ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে একটি সাধারণ ভুল লক্ষ্য করা যায়—জ্বর কমতে শুরু করলেই অনেকে মনে করেন বিপদ কেটে গেছে। তবে চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে বিষয়টি অন্য যেকোনো জ্বরের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। জ্বর কমে যাওয়া মানেই রোগী পুরোপুরি বিপদমুক্ত হয়ে গেছেন এমনটি ভাবলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, ডেঙ্গুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়টি শুরু হয় জ্বর কমার ঠিক পরেই। তাই জ্বর সেরে যাওয়া মানেই আপনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছেন, এই ধারণাটি সঠিক নয়।
জ্বর সেরে যাওয়ার পরবর্তী অন্তত ৪৮ ঘণ্টা বা দুই দিন অত্যন্ত সতর্ক পর্যবেক্ষণে থাকার সময়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে ডেঙ্গুর 'ক্রিটিক্যাল পর্যায়' বলা হয়। এই সময়ে শরীরের রক্তনালি থেকে প্লাজমা বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা থাকে। এর ফলে রক্তচাপ হঠাৎ কমে যেতে পারে, বুকে বা পেটে পানি জমতে পারে এবং এমনকি অত্যন্ত গুরুতর পরিস্থিতি হিসেবে 'ডেঙ্গু শক সিনড্রোম' হতে পারে।
যদি কোনো রোগীর শক সিনড্রোম হয়, তবে তার হাত ও পা অস্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হয়ে যায়। শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে রক্ত সরবরাহ বিঘ্নিত হয় এবং প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায়। বাইরে থেকে রোগীকে খুব বেশি অসুস্থ মনে না হলেও শরীরের ভেতরে নানা জটিল ও গুরুতর সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই রোগীর জ্বর নেই মানেই তিনি সুস্থ হয়ে গেছেন—এই ধারণাটি মারাত্মক ভুল হতে পারে।
ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে রোগী এবং তার পরিবারের সদস্যদের সর্বোচ্চ সচেতনতা প্রয়োজন। রোগীর আপাতবাহ্যিক উন্নতি দেখে সার্বিক পরিস্থিতি বিচার করা যাবে না। বরং রোগীর বারবার বমি হচ্ছে কি না, পাতলা পায়খানা, পেটে ব্যথা, শরীরের কোথাও রক্তপাত হচ্ছে কি না, প্রস্রাব স্বাভাবিকের চেয়ে কমে গেছে কি না কিংবা অস্বাভাবিক দুর্বলতা ও অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে কি না, সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে। সেই সঙ্গে রোগী স্বাভাবিকভাবে খাবার গ্রহণ করতে পারছেন কি না, রক্তচাপের মাত্রা কেমন এবং প্রস্রাবের পরিমাণ ঠিক আছে কি না, তা খেয়াল করা জরুরি। এই সময়ে রোগীকে পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার খেতে হবে এবং পূর্ণ বিশ্রাম নিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ফলোআপ এবং প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তীব্র জ্বর কয়েক দিন স্থায়ী হওয়ার পর শরীর সাধারণত বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। শরীরের এই ধকল পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার আগেই যদি কেউ নিয়মিত কাজে বা দৈনন্দিন ব্যস্ততায় ফিরে যান, তবে ক্লান্তি আরও বাড়তে পারে এবং সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে পারে। অনেক অভিভাবক দেখা যায়, শিশু জ্বর থেকে সেরে ওঠার পরপরই তাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য অস্থির হয়ে পড়েন। চিকিৎসকদের মতে, এটি একটি বেশ বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত। কারণ, শিশু স্কুলে গিয়ে ছোটাছুটি করলে তার শরীরে আরও ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা হতে পারে।
মনে রাখা প্রয়োজন, কোন রোগীর কত দিনের বিশ্রাম প্রয়োজন, তা নির্ভর করে রোগের তীব্রতা, রোগীর শারীরিক অবস্থা এবং সুস্থ হওয়ার গতির ওপর। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে কেবল জ্বরই রোগের তীব্রতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। জ্বর কমার পর যথেষ্ট সুস্থ হওয়া এবং বিপৎকালীন ক্রিটিক্যাল সময়টুকু নিরাপদে পার করার পরেই স্বাভাবিক কাজকর্ম শুরু করা উচিত।
— লেখাটি লিখেছেন গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকার মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।