গলায় থাইরয়েড নডিউল বা গোটা ধরা পড়ার পর রোগীদের প্রথম চিন্তায় আসে—এটি কি ক্যানসার? আর তাই নিয়ে অপারেশনের ভয়। তবে চিকিৎসকদের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি ক্যানসার নয় এবং সব নডিউলের জন্য কাটাছেঁড়ার প্রয়োজন হয় না। তাই গোটা পাওয়া মাত্র আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
অনেক সময় নডিউল খুব ছোট থাকে এবং কোনো সমস্যা তৈরি না করলে শুধু নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণে রাখাই যথেষ্ট। তবে কারও কারও অস্বস্তি ও দুশ্চিন্তা রয়ে যায়। যদি কোনো গোটা ধীরে ধীরে বড় হয়ে গিলতে সমস্যা, গলায় চাপ বা অস্বস্তি, শ্বাস নিতে কষ্ট বা বাহ্যিক সৌন্দর্যে সমস্যা তৈরি করে, তবে এখন গলায় কাটাছেঁড়া না করেই আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে নডিউলের আকার কমানো সম্ভব।
এই চিকিৎসা পদ্ধতিকে বলা হয় থার্মাল অ্যাব্লেশন বা তাপপ্রয়োগের মাধ্যমে চিকিৎসা। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও থাইরয়েডের কিছু কিছু নডিউলের চিকিৎসায় থার্মাল অ্যাব্লেশন—বিশেষ করে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাব্লেশন ও মাইক্রোওয়েভ অ্যাব্লেশন—ব্যবহার করা হচ্ছে।
সহজভাবে বললে, আলট্রাসনোগ্রামের সাহায্যে খুব সরু একটি সুচের মতো যন্ত্র থাইরয়েডের নডিউলের মধ্যে প্রবেশ করানো হয়। এরপর নিয়ন্ত্রিত তাপের মাধ্যমে নডিউলের নির্দিষ্ট অংশ চিকিৎসার আওতায় আনা হয়। চিকিৎসা করা অংশ ধীরে ধীরে শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় শোষিত হয় এবং সময়ের সঙ্গে নডিউলের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাব্লেশনে রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে তাপ তৈরি করা হয়। অন্যদিকে মাইক্রোওয়েভ অ্যাব্লেশনে মাইক্রোওয়েভ শক্তি ব্যবহার করে তাপ উৎপন্ন করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে লেজার দিয়েও একই ধরনের চিকিৎসা করা হয়।
সাধারণত পরীক্ষা–নিরীক্ষার মাধ্যমে যাঁদের গোটা ক্যানসার নয় বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, কিন্তু গোটার কারণে নানা উপসর্গ, অস্বস্তি বা সৌন্দর্যগত সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে অপসারণ দরকার মনে করছেন, সেই সব থাইরয়েড নডিউলের ক্ষেত্রে অ্যাব্লেশন বিবেচনা করা হয়। কিছু নির্দিষ্ট রোগীর অতিরিক্ত হরমোন তৈরি করা থাইরয়েড নডিউলের ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সব ধরনের থাইরয়েড নডিউলের জন্য থার্মাল অ্যাব্লেশন উপযুক্ত নয়।
এ ধরনের চিকিৎসার আগে আলট্রাসনোগ্রাম, প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা ও সুচের মাধ্যমে কোষ বা টিস্যু পরীক্ষা করে ক্যানসারের ঝুঁকি যাচাই করা জরুরি। ক্যানসারের ঝুঁকি আছে, এমন নডিউলের ক্ষেত্রে রোগীর জন্য অস্ত্রোপচার ও পরে অন্য চিকিৎসা প্রয়োজন হয়।
থার্মাল অ্যাব্লেশনের বড় সুবিধা, সাধারণত গলায় বড় করে কাটতে হয় না। ফলে অপারেশনের দৃশ্যমান দাগ হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম। থাইরয়েডের সুস্থ অংশ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সংরক্ষণ করা যায়। রক্তপাতের ঝুঁকি নেই বললেই চলে। অনেক ক্ষেত্রেই রোগীকে সম্পূর্ণ অজ্ঞান না করে স্থানীয়ভাবে অবশ করে চিকিৎসাটি করা সম্ভব। হাসপাতালে থাকার সময়ও তুলনামূলকভাবে কম এবং দ্রুত স্বাভাবিক কাজে ফিরে যেতে পারেন রোগী।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সম্পূর্ণ থাইরয়েড অপসারণ না করে শুধু নডিউলকে লক্ষ্য করে চিকিৎসা করা যায়। ফলে থাইরয়েডের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা বজায় রাখার সুযোগ থাকে। রোগীর থাইরয়েডের বাকি অংশ স্বাভাবিকভাবে কাজ করলে অপারেশনের পর আজীবন থাইরয়েড হরমোনের ওষুধ সেবনের প্রয়োজন না–ও হতে পারে।
রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি বা মাইক্রোওয়েভ অ্যাব্লেশন সাধারণত নিরাপদ হলেও জটিলতা একেবারে নেই, এমন নয়। চিকিৎসার পর সাময়িকভাবে গলাব্যথা, ফুলে যাওয়া, কালচে দাগ হওয়া বা রক্ত জমাটের মতো সমস্যা হতে পারে। খুব কম ক্ষেত্রে কণ্ঠস্বর পরিবর্তন, রক্তপাত, সংক্রমণ, ত্বকে পোড়া অথবা আশপাশের স্নায়ু ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতি হতে পারে। তাই এই চিকিৎসা অবশ্যই আলট্রাসনোগ্রামের সাহায্যে এবং এ বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা রয়েছে—এমন চিকিৎসকের মাধ্যমে করা উচিত।
বাংলাদেশেও থাইরয়েড নডিউলের জন্য রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ও মাইক্রোওয়েভ অ্যাব্লেশন ধীরে ধীরে শুরু হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের কিছু কিছু চিকিৎসাকেন্দ্রে এ ধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। চিকিৎসা নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা এবং চিকিৎসাকেন্দ্রে ব্যবহৃত প্রযুক্তির মান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ