এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে এবার বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। এই ব্যাপক ধসের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের চরম দুর্বলতাকে। এর পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি এবং শিক্ষার সামগ্রিক মানের অবনতির মতো বিষয়গুলোও সামনে এসেছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছর ইংরেজি বিষয়ে পাসের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬১ দশমিক ১৪ শতাংশে। অর্থাৎ, ৩৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ শিক্ষার্থী এই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। এছাড়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বা আইসিটিতে ফেল করেছে ২৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থী।

দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের সামগ্রিক পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০০৪ সালে পাসের হার ছিল সবচেয়ে কম, তখন উত্তীর্ণ হয়েছিল ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ শিক্ষার্থী। এরপর থেকে পাসের হার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেলেও চলতি বছর তা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে।

এই পরিস্থিতির বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “পাবলিক পরীক্ষার ফলে তারতম্যের অনেক কারণ থাকতে পারে। ইংরেজিতে এখনও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতি রয়েছে। এজন্য যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে।”

সামগ্রিক পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ হলেও বিভাগ ও বোর্ডভেদে ফলাফলে ব্যাপক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে। বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক ভালো করেছে, যেখানে পাসের হার ৭৩ দশমিক ১২ শতাংশ। তবে মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীরা অনেক পিছিয়ে আছে।

মানবিক বিভাগে অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী, অর্থাৎ ৫৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ ফেল করেছে। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে অকৃতকার্যের হার ৪৯ দশমিক ২৩ শতাংশ। শুধু হিসাববিজ্ঞান বিষয়টিতেই ফেল করেছে ৪২ দশমিক ০৪ শতাংশ শিক্ষার্থী।

রাজধানীর সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মাহবুবুর রহমান মোল্লা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ফল আশানুরূপ হয়নি। এর পেছনে বেশকিছু কারণ রয়েছে। এবার একাধিক প্রশ্নপত্রে ভুল, অসঙ্গতি লক্ষ্য করা গেছে। যারা প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেন তাদের আরও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন আছে। এ ছাড়া ইংরেজিতে পাসের হার কমেছে। এখানে একটি রচনা থাকে, যার উত্তর দিতে হয়। এটার কোনো বিকল্প থাকে না। অনেক ছাত্র-ছাত্রী ইংরেজিতে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে না।”

বোর্ডভিত্তিক ফলাফলেও বড় ব্যবধান দেখা গেছে। সর্বোচ্চ পাসের হার ছিল ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে, যেখানে ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। অন্যদিকে সর্বনিম্ন পাসের হার ছিল বরিশাল বোর্ডে, যেখানে মাত্র ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। দুই বোর্ডের মধ্যে পাসের হারের ব্যবধান ১৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

পেছনের বছরগুলোর সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, ২০১২ সালে এইচএসসিতে পাসের হার ছিল ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০১৯ সালে ছিল ৭৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের অধীনে ২০২১ সালে পাসের হার ছিল সর্বোচ্চ ৯৫ দশমিক ৩ শতাংশ। এরপর ২০২২ সালে ৮৫ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭৫ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়। তবে ২০২৫ সালে এই হার নেমে এসেছে ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশে।

অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান আরও বলেন, “আগে শিক্ষার্থীরা যা ফল করত তার থেকে বেশি দেখানো হতো। আর এখন ছাত্র-ছাত্রীরা যেমন পরীক্ষা দিচ্ছে তার চেয়ে ফল কিছুটা কমে যাচ্ছে। এটা আমাদের ধারণা। তাই ফল নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার। এমন ফলাফলের আসল কারণ জানা দরকার।”

অন্যদিকে, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সামগ্রিক বিবেচনায় ফল ভাল হয়েছে বলে মনে করি। কারণ, শিক্ষার্থীদের খাতা যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়েছে, শ্রেণিকার্যক্রমে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।”

পাসের হার কমে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “রাজধানীর কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল সন্তোষজনক। তবে ঢাকার বাইরে এই চিত্র ছিল হতাশাজনক। সারা দেশের অনেক কলেজে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী ক্লাসে উপস্থিত হন না। বর্তমানে কলেজ পর্যায়ে শিক্ষকের সংকট নেই, শিক্ষার্থীর সংকট। যারা ক্লাস করেন না তারা পাস করবেন কী করে? এবারের ফল বিবেচনায় কলেজগুলোতে এখন শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়বে বলে মনে করি।”