থাইল্যান্ডের সীমান্তঘেঁষা মালয়েশিয়ার পাদাং বেসার থেকে তিতিওয়াংসা পর্বতমালা পেরিয়ে দক্ষিণ চীন সাগরের উপকূল ধরে সুংগাই রেংগিত। ১২ দিনে সাইকেলে ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার রোমাঞ্চকর গল্প শোনাচ্ছেন এভারেস্টজয়ী বাবর আলী।
১৮ অক্টোবর। সকাল ১০টার দিকে সাইকেলে চড়ে বসলাম। ‘পাদাং বেসার ০ কিমি’ লেখা মাইলফলকের সামনে ছবি তুলে যাত্রা শুরু। সঙ্গী জুমন নিয়াজ। রাস্তায় প্রচুর সাইনবোর্ড চোখে পড়ছে যেখানে মালয়েশিয়ার পারলিস প্রদেশের পথে রাজপরিবারের সদস্যদের ছবি চোখে পড়ে। অন্য দেশের শাসনকর্তারা ‘সুলতান’ উপাধি ব্যবহার করলেও এ প্রদেশের প্রধান এখনো ‘রাজা’ উপাধি ব্যবহার করেন।
কিছুটা এগোতেই অল্প চড়াই শুরু হলো। পথের দুই পাশে কেনাফের খেত। অনেক জায়গায় ‘জাভা জুট’ নামে পরিচিত এই শস্যে আমাদের পাটের মতো আঁশ থাকে। এই আঁশ দিয়ে তৈরি হয় দড়ি, কাগজ কিংবা বায়োপ্লাস্টিক। কেনাফের ফুল অনেকটাই ঢ্যাঁড়সের ফুলের মতো দেখতে। আরও কিছুটা এগোতে দিগন্তে মাথা তুলল চুনাপাথরের জোড়া পাহাড় বুকিত চাবাং। চোখ ফেরানো কঠিন।
মালয়েশিয়ায় এসেছি ১৭ অক্টোবর। দেশটির কিছু জায়গা আগেও ঘোরা হয়েছে। এবার বেছে নিয়েছি নতুন এক চ্যালেঞ্জ। থাইল্যান্ড সীমান্তের পাদাং বেসার থেকে আড়াআড়ি তিতিওয়াংসা পর্বতমালা পেরিয়ে পৌঁছাব কেলানটান প্রদেশের রাজধানী কোটা বারুতে। এরপর দক্ষিণ চীন সাগরের উপকূল ধরে যাব দেশটির দক্ষিণের শেষ প্রান্ত সুংগাই রেংগিতে। ১২ দিনে প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার সাইকেল চালানোর পরিকল্পনা।
প্রথম দুই দিনে পাড়ি দিয়েছি ১৭১ কিলোমিটার। মাঝে জিত্রা ও কুপাং এলাকায় থেকেছি। তৃতীয় দিনের গন্তব্য বান্দিং। পাহাড়ি এলাকাটিতে থাকার জায়গা দুটি। এর মধ্যে গুগল বলছে বান্দিং লেকসাইড ইন বন্ধ আর রয়েল বেলুমের ভাড়া সাধ্যের বাইরে। তবু একবার পাহাড় বেয়ে বান্দিং হোটেলটায় উঁকি দিলাম। গুগল ম্যাপের রিভিউই সঠিক বলে প্রমাণিত হলো। মালয় এক লোকের সঙ্গে কথাবার্তা বলে জানা গেল, জায়গাটা এখন খোলা নেই, সংস্কারকাজ চলছে। তাঁর সঙ্গে থাকা দুজন আমার দিকে ঠারেঠোরে দেখছিলেন। মালয় ভদ্রলোকের সঙ্গে চোস্ত ইংরেজিতে কথা বলছিলাম দেখেই হয়তোবা আগ বাড়িয়ে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। ফেরার সময় কী মনে করে আন্দাজে ঢিল ছুড়ে বললাম, ‘ভাই কি দেশি নাকি?’
উত্তর এল, ‘হ্যাঁ।’
তাঁর নাম আসাদ। তিনিসহ ছয়জন বাংলাদেশি সেখানে নির্মাণশ্রমিকের কাজ করেন। পাঁচজনের বাড়ি নরসিংদীর মাধবদী, ষষ্ঠজন নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের বাসিন্দা। রাতে তাঁদের সঙ্গেই থেকে যেতে প্রস্তাব দিলেন আসাদ। আমি খানিকটা দোনোমনা করছিলাম। পাহাড় থেকে নিচে গিয়ে জুমন ভাইকে বলতেই তিনি রাজি।
ভাগ্যিস, রাজি হয়েছিলাম। নইলে বিদেশবিভুঁইয়ে দেশের মানুষের এ রকম আন্তরিকতার দেখা কোথায় মিলত?
তাঁদের আতিথ্যে সেদিন রাতে খেয়েছি বান্দিং লেক থেকে ধরা শোল মাছ আর টমেটোর তরকারি। রাতভর চলেছে দেশ ও রাজনীতি নিয়ে আড্ডা। পরদিন বিদায় নিয়েছি ২০২৯ সালে মাধবদীতে আসাদ ভাইয়ের বিয়ের আমন্ত্রণ নিয়ে।
তিন দিনে পাড়ি দিয়েছি ২৬১ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ। চতুর্থ দিনে তিতিওয়াংসা পর্বতমালার খাড়া ঢাল বেয়ে উঠছি। মাঝেমধ্যেই রাস্তার ধারে হাতি পারাপার–সংক্রান্ত সতর্কবার্তা চোখে পড়ে। সেসব পাত্তা না দিয়েই এগোই। হাতি সামনে পড়লে আমি কী করব, যা করার হাতিই করবে! হঠাৎ রাস্তার ধারে ধূসর ঢিবির মতো কিছু চোখে পড়ল। বিশাল কোনো পাথর ভেবে গা না করে এগোতেই দেখি ঢিবিটা নড়ে উঠল! দেখি, বিশাল এক হাতি। মাথা ঠান্ডা রেখে ছবি তুলতে যাব, এমন সময়ে হাতিটা গা–ঝাড়া দিয়ে নড়েচড়ে উঠল। প্রাণপণে প্যাডেল মেরে সামনে এগিয়ে গেলাম। কিছুটা ওপরে উঠে সঙ্গী জুমন ভাইকে সতর্ক করি। আমার অস্বাভাবিক গতি তার নজর এড়ায়নি। বিপদের আঁচ করতে পেরেছেন। তিনি পায়ে পাখা লাগিয়ে চড়াইয়ের নিরাপদ দূরত্বে চলে আসার সময় বুনো হাতির একটা ছবি অবশ্য তুলতে পেরেছেন!
সামনে আমাদের গন্তব্য কেলানটান প্রদেশের জেলি শহর। পথে পড়েছে বেলুম-তেমেনগর বনাঞ্চল। মালয়েশিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ডেও বিস্তৃত এই বনাঞ্চল। প্রায় ১৩ কোটি বছরের পুরোনো এ বন ডাইনোসরের যুগের সাক্ষী। বহুল আলোচিত আমাজন আর কঙ্গোর বনের চেয়েও বয়সের দিক থেকে এটি প্রাচীন। বিশ্বে এর চেয়ে পুরোনো অতিবৃষ্টির অরণ্য খুব কমই আছে।
রাস্তা থেকেই জঙ্গলের ভেতর বিশাল সব মহিরুহ দেখা যাচ্ছে। কয়েকটা গগনভেদী গর্জনগাছও নজরে এল। কোথাও হাতির মল, কোথাও ধনেশ পাখির উপস্থিতি। মালয়েশিয়ার ১০ প্রজাতির ধনেশের দেখা মেলে এ বনে।
যত এগোচ্ছি, জঙ্গল তত পুরু হচ্ছে। ভেসে আসছে বিচিত্র সব আওয়াজ। একটা প্রাণীর শব্দ রীতিমতো অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের মতো। শুনতে শুনতে কানে তালা লেগে যাওয়ার জোগাড়। অনেক আপহিল। পরপর বাঁকানো কাস্তের মতো বাঁক। ঢালু রাস্তায় উল্টো দিক থেকে লরি নামছে অতি ধীরে, ব্রেক কষতে কষতে। বাতাসে রবার পোড়ার তীব্র গন্ধ। পাহাড় ঠেলতে ঠেলতে অতি ধীরে আমরা উঠি। মাঝেমধ্যে ছোট একটা-দুটো উতরাই পড়ে। সেগুলো বেয়ে নামার আগে চাকা স্কিড করার সংকেতচিহ্ন দেওয়া আছে।
বনের ভেতর দিয়ে এগিয়েছে ফেডারেল রুট ৪। পাহাড়ি বাঁক আর খাড়া চড়াইয়ে সাইকেল চালানো কঠিন। রাস্তার পাশ থেকে সরু পথ চলে গেছে বনভূমির গভীরে, যেখানে মালয়েশিয়ার আদিবাসী ওরাং আসলিদের বসবাস। তাদের অনেকেই তেমেংগান লেক ও আশপাশের জলাশয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। বন আর পানির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়ানো তাদের জীবন।
বেসেরাহ থেকে নেনাসির পথ ধরেছি। এর আগে জেলি থেকে কোটা বারু, তেলাগা পাপান, বুকিত বাউ, বেসেরাহ পর্যন্ত ৯ দিনে পাড়ি দিয়েছি ৮০০ কিলোমিটারের বেশি। কোটা বারু থেকেই দক্ষিণ চীন সাগরের উপকূল ধরে পথ চলছি। আমাদের পথের শেষ বিন্দু সুংগাই রেংগিত পর্যন্ত এই উপকূল ধরেই যেতে হবে।
পথে পড়ল সুংগাই পেনর। অনেক দিন পর একটা স্বচ্ছতোয়া নদী দেখে আনন্দ হলো। টলমলে জলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখলাম। নিজের সঙ্গে দেখা হলো কি? চেনা গন্তব্যের বাইরে ভ্রমণে বেরোলে অপ্রত্যাশিতভাবে দেখা হয় অনেকের সঙ্গে, তবে সবচেয়ে বেশি আনন্দ হয় নিজের সঙ্গে দেখা হলে!
পথে অনেক বানর চোখে পড়ছে। ইলেকট্রিকের মোটা তারের ওপর বসে পথের পানে চোখ রেখে বসে আছে। পেকানের দিকে যত এগোচ্ছি, গাড়ির ভিড় তত বাড়ছে। পথে ছোট্ট একটা দোকানে সকালের খাবারের জন্য থামলাম। নতুন খাবার চেখে দেখতে আমার ভালো লাগে। রাস্তার পাশের ছোট দোকানগুলোয় খাবারের বৈচিত্র্যও বেশি। নাসি বা ভাত ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় না দেখে ভাতই নিতে হলো। সঙ্গে নিলাম স্প্রাউট, মিশ্র সবজি, রান্না করা আনারস আর দুরিয়ানের চাটনি। জুমন ভাই আইয়াম (চিকেন) আর মিক্সড ভেজিটেবলেই আস্থা রাখল।
মালয়েশিয়ার পশ্চিম উপকূল অতিমাত্রায় শহুরে ও বহু সাংস্কৃতিক হলেও পূর্ব উপকূলের জীবনধারা পুরোপুরি মালয় সংস্কৃতিনির্ভর। এই অঞ্চলকে অনেকে বলেন ‘দ্য ফরগটেন হাফ অব মালয়েশিয়া’। নেনাসি থেকে মার্সিং, মাওয়াই যেতে যেতে দক্ষিণ চীন সাগরের অনেক সৈকতের বালু লেগেছে সাইকেলের চাকায়। উপকূলে একের পর এক আমাদের সঙ্গী হয়েছে সৈকত, নীলচে সবুজ জল আর নোনা বাতাস। অনেক সৈকত ভঙ্গুর হওয়ায় কোথাও কোথাও কংক্রিটের ব্লক দিয়ে জনপদ রক্ষার চেষ্টা চলছে। পথে দেখা মিলেছে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি পাথুরে সামুদ্রিক গুহারও। এভাবেই ১১তম দিনে এসে পৌঁছাই মাওয়াই এলাকায়।
২৯ অক্টোবর আমাদের যাত্রার শেষ দিন। মাওয়াই থেকে সাতসকালে যাত্রা শুরু করলাম। সাইকেল চালাচ্ছি আর অভিযান শেষের সুরটা ভেতরে কেমন যেন বিষাদ ছুঁয়ে যাচ্ছে!
৭৫ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে বিকেলে সাইকেল চালিয়ে পৌঁছে গেলাম সুংগাই রেংগিতে। মালয়েশিয়ায় আমাদের শেষ গন্তব্য।