বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি বা এফটিএ (FTA) নিয়ে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম দফার আলোচনা আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। তিন দিনব্যাপী এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পণ্য ও সেবাবাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং ডিজিটাল বাণিজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে, যাতে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। আগামী জানুয়ারিতে দ্বিতীয় দফার আলোচনায় বসার প্রাথমিক লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে উভয় দেশ।

গত ২৭ অক্টোবর ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে এই আলোচনার সূচনা হয় এবং আজ বৃহস্পতিবার তা সমাপ্ত হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বৈঠকে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিরা চুক্তির বিভিন্ন অধ্যায়ের খসড়া এবং সামগ্রিক কাঠামো নিয়ে নিবিড় আলোচনা করেছেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এফটিএ নিয়ে পরবর্তী দফার বৈঠকটি মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত হবে। সাধারণত আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে এই ধরনের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা একবার এক দেশে হলে পরবর্তী বৈঠকটি অন্য দেশে আয়োজন করা হয়।

আলোচনার প্রক্রিয়ায় মোট ১৩টি পৃথক কর্মদল এফটিএ-র বিভিন্ন অধ্যায়ের খসড়াগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেছে। আলোচনার মূল বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল পণ্য ও সেবাবাণিজ্য, পণ্যের উৎপত্তি নির্ধারণের নিয়মাবলি, শুল্কপ্রক্রিয়া সহজীকরণ, ডিজিটাল বাণিজ্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও উদ্ভিদ স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিধান, বাণিজ্যে কারিগরি বাধা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক।

বৈঠকের সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের প্রধান আলোচক এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীন বলেন, “প্রস্তাবিত এফটিএ বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার বিদ্যমান সম্পর্ককে নতুন অর্থনৈতিক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করবে।”

মালয়েশিয়ার ইলেকট্রনিকস, অর্ধপরিবাহী ও ডিজিটাল প্রযুক্তি খাতের অভাবনীয় অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে খাদিজা নাজনীন আরও বলেন, “চুক্তিটি কার্যকর হলে দেশটি থেকে প্রযুক্তি স্থানান্তর, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শিল্প খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।”

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে এই চুক্তির কৌশলগত গুরুত্বের কথা বলা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয় যে, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখা, রপ্তানি বাজার আরও সম্প্রসারণ করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের সদস্য মালয়েশিয়ার সঙ্গে এই এফটিএ কার্যকর হলে বাংলাদেশের পণ্য ও সেবা খাতের বাজার যেমন বাড়বে, তেমনি আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার নতুন পথ উন্মোচিত হবে।

তবে বিজ্ঞপ্তিতে সতর্ক করা হয়েছে যে, চুক্তির প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে শুল্কছাড়ের পরিধি, চূড়ান্ত শর্তাবলি, দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষা এবং এর বাস্তবায়ন কাঠামোর ওপর। তাই আলোচনায় দুই দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থের মধ্যে যথাযথ ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। প্রথম দফার আলোচনা শেষ হওয়ায় চুক্তি প্রণয়নের প্রক্রিয়া এখন এক ধাপ এগিয়েছে। আগামী জানুয়ারিতে দ্বিতীয় দফার বৈঠকে চুক্তির বিভিন্ন অধ্যায় নিয়ে আরও দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে বলে আশা করছে উভয় পক্ষ।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ মালয়েশিয়ায় ২৮ কোটি ২৫ লাখ ৫০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। বিপরীতে একই সময়ে মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করা হয়েছে ২২৯ কোটি ডলারের পণ্য। ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০১ কোটি ডলার।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য ছিল নিট পোশাক। এছাড়া পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য, প্লাস্টিক ও রাবার, প্রকৌশল পণ্য, ওষুধ, রাসায়নিক পণ্য, গৃহসজ্জার বস্ত্র, হিমায়িত খাদ্য ও আসবাব রপ্তানি করা হয়েছে। অন্যদিকে, মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশ প্রধানত জ্বালানি ও খনিজ তেল, পাম তেল, রাসায়নিক পণ্য, লোহা ও ইস্পাত, প্লাস্টিক, যন্ত্রপাতি এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম আমদানি করে থাকে।