদারকি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।

এই ধরনের পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের জন্য কিছু করণীয় রয়েছে:

১. প্রত্যাখ্যানের কারণ লিখিতভাবে জানতে চান; প্রশ্ন করা আপনার অধিকার।

২. নিজের তথ্যে ভুল থাকলে সংশোধন করান।

৩. মানুষ কর্মকর্তার (হিউম্যান এজেন্ট) পুনর্বিবেচনা চান।

একটি আদর্শ ব্যবস্থা সেটিই হবে যেখানে যন্ত্র কেবল সিদ্ধান্তের একটি খসড়া প্রদান করবে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব এবং তার জবাবদিহিতার ভার থাকবে একজন মানুষের ওপর। এখানে মূল প্রশ্নটি যন্ত্র বনাম মানুষের লড়াইয়ের নয়, বরং প্রশ্নটি হলো—সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করার দায় কার?