লিওনেল মেসি এবং বার্সেলোনা—এই দুটি নাম প্রায় দুই দশক ধরে ফুটবল বিশ্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছিল। কাতালান ক্লাবটির হয়ে অসংখ্য রেকর্ড গড়েছেন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা। বিশেষ করে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে এল ক্লাসিকো লড়াইয়ে তিনি ছিলেন বার্সেলোনার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। তবে ফুটবল ইতিহাসের এই পরিচিত গল্পের মোড় সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত।

ক্যারিয়ারের একেবারে শুরুর দিকেই মেসিকে নিজেদের দলে ভেড়ানোর সুযোগ এসেছিল রিয়াল মাদ্রিদের সামনে। এমন এক চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন স্প্যানিশ জায়ান্টদের সাবেক কর্মকর্তা মিগেল আনহেল পর্তুগাল। তার ভাষ্যমতে, ২০০১ সালেই মেসিকে দলে নেওয়ার সম্ভাবনার কথা রিয়াল মাদ্রিদকে জানানো হয়েছিল। তবে বার্সেলোনার সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ক নষ্ট করার ঝুঁকি নিতে চায়নি মাদ্রিদের ক্লাব কর্তৃপক্ষ।

গত শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এএসে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে এই গোপন তথ্যটি সামনে আনেন পর্তুগাল। রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক ফুটবলার হিসেবে দীর্ঘ সময় ক্লাবটির যুবদলের কোচ, স্কাউট এবং টেকনিক্যাল সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের নানা স্মৃতিচারিতার এক পর্যায়ে ৭০ বছর বয়সী এই সাবেক কর্মকর্তা মেসির সম্ভাব্য দলবদলের সেই অজানা অধ্যায়ের কথা জানান।

ঘটনাটি ২০০১ সালের। তখন মেসির বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। তার আগের বছর আর্জেন্টিনা ছেড়ে স্পেনের বার্সেলোনায় এসে ক্লাবটির যুব একাডেমিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। মেসির অসাধারণ ফুটবল প্রতিভার ঝলক দেখা গেলেও, সে সময় বার্সেলোনার সঙ্গে তার কোনো পেশাদার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। চুক্তির শর্তাবলী নিয়ে তৈরি হওয়া সেই অনিশ্চয়তার সুযোগই নাকি রিয়াল মাদ্রিদের সামনে পথ খুলে দিয়েছিল।

সাক্ষাৎকারে মেসিকে দলে নেওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে পর্তুগাল বলেন, “২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে এমন একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে ২০০১ সালে মেসির সঙ্গে বার্সেলোনার চুক্তি নিয়ে জটিলতা চলছিল। সেই সময় আর্জেন্টাইন ফুটবলারের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি তাকে রিয়াল মাদ্রিদে নেওয়ার প্রস্তাব দেন।”

তবে সেই প্রস্তাবটি কতটা বাস্তবসম্মত ছিল, তা নিয়ে পর্তুগাল নিজেও পুরোপুরি নিশ্চিত নন। তিনি বলেন, “আমি জানি না বিষয়টি সত্যি ছিল, নাকি মিথ্যা। তবে মেসিকে দলে নেওয়া সম্ভব হতে পারে, এমন তথ্য ক্লাবের কাছে এসেছিল।”

পর্তুগালের দাবি অনুযায়ী, মেসিকে নিয়ে কিছুটা যোগাযোগও করা হয়েছিল। কিন্তু চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়ে রিয়াল মাদ্রিদ এই ঝুঁকি নিতে রাজি হয়নি। সাবেক এই কর্মকর্তা আরও বলেন, “বার্সেলোনার সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে চাওয়া হয়নি। যদিও কিছুটা যোগাযোগ হয়েছিল, তবে পারস্পরিক শ্রদ্ধার কারণে শেষ পর্যন্ত এমন পদক্ষেপ নেওয়া হতো বলে আমার মনে হয় না।”

মেসিকে নিয়ে রিয়াল মাদ্রিদের আগ্রহের খবর এবারই প্রথম সামনে আসেনি। এর আগে ২০২২ সালে আর্জেন্টাইন তারকার জীবনীকার গিয়েম বালাগেও একই সময়ের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছিলেন। ফরাসি সংবাদমাধ্যম লা পারিসিয়েনে প্রকাশিত তার বিবরণেও ২০০১ সালে মেসির বার্সেলোনা ছেড়ে রিয়ালে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছিল।

বালাগের বর্ণনা অনুযায়ী, ২০০১ সালের শেষ দিকে মেসির পরিবারের সঙ্গে বার্সেলোনার চুক্তির বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। তরুণ মেসির জন্য প্রাথমিকভাবে যে আর্থিক শর্ত নির্ধারিত হয়েছিল, তা নিয়ে আপত্তি তোলেন ক্লাবটির তৎকালীন এক কর্মকর্তা। ফলে চুক্তির শর্তগুলো পুনর্বিবেচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

বালাগের তথ্যমতে, সে সময় বার্সেলোনা মেসির জন্য বছরে ১০ কোটি স্প্যানিশ পেসেতা দিতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু ক্লাবের নতুন কর্মকর্তা হাভিয়ের পেরেজ ফারগুয়েল এই অঙ্কটিকে অতিরিক্ত মনে করেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সী এক ফুটবলারের জন্য এত অর্থ বরাদ্দের সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়ে মেসির পরিবারকে কম অর্থের নতুন প্রস্তাব দেওয়া হয়।

চুক্তি নিয়ে এই টানাপোড়েনের খবর রিয়াল মাদ্রিদের কানেও পৌঁছায়। তখন ক্লাবটির ক্রীড়া পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন আর্জেন্টিনার সাবেক ফুটবলার হোর্হে ভালদানো। মেসিকে পাওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে শুরু করেন তিনি। বালাগে জানিয়েছিলেন, বার্সেলোনার চেয়ে বেশি অর্থ দিতে আগ্রহী ছিল রিয়াল। তবে দুই ক্লাবের মধ্যে নতুন করে বিরোধ তৈরি করতে চাননি ভালদানো, তাই মেসিকে দলে নিতে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়নি।

তৎকালীন পরিস্থিতি এতটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল যে, মেসির ঘনিষ্ঠ মহলে রিয়াল মাদ্রিদে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বালাগের বর্ণনা অনুযায়ী, মেসি ও তার আইনজীবীদের একটি বৈঠকে রিয়ালে চলে যাওয়ার বিষয়টি আলোচিত হয়েছিল।

অবশেষে সব অনিশ্চয়তা কাটিয়ে বার্সেলোনাতেই থেকে যান মেসি। ২০০৪ সালের ১৬ অক্টোবর এস্পানিওলের বিপক্ষে কাতালান ক্লাবটির মূল দলের হয়ে তার আনুষ্ঠানিক অভিষেক হয়। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি এই আর্জেন্টাইন তারকাকে। বার্সেলোনার জার্সিতে ৭৭৮ ম্যাচে ৬৭২ গোল করেন মেসি। ক্লাবটির হয়ে জেতেন ১০টি লা লিগা ও চারটি চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা, হয়ে ওঠেন ক্লাবটির ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার।

অন্যদিকে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষেও একের পর এক স্মরণীয় পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন তিনি। এল ক্লাসিকোর ইতিহাসে ২৬ গোল করে এখনো সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে আসীন এই মহাতারকা। একসময় যে ক্লাবে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে, পরবর্তী সময়ে তিনি সেই ক্লাবেরই সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছিলেন।

শুধু মেসি নন, রিয়াল মাদ্রিদে কাজ করার সময়ে আরও কয়েকজন ভবিষ্যৎ তারকাকে পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছেন পর্তুগাল। তার দাবি, নেইমার ও ফিলিপে কুতিনিয়োকে দলে নেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন তারা। পাশাপাশি ১৬ বছর বয়সেই টনি ক্রুসের খেলা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন রিয়ালের স্কাউটরা। নজরে ছিলেন লুকা মদরিচও।