পুরুষের শরীরের প্রধান সেক্স হরমোন হলো টেস্টোস্টেরন। এটি কেবল যৌন স্বাস্থ্যের জন্য নয়, বরং শরীরের সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পেশির শক্তি ধরে রাখা, হাড়ের ঘনত্ব বজায় রাখা, লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদন এবং পুরুষের মানসিক মেজাজ বা মুড নিয়ন্ত্রণে এই হরমোনটি মুখ্য ভূমিকা পালন করে। তবে বয়স বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার কারণে শরীরে এই হরমোনের মাত্রা হ্রাস পেতে পারে।

টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকে। প্রথমত, বয়স বৃদ্ধি একটি বড় কারণ। সাধারণত ৩০ বছর বয়সের পর থেকে প্রতিবছর পুরুষদের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা প্রায় ১ শতাংশ করে কমতে থাকে, যা বয়স বাড়ার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে গণ্য হয়। দ্বিতীয়ত, স্থূলতা ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন। অতিরিক্ত ওজন এবং অলস জীবনযাপন টেস্টোস্টেরন হ্রাসের অন্যতম প্রধান কারণ। শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমে গেলে তা পুরুষ হরমোনকে নারী হরমোন ‘ইস্ট্রোজেনে’ রূপান্তর করতে সহায়তা করে।

এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি রোগ যেমন— অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, দীর্ঘমেয়াদি কিডনির রোগ, যকৃতের সমস্যা ও মেটাবলিক সিনড্রোম টেস্টোস্টেরন হরমোন কমার হার বাড়িয়ে দেয়। মানসিক চাপের প্রভাবও এখানে প্রবল। অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং দীর্ঘদিনের পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব শরীরে ‘কর্টিসল’ নামক স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা সরাসরি টেস্টোস্টেরন উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করে। পাশাপাশি অণ্ডকোষ ও পিটুইটারি গ্রন্থির সমস্যাও দায়ী হতে পারে। টেস্টোস্টেরন মূলত অণ্ডকোষে তৈরি হয় এবং এর সংকেত আসে মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে। এই গ্রন্থিগুলোতে সংক্রমণ, টিউমার, আঘাত বা কোনো রোগের কারণে হরমোন নিঃসরণ ব্যাহত হতে পারে।

টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে শারীরিক দুর্বলতা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়া, হাড়ের ঘনত্ব হ্রাস পাওয়া, বিষণ্নতা এবং পেশির ভর কমে যাওয়া। তবে মনে রাখা প্রয়োজন যে, এই লক্ষণগুলো অন্য অনেক রোগের ক্ষেত্রেও দেখা দিতে পারে। তাই সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় হরমোন পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

প্রাকৃতিক উপায়ে টেস্টোস্টেরন বাড়ানোর কিছু কার্যকর উপায় রয়েছে। নিয়মিত ব্যায়াম, বিশেষ করে ওয়েট লিফটিং ও রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং (এটা এমন একধরনের শরীরচর্চা, যেখানে আপনার পেশিগুলোকে কোনো বাহ্যিক বাধার বিরুদ্ধে কাজ করতে হয়) অণ্ডকোষ থেকে টেস্টোস্টেরন নিঃসরণ বাড়াতে বেশ কার্যকর। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট মাঝারি থেকে ভারী ব্যায়াম করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এনেও এই হরমোনের মাত্রা বাড়ানো সম্ভব। সুষম ও পুষ্টিকর খাবারের তালিকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে জিংক ও ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ উপাদান রাখা উচিত। ডিমের কুসুম, চর্বিযুক্ত মাছ, বাদাম, বীজ এবং সবুজ শাকসবজি খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। একইসাথে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার ও চিনি এড়িয়ে চলা উচিত। এছাড়া রাতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গভীর ও শান্তিপূর্ণ ঘুম নিশ্চিত করা এবং মানসিক চাপ মোকাবিলা করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি পেটের অতিরিক্ত মেদ কমিয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখলে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা অনেকাংশেই স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসে।

যদি হরমোনের ঘাটতির সন্দেহ হয়, তবে রক্ত পরীক্ষা বা সেরাম টেস্টোস্টেরন পরীক্ষার মাধ্যমে এর মাত্রা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। হরমোনের মাত্রা যদি মাত্রাতিরিক্ত কম থাকে, তবে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ‘টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি’ নেওয়া যেতে পারে। ঘাটতির প্রকৃত কারণ জানতে অন্যান্য হরমোন পরীক্ষাও প্রয়োজন হতে পারে। তবে অত্যন্ত সতর্ক করে বলা হচ্ছে যে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনোই নিজে থেকে কোনো হরমোন জাতীয় ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট সেবন করা উচিত নয়।

মনে রাখবেন, এ ধরনের চিকিৎসা কেবল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানেই নেওয়া যাবে। আজকাল অনেকে পেশি বাড়ানো বা শক্তি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে জিম বা দোকান থেকে টেস্টোস্টেরন গ্রহণ করে থাকেন। এর অনেক ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া আছে।

— লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা