ফুটবল ম্যাচের শেষ ১০ মিনিট। বল নিয়ে প্রতিপক্ষের দিকে দ্রুত গতিতে ছুটছেন একজন খেলোয়াড়। হঠাৎ গতি বাড়াতেই তাঁর ঊরুর পেছনের অংশে যেন তীব্র বিদ্যুৎ খেলে গেল! মুহূর্তের মধ্যেই তিনি থেমে গেলেন, মুখে ফুটে উঠল প্রচণ্ড ব্যথার ছাপ। হাত দিয়ে ঊরুর পেছনটা চেপে ধরে তিনি সটান শুয়ে পড়লেন মাঠে। খেলার মাঠে এমন দৃশ্য আমাদের অত্যন্ত পরিচিত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই ধরনের পেশির আঘাতকে বলা হয় হ্যামস্ট্রিং স্ট্রেইন।
আসলে হ্যামস্ট্রিং হলো ঊরুর পেছনে অবস্থিত তিনটি প্রধান পেশির একটি সমষ্টি। হাঁটু ভাঁজ করা, দৌড়ানো, লাফ দেওয়া এবং দ্রুত গতি পরিবর্তনের মতো শারীরিক কর্মকাণ্ডের সময় এই পেশিগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে ফুটবল, ক্রিকেট, বাস্কেটবল ও অ্যাথলেটিকসের মতো উচ্চ-তীব্রতার খেলায় হ্যামস্ট্রিংয়ের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়।
এই ইনজুরির পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকে। পর্যাপ্ত ওয়ার্ম-আপ বা শরীর গরম না করেই হঠাৎ দৌড় শুরু করা, দ্রুত গতি বাড়ানো বা কমানো, পেশির নমনীয়তা কমে যাওয়া, ঊরুর সামনের পেশি শক্ত হয়ে থাকা কিংবা নিতম্বের পেশি দুর্বল হলে হ্যামস্ট্রিং অতিরিক্ত চাপের শিকার হতে পারে। এছাড়া আগে যদি একই জায়গায় চোট পেয়ে থাকেন, তবে পুনরায় ইনজুরির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি মূলত তিন ধরনের হয়ে থাকে। প্রথম মাত্রায় হালকা পেশির টান অনুভূত হয়, দ্বিতীয় মাত্রায় পেশির আংশিক অংশ ছিঁড়ে যায় এবং তীব্র মাত্রায় ইনজুরি হলে পেশি বা টেন্ডন সম্পূর্ণ ছিঁড়ে যেতে পারে। আঘাত পাওয়ার মুহূর্তে যদি ‘পপ’ করে শব্দ হয় বা তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়, হাঁটতে সমস্যা হয়, দুর্বলতা দেখা দেয় এবং পরবর্তী সময়ে আক্রান্ত স্থানে কালশিটে দাগ পড়ে, তবে তা গুরুতর ইনজুরির লক্ষণ হতে পারে।
আঘাতের পর প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যথা ও ফোলা নিয়ন্ত্রণ করা সবচেয়ে জরুরি। এক্ষেত্রে বিশ্রাম নেওয়া, ঠান্ডা সেঁক দেওয়া, কমপ্রেশন বা হালকা চাপ দেওয়া এবং আক্রান্ত পা কিছুটা উঁচু করে রাখা বেশ উপকারী। ব্যথা খুব বেশি হলে সাময়িকভাবে ক্রাচ ব্যবহার করার প্রয়োজন হতে পারে। কিছু গুরুতর ইনজুরির ক্ষেত্রে হাঁটুকে অতিরিক্ত প্রসারণ থেকে রক্ষা করতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নি ব্রেইস ব্যবহার করা হয়। তবে মনে রাখতে হবে, সব সময় ব্রেস ব্যবহার বা দীর্ঘ সময়ের বিশ্রামের প্রয়োজন হয় না।
ব্যথা কমার পর তাড়াহুড়ো না করে ধীরে ধীরে বিভিন্ন ধরনের ব্যায়াম ধাপে ধাপে করার মাধ্যমে পেশির নমনীয়তা ও শক্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। অনেক খেলোয়াড়ই একটি বড় ভুল করে থাকেন; ব্যথা কমতেই তারা দ্রুত মাঠে ফিরে যান। কিন্তু ব্যথা চলে যাওয়া মানেই এই নয় যে পেশি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছে। সুস্থতার পূর্ণতা পেতে হলে হাঁটা থেকে জগিং, জগিং থেকে দৌড় এবং সবশেষে স্প্রিন্ট ও লাফ—প্রতিটি ধাপ ব্যথামুক্তভাবে পার করতে হবে। পাশাপাশি আক্রান্ত পায়ের শক্তি ও নড়াচড়াও স্বাভাবিকের কাছাকাছি ফিরে আসা আবশ্যক।
তথ্যসূত্র:
ডা. সাকিব আল নাহিয়ান,
সহকারী অধ্যাপক, ফিজিক্যাল মেডিসিন ও রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগ, গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ।